505 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

আগুনের রেলগাড়ি

তানি তাছ রীত

  • 5
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    5
    Shares

পর্ব ৪

প্রিয়ম দেখতে পেলো ঘরের কোনায় প্রজ্ঞা বসে আছে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে।চোখ বন্ধ করে আছে।হাতের দিকে তাকাতেই দেখে হাত দিয়ে রক্ত পড়ছে।
প্রিয়ম দৌড়ে যায় প্রজ্ঞার কাছে।প্রজ্ঞাকে ডাকছে কিন্তু সে কোনো সাড়া দিচ্ছে না। বুঝাই যাচ্ছে তার জ্ঞান নেই।তুর্য সাথে সাথে ডক্টরকে কল দেয়।
ফ্যামিলি ডক্টর হওয়ায় ২০ মিনিটের মধ্যেই চলে আসে।এসে প্রজ্ঞাকে ব্যান্ডেজ করে দেয় হাতে।হাতের রগ কেটেছে খুব বেশিক্ষণ হয়নি।তাই এই যাত্রায় বেঁচে গিয়েছে।
রেহেনা বেগম মেয়ের পাশে বসে আছেন।তার মনে এক অজানা ভয় কাজ করছে।
“মি. তুর্য আমি তো আপনাকে আগেই বলেছি প্রজ্ঞা মানসিকভাবে অসুস্থ।অনেকবার বলেছি তার ট্রিটমেন্ট দরকার।কিন্তু আপনি আমার কথা কোনো আমলেই নিচ্ছেন না।” তুর্যকে আলাদা করে কথাগুলো বললেন ডক্টর।
“ওকে ট্রিটমেন্ট করাতে নিয়ে গিয়েছিলা। কিন্তু এতে হিতে বিপরীত হলো।ও ভেবেছিলো আমি ওকে পাগল ভাবছি।সব মিলিয়ে কি কান্ডটাই না করেছিলো।আপনিই বলুন আমি কি করবো এখন। “
প্রিয়ম এখনো তার বোনের দিকে চেয়ে আছে।এই বোনকেই কতই আদর না করতো সে। দেশের বাহিরে যাওয়ার জন্য তার বোনের সাথে কেমন যেনো একটা গ্যাপ পড়ে গিয়েছে।প্রজ্ঞার কি এতো কষ্ট জানা নেই প্রিয়মের। তার কেন যেনো মনে হয় সবাই তার কাছে কিছু লুকোচ্ছে।
প্রজ্ঞার জ্ঞান ফিরার পর সে দেখতে পায় তার পাশে সবাই বসে আছে।
” বোন আমার তোর কি হয়েছে আমাকে একটু বলনা রে।তুই এমন কেন করছিস।তুই তো আমার লক্ষি বোন ।তোর ভাইকে বল আমি সব ঠিক করে দিবো।”
প্রজ্ঞা কিছু বলতে যেয়েও যেনো বলতে পারলো না।সে চুপ করে আছে।তার খুব কষ্ট হচ্ছে আজ।তার একার জন্য সব কিছু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
“কিছু না ভাইয়া।তুই ওকেই বিয়েটা করেনে।আমার কোনো আপত্তি নেই।আমি সরি সব কিছুর জন্য।”
প্রজ্ঞার কথা শুনে প্রিয়ম যতনা অবাক হয় তার থেকে বেশি অবাক হয় রেহেনা বেগম।কিন্তু তারা বেশ খুশিও হয় প্রজ্ঞার কথায়।ভাবে হয়তোবা এবার সব ঠিক হয়ে যাবে।
প্রজ্ঞাকে রেস্ট নিতে দিয়ে তারা রুম থেকে চলে যায়।তুর্য প্রজ্ঞার পাশে বসে প্রজ্ঞার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
“তুমি আমাকে আজ ও ভালোবাসতে পারোনি তাইনা?”
প্রজ্ঞার এমন প্রশ্নের উত্তর তুর্যর কাছে নেই।সে প্রজ্ঞার কপালে গভীর চুমু দিলো।
“এখন ঘুমিয়ে পড়ো তুমি।বেশি কথা বলো না।”
“তুমি জানতে চাবে না আমি কেন এমন করেছি? কেন ভাইয়ার বিয়েতে রাজি হচ্ছিনা? “
“না প্রজ্ঞা আমি জানতে চাইনা। সব কিছু জানতে হবে এমনতো কোনো কথা নেই।তুমি এখন চোখ বন্ধ করো আমি তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি।”
কিছুক্ষন পরই প্রজ্ঞা ঘুমিয়ে গেলো।
তুর্য বেলকনিতে যে ছোট দোলনাটা রাখা আছে সেখানে যেয়ে বসলো।
আজ তার নিজেকে বড্ড ক্লান্ত আর অসহায় মনে হচ্ছে।সে হাঁপিয়ে গিয়েছে এসব থেকে।মাঝে মাঝে তার মনে হয় সব কিছু ছেড়েছুড়ে অনেক দূরে চলে যেতে।যেখানে থাকবেনা এই কষ্টগুলো।ছোট বেলা থেকেই সব কিছু হারিয়ে আসছে সে।এখন কেমন যেনো অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে।কিছু কিছু কষ্ট কখনো ভুলা যায় না।এখনো তাকে ঐ কষ্টই বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।নিজেকে খুব একা মনে হয় তার এখন।হয়তোবা এটা তার পাপের শাস্তি।তাইতো সুখ তার কাছে ইসেও ধরা দেয়না।
পুরনো স্মৃতিগুলো আজ খুব মনে পড়ছে তার।চোখ টা অফ করে ডুব দিলো সেই…..
বিকেলে প্রিয়ম রিদিতার সাথে দেখা করতে গেলো।রিদিতা তার সামনে বসে আছে।রিদিতাকে যতই দেখে ততই ভালোলাগে তার।একবার কেউ এই মেয়ের প্রেমে পড়লে সেখান থেকে বেড়োনো অসম্ভব।
“তো মিস আপনি যেনো কি বলবেন আমাকে? “
“আমি আপনাকে সরাসরি বলছি সব।আমি কোনো কিছুই লুকাতে চাইনা।আজ থেকে ৬ বছর আগে তখন আমি সবে মাত্র কলেজে উঠি।নতুন ফোন কিনে দেয় বাসা থেকে।সেই খুশিতে ফেইসবুক আইডিও খুলে ফেলি। আমার আবার গল্পের বই পড়ার অভ্যেস খুব বেশি ছিলো।ফেইসবুকেও অনেক গল্প খুঁজে পাই ।তো ঐগুলো পড়তে খুব ভালো লাগতো।মাঝে মাঝে কমেন্ট ও করতাম।এমনি করে একদিন আমার কমেন্টে ” তৌকির আহমেদ”নামের এক আইডি থেকে রিপ্লাই আসে।তাও আবার নেগেটিভ রিপ্লাই।দেখেই মেজাজ যায় খারাপ হয়ে।আমি সাথে সাথে তাকে ইনবক্স করি।একপ্রকার ঝগড়া লেগে যায় আমাদের মধ্যে।”
এতটুকু বলেই থেমে গেলো রিদিতা।
পানি খেয়ে আবার বলতে শুরু করলো
“এভাবেই আমাদের কথা বলা শুরু হয় তাকে প্রথম দেখায় বেশ ভালোই লেগেছিলো আমার।ক্রাশ খাওয়া মতো ছেলে ছিলো তৌকির।ঝগড়া থেকে ধীরে ধীরে আমাদের ফ্রেন্ডশিপ হয়। আমরা বেস্টফ্রেন্ড হয়ে যাই। ও ছাড়া কোনো ছেলের সাথে আমার কথা হতোনা।দিন রাত ২৪ ঘন্টা তার সাথেই কথা বলতাম।তার মা বাবা ছিলোনা।সে তার খালার কাছে থাকতো।এক অদ্ভুত মায়া কাজ করতো তার জন্য একদিন তার সাথে দেখাও করি।এভাবেই আমাদের যোগাযোগ বাড়তে থাকে। আমাদের ফ্রেন্ডশিপের ১১ মাস পর সে আমাকে প্রপোস করে। তাও যেনোতেনো প্রপোজ না।বার্গার হাতে নিয়ে হাটু গেড়ে বসে বলে,
” তুমি কি সারাজীবন আমার সাথে বার্গার খাবে? তুমি কি আমার হবে? “।
আমি আর না করতে পারিনি সাথে সাথেই হ্যা বলে ওকে জড়িয়ে ধরি।”
প্রিয়ম লক্ষ্য করছে রিদিতা যখন তৌকির কে নিয়ে কথা গুলো বলছে তার চোখে মুখে অদ্ভুত এক ভালোবাসা কাজ করছে।অন্যরকম আনন্দ।প্রিয়মের কেন যেনো হিংসে হতে লাগলো।
“তারপর থেকে শুরু হয় আমাদের রিলেশন।খুব সুন্দর ছিলো সব কিছু।তৌকির ইন্ট্রোভার্ট টাইপের ছিলো।ওর থেকে কথা বের করা অনেক কষ্টের ছিলো।মাঝে মাঝে মনে হতো ও কিছু নিয়ে খুব ই চাপে আছে।কিন্তু জিজ্ঞেস করলে কিছু বলতোনা।ও আমার জন্য পুরো পাগল ছিলো।আমাদের ঝগড়া হতো না কোনোদিন।ওর প্রেমে আমি পাগল ছিলাম।২ বছর খুব সুন্দর ভাবে কাটলো।কিন্তু হঠাৎ আমার মনে হলো তৌকিরের মধ্যে একটা চেঞ্জ এসেছে।ও কোনো কিছু নিয়ে খুব ঝামেলায় ছিলো। জিজ্ঞেস করলেও আমাকে বলতোনা।কথায় কথায় রেগে যেতো। মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হতো।কিন্তু পরে ভাবতাম যাই হোক ও তো আমাকে কোনোদিন ছেড়ে যাবে না।আবার আমার কাছে এসে মাফ ও চাইতো ওর বিহেবের জন্য। ভালো খারাপ মিলিয়ে এভাবেই এক বছর কেটে গেলো।সেদিন ছিলো ওর জন্মদিন।আমি ওর জন্য নীল শাড়ী পড়ে কেক নিয়ে পার্কে ওয়েট করছিলাম। সেদিন আকাশতা বড্ড মেঘলা ছিলো।বৃষ্টি হবে হবে ভাব। কিছুক্ষন পর বৃষ্টিও শুরু হয়ে গেলো।আমি এই বৃষ্টির মধ্যেই ওর জন্য বসে ছিলাম।১ ঘন্টা, ২ ঘন্টা এমন করে ৬ ঘন্টা চলে গেলো ও আসেনি।হাজারো কল দিয়েছিলাম কিন্তু ওর ফোন অফ ছিলো।ওর আইডিও ডিএক্টিভেইট ছিলো। আমি পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলাম।ওর কোনো ফ্রেন্ডকেও আমি চিনতামনা।ওর ভার্সিটিতে খোঁজ নিয়েও কিছু পাইনি।সে সেখান থেকেও টিসি নিয়ে চলে গিয়েছিলো।তারপর থেকে দু বছর ধরে তাকে পাগলের মতো খুঁজেছি কিন্তু পাইনি।”
এবার রিদিতা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো হুহু করে কেঁদে ফেললো।
“আমি এখনো ওকেই ভালোবাসি অনেক বেশি।আমি আপনাকে বিয়ে করলেও আমাকে কিছুদিন সময় দিতে হবে। ওর জায়গায় অন্য কাউকে এক্সেপ্ট করা আমার দ্বারা এখন সম্ভব না।”
প্রিয়ম নিরবে রিদিতার কথাগুলো শুনছিলো।তার কেন যেনো খুব কষ্ট হচ্ছে।
“ধরেন আমাদের বিয়ের পর সে আপনার সামনে আসলো আপনি কি করবেন? তার কাছে চলে যাবেন?”
প্রিয়মের এমন প্রশ্ন শুনে রিদিতা কিছুক্ষন তার দিকে চেয়ে রইলো।
“শুধু তার থেকে কিছু প্রশ্নের উত্তর জানার আছে আমার।আর তার কাছে ফিরে যাওয়ার তো প্রশ্নই উঠেনা।এতোটাও অকৃতজ্ঞ আমাকে ভাববেন না।”
প্রিয়ম আর কিছু বললোনা।
এর মধ্যে রেহেনা বেগম রিদিতাদের বাসার গেলেন। আলতাফ হোসেনকে অনেক কষ্ট করেই রাজি করানো হলো। রইদিতার মা বেশ খুশি। তার প্রিয়মকে মেয়ের জামাই হিসেবে বেশ পছন্দ হয়েছে।
প্রিয়ম ও রিদিতার বিয়ে ঠিক হলো। সপ্তাহক্ষানিক পর তাদের বিয়ে। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন আগে রিদিতার বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।বিয়ের ডেট পিছানোর জন্য সবাই বললেও সে কোনোভাবেই রাজি না তার মেয়ের বিয়ে পিছাতে।
প্রিয়ম ও রিদিতার বিয়ে পাকাপাকি হয়ার পর থেকে প্রজ্ঞা কেমন যেনো চুপশে গিয়েছে। একদিন রাতে,
“তুমি যদি ভাইয়ার বিয়েতে থাকো তাহলে আম সুইসাইড করবো।তুমি খুলনা চলে যাবে। আর কোনোদিন এবাসায় আসবেনা।ভাইয়ার বিয়েটা হয়ে গেলেই আমি ও চলে আসবো তোমার কাছে।” প্রজ্ঞা খুব রাগি ভাবে বলে।
তুর্য অসহায়ের মতো চেয়ে আছে।সে জানে সে যদি এই বিয়েতে থাকে তাহলে প্রজ্ঞা তুলকালাম বাজিয়ে ফেলবে।কিন্তু প্রজ্ঞার কি এতো সমস্যা বুঝতে পারছেনা সে।প্রজ্ঞার সন্দেহপ্রবনতা বেশি অনেক পসেসিভ তুর্যকে নিয়ে।কিন্তু তাই বলে নিজের ভাইয়ের বউকেও ছাড় দিবে না ভেবেই তুর্যের কষ্ট লাগছে।নিজেকে বড্ড ছোট মনে হচ্ছে তার কিন্তু কিছুই করার নেই।
বিয়ের দুদিন আগে তুর্য সিলেট চলে যায়।প্রিয়ম অনেকবার আটকাতে চেয়েছিলো কিন্তু তুর্য কাজের বাহানা দিয়ে চলে যায়।
প্রিয়ম রিদিতার বিয়ে বেশ ধুমধাম করেই হয়।প্রজ্ঞা যদিও সব কিছু থেকেই দূরে দূরে আছে।কিন্তু কোনো ঝামেলা করছে না।রেহেনা বেগম ভাবছে হয়তোবা তার মেয়ে সব মেনে নিয়েছে।কিন্তু এই নিস্তব্ধতাই যে ঝরের আগের পূর্বাভাস তা কেউ বুঝতে পারেনি।
বিয়ের সপ্তাহক্ষানিক পর..
প্রজ্ঞা এখনো এখানেই আছে।সে রিদিতার থেকে দূরে দূরে থাকে।রিদিতাও বেশি একটা মাথা ঘামায় না এটা নিয়ে।সে প্রজ্ঞাকে সময় দিয়েছে স্বাভাবিক হওয়ার।প্রিয়মের সাথে তার বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছে।
প্রিয়ম রিদিতাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে
“আই শুনো কাল আমার কিছু বন্ধু আসবে তোমার হাতের রান্না খেতে।আমি ওদের দুপুরে ইনভাইট করি?”
রিদিতা মুচকি হেসে,
“হ্যা অবশ্যই দাওয়াত দিন। আমি খুব ভালো রান্না পারি।বাবা তো আমার রান্না খুব মজা করে খেতো।এমনকি তৌ..
এতটুকু বলেই থেমে যায় রিদিতা।
প্রিয়মের খারাপ লাগলেও সে কিছু বলে না।প্রসঙ্গ পালটে ফেলে।
” আমি জানি তো। আমার বউ যে তুমি।”
২ জনেই হেসে দেয়।
রিদিতার মাঝে মাঝে খারাপ লাগে।সে চাইলেও প্রিয়মকে পুরোপুরি আপন করে নিতে পারছেনা।অথচ প্রিয়ম তাকে পুরো সাপোর্ট দিচ্ছে।
পরের দিন খুব আয়োজন করে রিদিতা রান্না করছে।প্রিয়মের বন্ধুরা আসবে বলে কথা।রেহেনা ।হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠে।৩-৪ বার বাজার পরও কেউ খুলছে না।
“সবাই গেলো কোথায়।এখনো তো ১ টাই বাজেনাই।ওনার ফ্রেন্ডরা এতো জলদি চলে আসবে। আমার রান্নাও তো কম্পলিট হয়নি এখনো।”
এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে রিদিতা গিয়ে দরজাটা খুলে।
দরজা খুলে সামনের মানুষটাকে দেখে অবাক হয় রিদিতা।তার হাত পা কাঁপছে।সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেনা।কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,
তুমি….
চলবে…
লেখিকাঃ
তানি তাছ রীত
  • 5
    Shares
  • 5
    Shares