268 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

আগুনের রেলগাড়ি

  • 10
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    10
    Shares

পর্ব ৫

তুমি..

তখনি প্রিয়ম এসে,

“আরে তুই কখন এলি? ভালোই সারপ্রাইজ দিয়েছিস।আরে তোদের তো আলাপই হয়নি।এই যে তোর ভাবি। দেখতো কেমন লেগেছে?”

তুর্য মলিন একটা হাসি দিলো।তার ভিতর টা যে ছাড়খার হয়ে যাচ্ছে তা কেউ দেখতে পেলোনা।এত বড় সত্যের মুখোমুখি হতে হবে সে এটা চিন্তাও করেনি।এসেছিলো তো প্রজ্ঞাকে সারপ্রাইজ দিতে আর নিজেই সারপ্রাইজ হয়ে গেলো।

“রিদিতা ও হচ্ছে তুর্য তোমার দেবর এবং একমাত্র ননদের জামাই।” বলেই হাসতে লাগলো প্রিয়ম।

রিদিতা এখনো এক ধ্যানে চেয়ে আছে তুর্যের দিকে।এই দু বছরে কত চেঞ্জ এসেছে মানুষতার । কেমন যেনো ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে চেহারা।অথচ আগে কতই না প্রানবন্ত ছিলো ছেলেটি।

হঠাৎ খুব জোরে আওয়াজ হলো,

“আমরা এসে গেছি।”

চিল্লানিতে ঘোর ভাঙলো রিদিতার।প্রিয়মের সব ফ্রেন্ডরা এসে গিয়েছে।

এইদিকে প্রজ্ঞা তুর্যকে দেখে আকাশ থেকে পড়লো।তার রাগের থেকে বেশি ভয় হচ্ছে খুব বেশি ভয়।এই ভয়টাই সে পাচ্ছিলো।এখন যদি তুর্য তাকে ছেড়ে দেয়।

রেহেনা বেগম দূর থেকে দাড়িয়ে সব দেখছে।তার কেন যেনো মনে হচ্ছে খুব বড় ঝড় আসবে যা সব কিছু তছনছ করে দিবে।

তুর্য আসার পর থেকেই ড্র‍ইং রুমে বসে আছে।প্রজ্ঞার কাছে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেনা।তার ভিতর টা জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। বুকে কেমন চিন চিন ব্যাথা অনুভব হচ্ছে।এতোদিন পর এভাবে তার অতীতের মুখোমুখি হবে ভাবতে পারিনি সে।

রিদিতা আজ অনেক কিছু রান্না করেছে।সবাই তো খাবার দেখে সেই খুশি।একসাথে টেবিলে বসলো সবাই।রিদিতা সবাইকে খাবার সার্ভ করে দিচ্ছে।যেইনা তুর্যের প্লেটে খাবার দিতে যাবে তখনি প্রজ্ঞা এসে রিদিতার হাত থেকে খাবারটা নিয়ে ফেলে দিলো।উপস্থিত সবাই হতবম্ব হয়ে গেলো প্রজ্ঞার বিহেবে।প্রজ্ঞা রাগে কটমট করতে করতে চলে গেলো সেখান থেকে।

প্রিয়ম নিরব দর্শকের মতো চেয়ে আছে । তার কেমন যেনো খটকা লাগচগে।দুয়ে দুয়ে চার মিলাতে ট্রাই করছে। প্রিয়মের ফ্রেন্ডরা কিছু বললো না।চুপ করে খেতে লাগলো।তুর্য উঠে হাত ধুয়ে আবার ড্রইং রুমে যেয়ে বসে রইলো।

রিদিতা ওখানে আর দাড়িয়ে থাকতে পারলোনা।তার খুব কান্না পাচ্ছে।একটা সময় ছিলো যখন সে নিজ হাতে তুর্যকে খাইয়ে দিতো।রিদিতার রান্না তুর্যর কাছে অনেক পছন্দের ছিলো।আর আজ সবটা পালটে গেলো। নাহ আর কিছু ভাবতে পারছেনা রিদিতা।

প্রিয়মের ফ্রেন্ডরা খেয়ে দেয়ে চলে গেলো।সবারই মন খারাপ।প্রিয়ম রুমে এসে চোখ অফ করে শুয়ে আছে।কোনো কথা বলছে না কারো সাথে।

রিদিতার সব জানতেই হবে। কেন তুর্য তার সাথে এমন করলো।তার জীবনটাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে এলো।

রিদিতা রুম থেকে বেড়িয়ে দেখে তুর্য এখনো ড্রইং রুমে । চোখ অফ করে  বসে আছে।

“আমার আপনার সাথে কথা ছিলো মিস্টার তৌকির সরি তুর্য। আপনি আমার সাথে ছাদে চলেন।”,

রিদিতা দাঁতে  দাঁত চেপে বললো।

তুর্য কোনো কথা বলছেনা।ভাব টা এমন সে রিদিতার কথা শুনতেই পাচ্ছেনা।

রিদিতার রাগ এবার চরম পর্যায়ে চলে গেলো।

” আমি আপনাকে কিছু বলছি। আপনি কি শুনতে পাচ্ছেননা।আপনি কি চান আমি সবাইকে সবটা বলে দেই?”

তুর্য উঠে ছাদের  দিকে পা বাড়ালো।রিদিতাও পিছে পিছে যাচ্ছে।

ছাদের রেলিং ধরে দাড়িয়ে আছে দুজন।তুর্যর দৃষ্টি আকাশের দিকে। রিদিতার দিকে তাকাচ্ছেও না।

“আপনি আমার সাথে এমন কেনো করেলেন?কি দোষ ছিলো আমার।” চিৎকার দিয়ে বললো রিদিতা।

তুর্য তখনো রিদিতার দিকে তাকাচ্ছেনা।

“তোমাকে আজ একটা গল্প শুনাই হ্যা?”

রিদিতা চুপ করে আছে।তুর্য রিদিতার উত্তরের অপেক্ষা না করে

“আমি যখন ক্লাস ১০ এ পড়ি তখন আমার মা বাবা এক্সিডেন্টে মারা যায়।আমিও সাথে ছিলাম কিন্তু ভাগ্যের জোরে বেঁচে যাই।তখন আমাকে কেউ নিতে রাজি হয়নি।তখন আমার দিকে মমতার হাত বাড়ায় আমার খালামনি।আমাকে ঢাকা নিয়ে আসে।খালু মারা গিয়েছিলো অনেক বছর আগে।সে সব কিছু একহাতে সামলাতো।এত সমস্যার মধ্যেও সে আমাকে নিয়ে আসে। তখন প্রিয়ম ভাইয়া কলেজে পড়তো আর প্রজ্ঞা ৬ষ্ঠ শ্রেনিতে পড়ে। ভাইয়া অনেক বেশি পড়াশুনা নিয়ে বিজি থাকতো আর খালামনি জব করতো বিধায় প্রজ্ঞাকে কেউ সময় দিতে পারতোনা।আমি আসার পর ও যেনো খেলার সাথী খুঁজে পায়।ওর তো ওর বাবার স্মৃতিও কিছুই মনে নেই।এভাবেই দিনের পর দিন যেতে থাকে।প্রজ্ঞা আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝতোনা।আমি ওকে ছোট বোনের মতোই ভালোবাসতাম। তুর্য  ভাইয়া স্কলারশিপ পেলো কানাডা যাওয়ার।এইচএসসি তে খুব ভালো রেজাল্ট করায় সুযোগটা পেলো।এই সুযোগ কি আর হাত ছাড়া করা  যায়।ভাইয়া যখন চলে গেলো প্রজ্ঞার সে কি কান্না। ভাইয়া যাওয়ার পর থেলে প্রজ্ঞা আমার সাথে আঠার মতো লেগে থাকতো।খুব ভালোই যাচ্ছিলো দিনগুলো। আমি খালামনি প্রজ্ঞা খুব ভালোই ছিলাম।আমার কলেজ শেষ করে আমি যখন ভার্সিটিতে উঠি তখন প্রজ্ঞার থেকে একটু দুরত্ব  বজায় রেখে চলতে চেষ্টা করি।কারণ আমি ততদিনে বুঝতে পেরে গিয়েছিলাম ও  যে আমাকে পছন্দ করে।ভেবেছিলাম ছোট এগুলো শুধু আবেগ।কিন্তু আমি ওকে বোন ছাড়া আর কিছুই ভাবতাম না।”

এতটুকু বলে থেমে যায় তুর্য। রিদিতার দিকে এক পলক তাকিয়ে দেখে রিদিতা তার দিকে চেয়ে আছে।সে আবার বলতে শুরু করে,

“এভাই ২ বছর কেটে যায়।একদিন ফ্রেন্ডের সাথে ওর বোনের কলেজে যাই।ঐদিন ওখানে নবীন বরণ অনুষ্টান চলছিলো। সেদিন একটা মেয়ের দিকে আমার চোখ আটকে যায়।এতো সুন্দর করে কেউ নাচতে পারে আমার জানাই ছিলো না। ”

রিদিতা এবার একটু অবাক হয়।

“অবাক হওয়ার কিছু নেই।আমি তোমাকে আগে থেকেই চিনতাম।তোমার নাচ দেখেই আমি তোমার প্রেমে পড়ে যাই।ফ্রেন্ডের মাধ্যমে তোমার খোঁজ লাগাই।তোমাকে ফলো করা শুরু করি। ”

“কই তুমি তো আমাকে এগুলো বলো নি। ” রিদিতা অবাক হয়ে বললো।

“চেয়েছিলাম বলতে কোনো এক বিশেষ দিনে।কিন্তু আফসোস ঐদিনটা আর আসবেনা।তাই আজকে বলছি।এরপর সাহস করে আমি তোমাকে প্রপোজ ও করে ফেলি।তোমাকে আমি পাগলের মতো ভালোবাসতাম।কিন্তু সবার কপালে কি সুখ সয় নাকি।আমাদের ভালোবাসায় নজর পড়ে গিয়েছিলো কারো।প্রজ্ঞা ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলো আমি ওকে এভয়েড করা শুরু করেছি।ও পাগলের মতো আচরণ করতে থাকে।কখনো হাত কাটা।আবার কখনো রাতে আমার রুমে চলে আসা।খালামনি ওকে আটকাতে পারছিলো না।আমি তোমাকে কিছু জানাতে চাইনি কারণ তুমি কষ্ট পেতে।দেখা যেতো তুমি সারাদিন টেন্সন করতে।আমি তোমাকে কোনো প্যারা দিতে চাইনি।আমাদের রিলেশনের যখন ২ বছর শেষ হলো তখন একদিন ও আমার ফোনে তোমার আর আমার ছবি দেখে ফেললো।তারপর থেকে শুরু হলো ওর পাগলামি।নিজের চুল নিজে ছিড়তো।অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতো খাবার খেতোনা।পড়ালেখা করতোনা।খালামনির কোনো কথাই শুনতোনা।ও দিনে দিনে সাইকো হয়ে যাচ্ছিলো।খালামনি আমাকে নিষেধ করে দিয়েছিলো আমি যাতে প্রিয়ম ভাইয়াকে কিছু না বলি।খালামনি প্রজ্ঞাকে কেমন যেনো প্রস্র‍য় দিতো।ওর কোনো দোষই চোখে পরে না।আমার উপর কেমন যেনো মানসিক প্রেশার আসা শুরু করলো।খালামনি আমাকে বললো আমি যাতে তোমাকে ছেড়ে দেই।কিন্তু আমি পারিনি।নিজের ভালোবাসাকে কিভাবে ছেড়ে দিবো আমি। ছোটবেলার থেকে সব হাড়িয়ে আমি শেষ হয়ে গিয়েছিলাম।তোমাকে আকরে ধরে বাঁচতে চেয়েছিলাম কিন্তু আল্লাহ অন্য কিছুই লিখে রেখেছিলো আমার কপালে।আমার জন্মদিনের দিন প্রজ্ঞা খুব সুন্দর গোলাপি শাড়ি পড়েছিলো। কেক নিয়ে আমার জন্য বসেছিলো।কিন্তু আমি তোমার সাথে দেখা করবো এটা ও কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি।আমাকে বেড় হতে দিতে চাচ্ছিলোনা।ঐদিন রাগের মাথায় আমি ওকে থাপ্পর দিয়ে বসি।তারপর বাসা থেকে বেড়িয়ে যাই।কিছুদূর যাওয়ার পরই খালামনির ফোন আসে প্রজ্ঞা দরজা আটকে রেখেছে খুলছেনা।আমি আবার বাসার দিকে ব্যাক করি।যেয়ে দেখি প্রজ্ঞা ঐ শাড়ি দিয়েই গলায় ফাস দিয়েছস।

খালামনি তো কান্নাকাটি শুরু করে দেয়।আমাকে দোষারোপ করতে থাকে।ওকে হসপিটালে নিয়ে যাই।অনেক কষ্টে ওকে বাঁচানো হয়।ডাক্তার বলেছিলো ওকে মানসিক চাপ দিলে ও আবার এমন ভয়ানক কিছু করে ফেলতে পারে।

ঐদিন খালামনি আমাকে ডেকে যা বললো তা শুনার পর মনে হলো এর থেকে মৃত্যুই ভালো।

“আমি দুধ কলা দিয়ে তোর মতো কালশাপ পুষেছিলাম।তোর জন্য আজ আমার মেয়েটার এই অবস্থা।নিজের বাবামাকেও খেয়েছিস এখন আমার মেয়েটার পিছে পড়েছিস তাইনা!কেন রে আমার মেয়েটা কোনদিক দিয়ে কম যে তুই ওকে এতো কষ্ট দিচ্ছিস।এই দিন দেখার জন্য তোকে আমি নিয়ে এসেছিলাম!এর থেকে ভালো তুই ঐদিন মরে যেতি।তোকে এতো আদর  দিয়ে বড় করেছি আমাকে এই দিন দেখাতে।তুই সবকিছুর প্রতিদান আমাকে দিবি প্রজ্ঞাকে বিয়ে করে।যদি তুই প্রজ্ঞাকে বিয়ে না করিস তাহলে আমি আর আমার মেয়ে এখানেই সুইসাইড করবো।তারপর তুই সুখে থাকিস তোর রিদিতাকে নিয়ে।অভিশাপ দিলাম আমি তোকে তুই কোনোদিম সুখী হতে পারবিনা।আজ আমার মেয়ে যেই কষ্ট পাচ্ছে তুই এর থেকেও বেশি কষ্ট পাবি।”

এতটুকু বলের তুর্য থেমে যায়।তার গলা কাঁপছে।কথা আটকে আসছে।

রিদিতা তার এক হাতে তুর্যের হাতের উপর রাখলো,

“ঐদিন আমার কিছু করার ছিলোনা।মায়ের সমান খালামনিকে আমি কিভাবে মরতে দেই বলো।তাইতো এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম।তোমার থেকে দূরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত।  ঐদিনই কাজি ডেকে আমার আর প্রজ্ঞার বিয়ে হয়ে গেলো।এক নিমেষেই যেনা সব শেষ হয়ে গেলো।আমি কিছুই করতে পারলামনা।আমার পুরো জীবনটা আবার বদলে গেলো। আমি প্রজ্ঞাকে নিয়ে খুলনা চলে যাই।ওখানে ওদের ফ্ল্যাট আছে। যাতে তুমি আমাকে খুঁজে না পাও।ওখানে যেয়েও আমার শান্তি হয়নি।প্রজ্ঞা আমাকে বিয়ে করেও তোমাকে নিয়ে সন্দেহ করতো।আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম ওর সাথে মানিয়ে নেওয়ার কিন্তু পেরে উঠছিলামনা।ওর পাগলামি আরো বারতে লাগলো।ওর জন্য আমার চাকরিটাও গেলো।কারণ ও আমাকে অফিস যেতে দিতো না সবসময় ওর সাথে থাকা লাগতো।মাঝে মাঝে মনে হতো সুইসাইড করি।কিন্তু এটা যে মহাপাপ।ধীরে ধীরে প্রজ্ঞার প্রতি আমার এক মায়া জন্মায়।আমি ওর সব পাগলামি গুলোকে দেখেও না দেখার ভান করতে থাকি।কিন্তু আমার মনে আজও তুমি রয়ে গিয়েছো।আমি চাইলেও পারিনি তোমাকে ভুলতে।এটাই প্রজ্ঞাকে কুড়ে কুড়ে খায়।খালামনি আমাকে অভিশাপ দিতে গিয়ে যে তার মেয়েকেও অভিশাপ দিয়েফেলেছে।কারণ তার মেয়ে যে আমারই জীবনের একতা অংশ।কিন্তু এতো কিছুর পরও আমি প্রজ্ঞাকে সুখী করতে পারিনি।”

রিদিতা এবার নিজেকে আর আটকে রাখতে পারলোনা।তুর্যকে ধরে কাঁদতে লাগলো।কিন্তু তুর্য রিদিতাকে ধরছেনা।এই অধিকার যে অনেক আগেই সে হারিয়েফেলেছে।

আচমকাই রিদিতাকে ধাক্কা দিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দিলো…

চোখের পলকেই যেনো পুরো ঘটনাটা ঘটে গেলো।

৫ বছর পর,

প্রিয়ম বৃদ্ধাশ্রমের সামনে দাড়িয়ে আছে।আজকের এই দিনে সে প্রতিবছর বৃদ্ধাশ্রমে আসে।কেনোনা আজকের এই দিনেই ৫ বছর আগে তার পুরো জীবনটা এক নিমেষেই যেনো তছনছ হয়ে গিয়েছিলো।আর কিছু না ভেবে সে পা বাড়ালো…..

চলবে

লেখকঃ তানি তাস রীত

 

পথিক/নিউজ/অনামিকা

  • 10
    Shares
  • 10
    Shares