392 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

আগেভাগেই খোঁড়া হচ্ছে কবর, গোসলেও লাইন

আগেভাগেই খোঁড়া হচ্ছে কবর, গোসলেও লাইন

  • 16
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    16
    Shares

পথিক রিপোর্ট: করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সংক্রমণে মৃতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ফের চাপ বেড়েছে রাজধানীর নির্ধারিত কবরস্থানে। মৃতের সৎকার কাজের চাপ সামলাতে আগেভাগেই কবর খুঁড়ে রাখছেন গোরখোদকরা। করোনায় মৃতদের লাশের গোসল করাতেও ব্যস্ততা বেড়েছে এসব কাজের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের।

রাজধানীতে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম ও আল মারকাজুল ইসলামীর মৃতদেহ সৎকারের শেষ গোসলের জন্য লাশ নিয়ে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে আত্মীয়স্বজনদের। রায়ের বাজার কবরস্থান ও মৃতদেহ সৎকার কাজের সঙ্গে জড়িত স্বেচ্ছাসেবী ওই দুটি প্রতিষ্ঠানে সরেজমিন পরিদর্শন করে এমন চিত্রই ধরা পড়েছে।

চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে করোনা পরিস্থিতি দিন দিন চরম অবনতির দিকে যাচ্ছে। আগের দিনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পরের দিন বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। সর্বশেষ সোমবার করোনায় মারা গেছেন ৮৩ জন- যা এ যাবতকালের সর্বোচ্চ মৃত্যু। এই সময়ে আরো ৭ হাজার ২০১ জনের শরীরে পাওয়া গেছে করোনার উপস্থিতি।

করোনার এমন অবনতিশীল পরিস্থিতিতে চিকিৎসায়ও দেখা দিয়েছে নানা সংকট। রাজধানীর অধিকাংশ হাসপাতালেই নির্ধারিত আসনের চেয়ে অধিকাংশ রোগী ভর্তি রয়েছে। ফলে নতুন করে কোনো রোগী ভর্তি নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই করোনা আক্রান্ত রোগীকে নিয়ে স্বজনরা ছুটছেন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। আবার হাসপাতালে যারা আসছেন তাদের মধ্যে অধিকাংশেরই অক্সিজেন লেভেল কমে আসায় প্রয়োজন হচ্ছে উচ্চ মাত্রার অক্সিজেন। ফলে প্রতিটি হাসপাতালেই চলছে অক্সিজেন নিয়ে কাড়াকাড়ি।

সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট বা ধরণ দেখা দেয়ার পর থেকেই আক্রান্তদের অল্প সময়ের মধ্যেই দেখা দিচ্ছে শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি। এদের অধিকাংশদের দেখা দেয় তীব্র শ্বাসকষ্ট। এতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে রোগী এত বেশি যে, এই আইসিইউ এখন সোনার হরিণ। কোনো রোগী ভালো হলে কিংবা মারা গেলেই কেবল আইসিইউ শয্যা খালি হচ্ছে। আইসিইউর জন্য ভিআইপিদের সুপারিশও কোনো কাজে আসছে না।

চিকিৎসকরা বলছেন, করোনায় আক্রান্ত হয়ে যারা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চলে যান তাদের বেশিরভাগেরই দরকার হচ্ছে উচ্চমাত্রার অক্সিজেন। এর জন্য দরকার হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার। সাধারণ সিলিন্ডারে প্রতি মিনিটে ১৫ লিটার অক্সিজেন দেয়া সম্ভব। করোনা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে যাদের দরকার হয় তাদের ৫০ ভাগ সুস্থ হয়ে যান ১৫ লিটারের মধ্যেই। কিন্তু এর পরও যাদের দরকার হয়, তাদের জন্য হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা যন্ত্র লাগে। ওটা দিয়ে ৮০ লিটার পর্যন্ত অক্সিজেন দেয়া যায়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন আইসোলেশন ওয়ার্ডে দায়িত্বরত ডা. শাহরিয়ার খান বলেন, হাসপাতালে ৬০-৭০টি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা আছে। কিন্তু করোনা আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন করোনা রোগী ভর্তি আছেন প্রায় এক হাজার। দেখা যাচ্ছে অনেক রোগীর হঠাৎ করেই অক্সিজেন কমে যাচ্ছে। তখন মেশিন নিয়ে শুরু হয় টানাটানি। তুলনামূলক একটু ভালো রোগীর স্বজনকে বুঝিয়ে যার বেশি প্রয়োজন তাকে দিতে হচ্ছে। তবে এ নিয়ে হাসপাতালে চিৎকার-চেঁচামেচি লেগেই আছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, কোনো কারণে যদি হঠাৎ কারো অবস্থা ভালো হয়, তাকে বুঝিয়ে যার অবস্থা বেশি খারাপ তাকে ক্যানুলা দিতে বাধ্য হচ্ছি আমরা। কিন্তু এটা সমাধান নয়। আইসিইউতেও এই একই যন্ত্র দিয়ে রোগীকে অক্সিজেন দেয়া হয়। আর একদম শেষ পর্যায়ে গেলে তবেই রোগীকে ভেন্টিলেশনে (কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা) দেয়া হয়।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. খলিলুর রহমান জানান, ‘এখন রোগীদের এত অক্সিজেন দরকার হচ্ছে যে সংকট লেগেই আছে। এ হাসপাতালে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা রয়েছে ২০টি। তার মধ্যে কয়েকটি আবার কাজ করে না। ১২-১৩টি ঠিক আছে। ক্যানুলা চালানোর মতো সবাই দক্ষ নয়। চালাতে না পারার কারণেও নষ্ট হয়েছে কিছু।

রায়েরবাজারে আগে থেকেই খুঁড়ে রাখা হচ্ছে কবর: রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থান। এখানকার ৮ নম্বর ব্লকটি নির্ধারিত করা আছে করোনায় মৃতদের দাফন জন্য। গত বছর মার্চ মাসে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম দফায় খিলগাঁও তালতলা সরকারি কবরস্থানে মৃতদের দাফন শুরু হয়। কিন্তু স্থান সংকুলান না হওয়ায় ২৭ এপ্রিল থেকে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন শুরু হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, গোরখোদকরা একটার পর একটা কবর খুঁড়ছেন। কার প্রিয়জন এই কবরে শায়িত হবেন তা তারা জানেন না। শুধু জানেন, করোনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তাদের আবারো আগের মতো কবর খুঁড়তে হবে।

রায়ের বাজার কবরস্থানে সিটি করপোরেশনের নিযুক্ত ড্রেসার মোহাম্মদ আলী বলেন, অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ আনার পর স্বজনরা যদি চান কবরস্থানের প্রবেশমুখে মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে জানাজা শেষে লাশবাহী গাড়ি চলে যায় ৮ নম্বর ব্লকে। এরপর নির্দিষ্ট কবরে দাফন করে দ্রুত কবরস্থান ত্যাগ করেন আত্মীয়স্বজনরা।

শুকুর আলী নামের এক গোরখোদক জানান, মাঝে লাশ দাফন একেবারেই কমে গিয়েছিল। এখন তো রাতদিন কবর খুঁড়েছি। গত ৪-৫ দিন ধরে লাশের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায়, আমরা আগে থেকেই কবর তৈরি করে রাখছি।

আরেক গোরখোদক আসলাম জানান, কবরস্থানে প্রায় ২৫-৩০ জন গোরখোদক রয়েছেন। এরা কেউই সিটি করপোরেশন থেকে পারিশ্রমিক পায় না। কবর দেয়ার পর মৃতের আত্মীয়স্বজনরা বকশিশ দেন। কবর দিতে বাঁশ ও বেড়া কিনে এনে তারাই সরবরাহ করেন। এসবের দাম আত্মীয়স্বজনরা দিয়ে থাকেন। সব মিলিয়ে একটা কবর দিতে ১ হাজার টাকা থেকে দেড় হাজার টাকা খরচ হয়। তবে আত্মীয়রা খুশি হয়ে এর বেশিও টাকা দেন।

  • 16
    Shares
  • 16
    Shares