আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের মক্তব

লেখক:
প্রকাশ: ৬ মাস আগে
মক্তব

শীতের সকাল, কুয়াশায় চারদিক অন্ধকারাচ্ছন্ন। ঘাসের উপর জমে আছে শিশির। খোড়ারে থাকা মুরগি গুলোও জেগে উঠেছে। মসজিদের মাইকে খানিক আগে ফজরের আযান পড়েছে।বাবা চাচারা মসজিদে গিয়েছে ফজরের নামাজ আদায় করতে। মা চাচিরাও শুয়ে নেই ,ফজরের নামাজ আদায় করে, কুরআনের সুমধুর তেলাওয়াতে চারপাশ আন্দলিত করে তুলছে।
আমরা তখনও বিছানায়, মা আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে আমাদেরকে জাগিয়ে দিতেন মক্তবে যাওয়ার জন্য, আমরাও তড়িঘড়ি করে ওঠে যেতাম।
কারণ দুই মিনিট দেরি হলে ওস্তাদজি আমাদেরকে শাস্তি দিবেন। মা শার্টের পকেটে ,প্যান্টের পকেটে মুড়ি ভরে দিতেন, আমরাও খুশি হয়ে চলে যেতাম মক্তবে।
আজ এই দৃশ্যগুলো গ্রাম শহর সবখানেই বিলীন হয়ে গিয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়ায়। এখন আমরা আমাদের অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে, ভুলে গিয়েছি আমাদের অস্তিত্বের শেকড়। দ্বীন ধর্মের প্রতি আমাদের বড্ড অবহেলা জন্মেছে। এখন আর মায়েরা ঘুম থেকে জাগিয়ে মক্তবে যেতে বলেন না। ঘুম থেকে জাগিয়ে কিন্ডার গার্ডেনের বই ধরিয়ে দেয়। অ,আ,ই,,A,B,C,1,2,3. এইগুলো শিখতে পারলেই তৃপ্তির ডেকোর তুলে। ছেলেমেয়েদের কোরআন, দ্বীন, ধর্ম শেখানোর ক্ষেত্রে কোন আগ্রহই নেই। শতকরা ৯০% ছেলে-মেয়ে কোরআন দ্বীন ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ। কারণ মা বাবা তাদেরকে ধর্ম শেখানোর প্রতি আগ্রহ দেখায় নেই। যতটা আগ্রহ দেখেছিল আধুনিক শিক্ষা শিক্ষিত হওয়ার জন্য । অথচ মা-বাবার উচিত ছিল সবার আগে সন্তানদের দ্বীন শিক্ষা নিশ্চিত করা।
সন্তানের প্রতি মা–বাবার দায়িত্ব ও হকের বিষয়ে ইসলাম স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এবং সব থেকে যে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো সন্তানকে দ্বীন শিক্ষা দেওয়া, নামাজ শিক্ষা দেওয়া ও ইসলামের মৌলিক জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া।
কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেন ।
طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ
বাংলা অর্থ
ইলমে দ্বীন শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ।
(ইবনু মাজাহ: ২২৪)
এই হাদিস এটা প্রমাণ করে যে, দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করা কেবল আলেমদের দায়িত্ব নয়, বরং প্রত্যেক মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম আরো বলেন।

قال رسول الله ﷺ:
“كلكم راعٍ، وكلكم مسؤول عن رعيته…”
– رواه البخاري ومسلم

বাংলা অর্থ:
“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকের কাছে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। ইমাম (নেতা) দায়িত্বশীল তার প্রজাদের ব্যাপারে… এবং একজন ব্যক্তি তার পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল…।”

এই হাদিসে বোঝা যায়, মা-বাবার ওপর সন্তানের শরীয়ত ও দুনিয়াবি সব বিষয়ে সঠিক লালন-পালনের দায়িত্ব রয়েছে। তাদের ভালো শিক্ষা দেওয়া, আদব শেখানো, হালাল-হারামের জ্ঞান দেওয়া—এগুলো মূল দায়িত্ব।

আরেকটি হাদিস:
قال النبي ﷺ:
“ما نحل والد ولداً أفضل من أدب حسن
رواه الترمذي

বাংলা অর্থ:
কোনো পিতা তার সন্তানের প্রতি উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়ার চেয়ে উত্তম কোনো দান করতে পারে না।”

হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায়, সন্তানের প্রতি মা-বাবার দায়িত্ব শুধু খাওয়ানো-পড়ানো নয়, বরং তার নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষাও নিশ্চিত করা জরুরী।

কিন্তু আফসোসের সাথে বলতে হয় আমাদের শৈশবের দ্বীন ধর্ম শিক্ষার মারকাজ মক্তবগুলো আজকালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে।
কয়েক বছর পর হয়তো আমাদের এই সুমধুর স্মৃতিগুলো রূপকথার গল্প হয়ে থাকবে