711 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

আমি বাংলায় গান গাই আমি বাংলার গান গাই : শেখ আবুল খায়ের আনছারী

  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করছি মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন করে যারা শাহাদাৎ বরণ করেছেন, বাঙ্গালীর স্বাধীকার আন্দোলনকে বেগবান করতে যারা অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছে নিজের জীবন, যাদের রক্তে শুদ্ধ হয়েছে বাঙালী জাতি, সেই সব বীর শহীদদের আত্মার মাগফেরাত ও শান্তি কামানা করছি। তাঁদের এই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগে আমরা পেয়েছি অমৃতসম মায়ের ভাষা, প্রাণের ভাষা, গানের ভাষা, ভাবের ভাষা, আবেগের ভাষা বাংলা ভাষা। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙ্গালী জাতির জাতীয়তাবাদের এক অমলিন স্মৃতি। এই একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমরা হারিয়েছি আমাদের স্বজন-প্রিয়জনদের। যাদের রক্তের বিনিময়ে মায়ের ভাষায় কথা বলার পূর্ণ অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মা-মাটি আর মাতৃভাষার জন্য ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যাদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকার রাজপথ তাদের ঋণ কোনদিনও শোধ হবে না।
বাঙালি জাতি হিসাবে আজ আমরা গর্বিত। কিন্তু, বাঙ্গালির জাতীয় জীবনে একুশের চেতনা ও আজকের বাংলা ভাষার ব্যবহার দেখলে বিষ্মিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে মনে হয় বাংলা ভাষা করো দানে কিংবা কুড়িয়ে পাওয়া কোন কিছু। ছেলে মেয়ে ইংলিশে শতকরা আশি নাম্বর পেলে মা-বাবা খুশিতে আত্মহারা হন কিন্তু বাংলায় চল্লিশ কিংবা তারও কম নাম্বার পেলে দুঃখ করনে না। বাংলায় ফেল করার ইতিহাসও নেহায়েত কম নয়। এই হলো আমাদের বাংলা প্রীতি।
আমরা যদি ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যায় বাঙ্গালী ও বাংলাদেশের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন একটি ঐতিহসিক ঘটনা। পাকিস্তানের শতকরা ৫৬ ভাগ মানুষের ভাষা বাংলা হওয়া সত্বেও রাষ্ট্রভাষার ক্ষেত্রে বাংলা উপেক্ষিত ও অবহেলিত হতে থাকে। বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে এ ষড়যন্ত্র ব্রিটিশ আমল থেকেই শুরু হয়। আমাদের রাষ্ট্রভাষা কি হবে এ নিয়ে ১৯৪৭ সাল থেকেই শুরু হয় নানা জল্পনা কল্পনা । আমাদের ভাষা আন্দোলন পৃথিবীর ইতিহাসে এক অন্যতম নজির স্থাপন করেছে। দেরীতে হলেও বিশ^ বিবেক বিষয়টি তাদের বোধোদয় হয়েছে এবং ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সারা বিশে^ এখন একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালিত হচ্ছে। আফ্রিকান দেশ সিয়েরালিওনে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা স্বীকৃতি দিয়ে বাংলা ভাষা ও বাঙ্গালিকে অধিকতর সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে বিশ^ দরাবারে। বাংলা ও বাঙালি জাতীয়াতাবাদের জন্য এটি একটি বড় অর্জন। এ অর্জন এমনিতে হয়নি, একদিনে হয় নি, এর জন্য আমাদেরকে রাজপথে বুকের তাজা রক্ত বিসর্জন দিতে হয়েছে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সালাম,্বরকত, রফিক, জব্বার প্রমুখ রাজপখে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে ইতহাসের পাতায় চির অমর হয়ে আছেন। শ্রদ্ধার সাথে বাঙ্গালী জাতি সেসব সূর্য সন্তানদের স্মরণ করবে আজীবন। সেদিন তাঁদের আত্মদানের ফল হিসাবে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে। তাই ভাষা আন্দোলন জাতীয় জীবনে এক অনন্য ঐতিহাসিক ঘটনা। জাতিসত্তার বিকাশে ভাষা আন্দোলনের রয়েছে গৌরবোজ্জল ভুমিকা। শুধু বাঙ্গালী জাতির নয় একুশ এখন আধুনিক বিশে^র বিপন্ন ভাষাগুলোকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণার উৎস।
একুশে ফেব্রুয়ারি মিশে আছে আমাদের চেতনায়, আমাদের প্রেরণায়, আমাদের রক্ত ধমনীতে শিহরণ জাগায় একুশে ফেব্রুয়ারি। একুশ মানে রক্তের অক্ষরে লেখা লাল টক টকে রক্তাক্ত ইতিহাস। একুশ আমাদের অহংকার,একুশ আমাদের গর্ব। একুশ আমাদের শুন্য হিয়ায় আকাশ ভরা তারা, একুশের প্রেরণায় উজ্জিবীত হই আমরা।
ভাষা, চিন্তা-চেতনা, মনন ও অন্তরের ভাব-ভাবনা প্রকাশের কেবল বাহনই নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দেশ ও জাতির আত্মপরিচয়, সমাজ-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি সহ সব ক্ষেত্রে নিজস্ব স্বকীয়তা। হাজার বছর ধরে বাংলা ভাষা প্রকাশ করে যাচ্ছে বাঙ্গালী জাতির অস্তিত্ব স্বকীয়তা। কিন্তু সাতচল্লিশে ভাষা,সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও নৃতত্ত্বগত কোনো মিল না থাকার পরও চৌদ্দশ মাইল ব্যবধানের দুটি পৃথক ভুখন্ডকে মিলিয়ে একসঙ্গে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল শুধু মাত্র ধর্মভিত্তিক সাদৃশ্যের কারণেই। বাঙ্গালিরা এটা মেনে নিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানিরা দুরভিসন্ধিমুলকভাবে বাঙ্গালির ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক আঘাত হানার উদ্দেশ্যে এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যকে মুছে ফেলার অপচেষ্টার অংশ হিসাবে করাচির শিক্ষা সম্মেলনে সাধারণ মানুষদের ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রতারিত করে উর্দুকে একমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গ্রহণ করে। অথচ সেই সময় বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্টি ছিল ৫৬% যেখানে উর্দু ভাষাভাষীর সংখ্যা মাত্র ৭.২%। এই অযৌক্তিক দাবির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় তমুদ্দন মজলিশ, যাতে তরুন জননেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ভুমিকা ছিল অনন্য। উনিশশ সাতচল্লিশ সালের আগষ্টে স্বাধীনতা লাভকারী পাকিস্তানিরা বাঙ্গালির মনস্তাত্তিক দিক বিবেচনা না করে সরলমনা বাঙ্গালিকে তাদের দাসত্বে পরিনত করার জন সুপরিকল্পিত ভাবে মাত্র তিন মাস পরেই রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার কথা ঘোষণা দেয়। ইংরেজরা শুধু ব্যবসা-বণিজ্য করার উদ্দেশ্য নয় এ দেশকে শোষণ করার মহা পরিকল্পনা নিয়ে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। তারাও বুঝেছিল বাঙ্গালিকে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যিগত শক্তি বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হলে মাতৃভাষা বিচ্ছিন্ন করতে হবে। কিন্তু ইংরেজরা ছিল বুদ্ধিমান, তাই তারা তাদের মিশন বাস্তবায়নের জন্য একবারে ইংরেজি ভাষাকে বাঙ্গালির ওপর না চাপিয়ে তারা বরং সুপরিকল্পিতভাবে আগাতে লাগলো। তাদের ধারণা ছিল ভিন্ন ভাষাভাষী লোকের ওপর হুট করে কোন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে তারা না মেনে আন্দোলন করতে পারে। তাই তারা অপেক্ষা করতে চাইল এবং তারা বুঝে নিয়েছিল যে, এক সময় ভারতীয়রাই ইংরেজি শেখার প্রতি আগ্রহ দেখাবে তখন তাদের প্রয়োজনেই ইংরেজি শিখবে। উনিশ শতকের শুরুতে খ্রিস্টান মিশনারী স্যার উইলিয়াম কেরি এবং পরে রাজা রাম মোহন রায়,ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর, নওয়াব আব্দুল লতিফ, সৈয়দ আমির আলী প্রমুখ শিক্ষিত বাঙ্গালির প্রচেষ্টায় এদেশের হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়কে আধুনিক বিশে^র সঙ্গে সম্পৃক্ত করার মানসে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি মনোযোগী করার জন্য জনমত তৈরী হতে থাকে। এভাবেই পর্যায়ক্রমে অনুকূল পরিবেশ তৈরী হলে এ দেশে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার বাড়তে থাকে। কিন্তু পাকিস্তানিরা জানতো না যে বাঙ্গালী দাসত্ব মেনে নিবেনা। পাকিস্তানিদের তর সয়ছিল না। তারা কৃষকের হাসের সোনার ডিমের গল্পের মতই হাসকে একবারে জবাই করে বড়লোক হওয়ার লোভে পরে মিশন বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়। আর বাঙ্গালিরাও অল্প সময়ে বুঝে নিয়েছিল তাদের সাথে সহবস্থান সম্ভব নই। তাই প্রথমেই ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ে।
বিজাতীয় আগ্রাসনে বাংলা ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। কিছু বিষয় পর্যালোচনা করলে বিষয়টি প্রতিয়মান হবে। আজকাল অনেক পরিবারের বাচ্চাদের দেখা যায় তারা মোবাইল গেমস কিংবা টিভিতে কার্টুন না দেখলে তাদের খাওয়াই হয়না। বাচ্চারা পড়া-লেখার চেয়ে এ বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সে ক্ষেত্রে মা-বাবা তার আদরের সন্তানকে মোবাইল গেমস কিংবা টিভি কার্টুন দিয়ে সন্তুষ্ট রাখতে চেষ্টা করে থাকেন। সেটি বাচ্চাদের জন্য ক্ষতিকর। চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এতে বাচ্চাদের মারাত্বক স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে। চিন্তার বিষয় হলো চ্যানেলগুলোতে যে কার্টুন প্রচারিত হয় তা বেশির ভাগ ইংলিশ কিংবা হিন্দি ভার্সনের। মা-বাবার খাড়া যুক্তি হলো ছোট থেকে ইংলিশের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারলে ভবিষ্যতে ইংরেজিতে ভাল করতে পারবে। কিন্তু আমাদেরকে মনে রাখতে হবে আমার সন্তান ইংরেজি জানবে ঠিক আছে তবে, বাংলা ভাষা ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদকে প্রশ্নবিদ্ধ করে নয়। শিশুরা যা দেখে তাই সে শিখে, তাই ইংরেজি কিংবা হিন্দির চেয়ে মাতৃভাষা বাংলাকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। অতি উৎসাহী কিছু মা-বাবা মনে করে ইংলিশ মিডিয়ামে তার সন্তান পড়া লেখা করলে তার ক্যরিয়ার উজ্জল হবে। সে জন্য সন্তানকে ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করে। ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা তাই ইংরেজি আমাদেরকে জানতে হবে, কিন্তু ভিনদেশী ভাষার প্রতি অতি উৎসাহী হয়ে নিজের মাতৃভাষাকে অবহেলা করার কোন অবকাশ নেই। সে জন্যই হয়তো মনে ক্ষোভ নিয়ে কবি আব্দুল হাকিম বলেছিলেন; “যেসব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি”। আমরা যেন আমাদের মায়ের ভাষা, প্রাণের ভাষা, রক্তের দামে কেনা ভাষাকে অবহেলা না করি, অবমূল্যায়ন না করি সে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে পারলে তাকে বাহবা দেবার লোকের অভাব হয়না। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের উচ্চতর ডিগ্রিধারীকে অবহেলা না করলেও তার যথাযোগ্য মূল্যায়ন কমই হয়ে থাকে। অথচ সেই ইংরেজি সাহিত্যে বাংলা ও বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ, বাঙ্গালির ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে তেমন কোন আলোচনা নেই বললেই চলে সে কথা আমরা ক’জনই বা জানি?
আসুন, ভাষা আন্দোলনের এই মাসে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, রক্তের দামে কেনা এই অমূল্য রত্ন মায়ের ভাষা, প্রাণের ভাষা বাংলাকে আর অবহেলা করব না। অন্তর থেকে বলি, আমরা তোমাদের ভুলি নাই ভুলবনা বাংলা মায়ের সুর্য সন্তানেরা।
আমি বাংলায় গান গাই
আমি বাংলার গান গাই
আমি, আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই।

  • 2
    Shares