248 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

আলী যাকের: বহুমুখী গুণের ব্যক্তিত্ব ‘আক্ষরিক অর্থেই একজন নক্ষত্র’

আলী যাকের। ছবির উৎস,IRESH ZAKER FACEBOOK PAGE,

  • 6
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    6
    Shares

অনলাইন ডেস্কঃ

সত্তরের দশকে মঞ্চ কাঁপানো নূরুলদীন কিংবা নব্বই দশকে টিভি নাটকের ‘বড় চাচা’ সব রূপেই দর্শকের মন জয় করেছেন আলী যাকের।

এছাড়া বাংলাদেশে সঠিক সময়ে নাটক মঞ্চস্থ এবং টিকেট কেটে নাটক দেখার প্রচলন তার হাত ধরেই হয়েছিল বলে জানিয়েছেন নাট্য ব্যক্তিত্ব এবং আলী যাকেরের দীর্ঘদিনের সহকর্মী মামুনুর রশিদ।

তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। সেখানে তখন আলী যাকের খবর পাঠের পাশাপাশি শ্রুতিনাটক করতেন।

তার দরাজ কণ্ঠ শুনে মামুনুর রশিদ তাকে নাটকে অংশ নিতে বলেন।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে আলী যাকের আরণ্যক নাট্যদলের মাধ্যমে মঞ্চ নাটকের জগতে প্রবেশ করেন।

তার প্রথম নাটকটি ছিল মুনির চৌধুরীর কবর। কেন্দ্রীয় ‘নেতা’ চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের কারণে থিয়েটারে রাতারাতি জনপ্রিয় মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। পরবর্তীতে যোগ দেন নাগরিক নাট্যদলে।

নূরুলদীনের সারাজীবন, বাকি ইতিহাস, কোপেনিকের ক্যাপ্টেনসহ অনেক আলোচিত মঞ্চনাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি তুখোড় নির্দেশনা দিয়ে গেছেন আলী যাকের।

আশি ও নব্বইয়ের দশকে বহুব্রীহি, আজ রবিবারের মতো টেলিভিশন নাটকেও ছিল তার সফল পদচারণা। নদীর নাম মধুমতী, লালসালুসহ ৪টি চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রূপ দিয়েছেন।

তার মৃত্যু সংস্কৃতি অঙ্গনের এক অপূরণীয় ক্ষতি বলে জানিয়েছেন নাট্য ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশিদ।

আলী যাকের এ পর্যন্ত সংস্কৃতি ও সমাজের নানা দিক নিয়ে একাধিক বই রচনা করেছেন । এছাড়া পত্রিকাতেও কলাম লিখতেন নিয়মিত। মৌলিক টিভি নাটক রচনার পাশাপাশি অনেক বিদেশি নাটক তিনি রূপান্তর করেছেন।

ছিলেন শৌখিন ফটোগ্রাফার। ফটোগ্রাফিতে দক্ষতার কারণে এই শিল্পী যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ফটোগ্রাফি সোসাইটির স্থায়ী সদস্যপদ পেয়েছিলেন।

বৈচিত্র্যময় এমন নানা গুণের কারণে আলী যাকের হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্বতবে তিনি সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে।

নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরতে তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি হয়ে কাজ করেছেন আমৃত্যু পর্যন্ত।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আরেক ট্রাস্টি মফিদুল হক জানান, এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা ও প্রসারে আলী যাকের কঠোর অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন।

তিনি বলেন, “স্বাধীনতার সময়ে একসময় দুঃসময় যাচ্ছিল। সে সময় আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে একটা জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করি। ১৯৯৫ সালে ট্রাস্ট গঠন হয়। এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় যাকের ভাইয়ের ভূমিকা ছিল অনেক শক্তিশালী। যেকোনো কিছু উপস্থাপনে তার ছিল অসামান্য পারদর্শিতা। মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা থাকায় অনেক সংকট তিনি মোকাবেলা করে গেছেন। যার ফলশ্রুতিতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আজকের রূপ পেয়েছে।”

প্রগতিশীল সংস্কৃতিক আন্দোলনের এই অন্যতম পুরোধা বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিক থ্রি সিক্সটির কর্ণধার। যা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম সংস্থায় পরিণত হয়েছে।

এক কথায় আলী যাকের যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই মিলেছে সফলতা।

শিল্পকলায় অসামান্য অবদান রাখায় বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৯ সালে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে। যা বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা।

সেইসঙ্গে শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী পদক, নরেন বিশ্বাস পদক এবং মেরিল প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা পুরস্কার লাভ করেন।

সাংস্কৃতিক অঙ্গন দাপিয়ে বেড়ানো এই শিল্পীকে মহীরুহের সাথে তুলনা করেছেন নাট্য ব্যক্তিত্ব ত্রপা মজুমদার।

“আক্ষরিক অর্থে তিনি একজন নক্ষত্র। তিনি তার উপস্থিতির মাধ্যমে তার জ্ঞান, ব্যক্তিত্ব ও সারল্যের আলো ছড়াতেন। তার মেধা, মনন, জীবনাচরণ, নেতৃত্বগুণ আমাদের জন্য ছিল অনুসরণীয়।”

আলী যাকেরকে বাংলাদেশের, মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা, দেশপ্রেম ও মানবতার এক মিশেল বলে বর্ণনা করেছেন তিনি।

শুক্রবার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চিরবিদায় নেন বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের পুরোধা, টেলিভিশন অভিনেতা, সুপরিচিত সাংস্কৃতিক এই ব্যক্তিত্ব।

ভোর সাড়ে ছটার দিকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান তিনি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে যে তিনি কয়েক বছর ধরে ক্যান্সারে ভুগছিলেন। দুদিন আগে তার করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনের উজ্জ্বল এই নক্ষত্রের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতিসহ, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিরা।

গার্ড অব অনার এবং সর্বস্তরের শ্রদ্ধা জানানো শেষে বিকেলে ঢাকার বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

তবে আলী যাকের তার বিভিন্ন চরিত্রে শক্তিমান অভিনয়ের মাধ্যমে এখনও দর্শক মনে রয়েছেন চির-জীবিত।

সুত্রঃ বিবিসি বাংলা

পথিকনিউজ/অনামিকা

  • 6
    Shares
  • 6
    Shares