512 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

একটা অশ্রুসিক্ত ঈদ : রাবেয়া জাহান

আমরা আমাদের জীবনের সিদ্ধান্তগুলো সমাজের চাহিদা অনুযায়ী না নিয়ে, আমাদের নিজেদের প্রয়োজন অনুসারে নিতে শিখি । আর তাহলেই অন্ততো সমাজের অজুহাতে কোনো জীবনকে আর বিসর্জন দিতে হবে না।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমার কাছে আজ জগতের সকল আনন্দ মলিন।  মন যেখানে  বিমর্ষ , সেখানে  দিবসের কোনো তাৎপর্য নেই। পৃথিবীর বাতাসে আজ দূষণ লেগেছে। মানুষের নিঃশ্বাসে বাসা বেধেছে মহামারী।  বাল্যকালের এক বন্ধু  আমার, রোগে ভোগছে। কঠিনতম রোগ। এই রোগের আবার  নাম রাখা হয়েছে করোনা। । রোগের নাম যাই হোক, আমি আর তাকে না দেখে থাকতে পারছি না। এ কেমন রোগ , কাছে যাওয়া যায় না।    বন্ধু আমার ঘর কোণে হয়ে গেলো। কিসের ঈদ , কিসের আনন্দ । ভেতরে চেপে আছে শুধু বোবা কান্না , বের হতে পারছে না।

আশে পাশের বাড়ির বাচ্চারা নতুন জামা কাপড় পড়েছে। আমি এসেছিলাম , ভায়ের বাড়িতে বেড়াতে, লক ডাউনে আর বাড়ি যেতে পারিরি। কিন্তু লক ডাউনের সকল প্রাচীর ভেঙ্গে পাশের বাড়ির ভাবিরা কেনাকাটার কোনো কিছু বাকি রাখেনি। আমি হতভম্ভ ।  আমার ভাবি, আমার জন্যও কাপড় কিনেছে, মেহেদী কিনেছে, চুড়ি কিনেছে। কিন্তু আমার ঈদ যে বিবর্ণ। বাড়ীতে মা বাবা একা ঈদ করছে। মন চাইছে পাখী হয়ে যাই। ডানা মেলে এক নিমিষেই বাড়ি চলে যাই। বাবা মাকে জড়িয়ে ইচ্ছে মতো কেঁদে ভেতরটাকে হালকা করি। দু ঘর বাদেই আমার বন্ধুর বাড়ি। জীবনের ছোট বড় সকল কাজেই ছায়ার মতো আমাকে, আমার পরিবারকে সঙ্গ দিয়েছে। অথচ , আজ বন্ধুর জীবনের শেষ বেলায় , তার পাশে বসার  সুযোগ  আমার নেই। বন্ধু আমার এস এম এস করেছে,     ” কিরে পাখি , আমার সেবা যত্ন করবি বলে কি এবার ঈদে বাড়ী ছাড়া হইলি। শোন , তোকে  কিচ্ছু করতে হবে না। তুই বাড়িতে থাকলেই আমার বড্ড শান্তি। আমার খুব শ্বাস কষ্ট হচ্ছে রে।  কেউ পাশে নেই , সবাই আমার কাছে আসতে  ভয় পায়। একটা সময় সবার চোখের তারা ছিলাম, আর আজ কেউ আমার পাশে নেই। তোকে   খুব মনে পরছে। ছোটকাল থেকে বাবা মা ছিল না, তাই হৃদয়ের সব কথা তোকেইতো বলেছি। যখন, যতোবার, যেভাবে ডেকেছি, তুই মুহুর্তের মধ্যেই ছুটে এসেছিস। এ কেমন ব্যাধি পাখি ,কেউ আমার কাছে আসে না।  জানিস, অসুখে আমার যতোটা না কষ্ট , তার চেয়ে বেশি ছটপট করছি, তোকে  না দেখার যন্ত্রনায়।”

তোকে তো একটা কথা বলাই হয়নি, তোর বাবা মাসখানেক আগে যখন অসুস্থ হয়েছিলেন, তখন আমায় বলেছিলেন, ঈদের পর তোর আর আমার বিয়ে দিবে। আচ্ছা , আমি কি বাচঁবো  নাকি মারা যাবো?  আমার শ্বাস নিতে এতো কষ্ট হয় কেন রে পাখি?  মনে মনে কতো স্বপ্ন সাজিয়েছিলাম , ভেবেছিলাম এবারের ঈদটা স্মরণীয় ঈদ হবে। ঈদের দিন তোকে  নিজ হাতে সেমাই রান্না করে খাওয়াবো আর তারপর একশত গোলাপ তোর হাতে দিয়ে বলবো, এই পাখি আমার বউ হইবি? বউ হলে , তোকে রোজ একটা করে গোলাপ দিবো। আর তোর গাল তখন গোলাপের চেয়েও বেশি লাল হয়ে যাবে।

ওহ , কি যে অসহনীয় যন্ত্রনা । আমি আর  কথা বলতে পারি না। এখন আর লিখতেও পারছি না। শুধু তোকে  দেখবো বলে এতটা মনের জোর জাগিয়ে রেখেছি।

বন্ধু আমার এতো কষ্টে আছে…. আমি  আর কান্না চেপে রাখতে পারিনি  । ভেতরের সব কষ্ট এবার আর্তনাদ হয়ে বের হয়ে এলো। ভাই ভাবি দৌড়ে আসলো। তারা আমায়  বাড়ি যেতে নিষেধ করেছে, প্রথমতো লক ডাউন, দ্বিতীয়তো আমার বন্ধুর করোনা  হয়েছে, তাই আমাকে কোনোভাবেই যেতে দেয়নি ।তাদের মুখের উপর কখনো কথা বলতে পারিনি। তাই ভেতরে  কষ্টের পাথর বেধে,  সুসময়ের অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু , এখন মনে হলো, আমি এক ভিন্ন মানুষ হয়ে গেছি। কাউকে কিছু বলতে পারছি না। কান্না সামলে খুব কষ্টে ভাবিকে বললাম, আমি বাড়ী যাচ্ছি। কারো কিছু বলার অপেক্ষা না করেই দ্রুত গতিতে ছুটে গেলাম।

বাড়ীতে  যাওয়ার আগ পর্যন্ত একেকটা মুহুর্তকে মনে হচ্ছিল, একেকটা বছর। শেষ পর্যন্ত পৌছলাম বাড়িতে। বাবা -মা আমায় দেখে আনন্দে দিশেহারা। তারা শান্ত হওয়ার আগেই  পাগলের মতো  আমার বন্ধু রেহানের  কথা জিজ্ঞেস করলাম। বাবা- মা চুপ হয়ে গেলেন। আমি তো ভেবেছি, খুব খারাপ কিছু ঘটে গেলো কিনা, আমার সমস্ত শরীর মুহুর্তেই হিম হয়ে যাচ্ছিল। বাবা তখনই বলতে লাগলেন, মা রে রেহান বোধ হয় টিকবে না। ওর কাছে যাওয়া সবার নিষেধ। দেশে কি ভাইরাস নাকি এসেছে, যাকে ধরে তার কাছে গেলে, সেও মারা যাবে। তাই গ্রামের লোক কেউ তার কাছে যায় না। এখন তার কি অবস্থা তাও  জানি না।

আমি আনমনে বলতে লাগলাম,  বাবা ,রেহান ছোটকাল থেকে আমাদেরকে তার  আপনজন ভাবে। তার বাবা- মা নেই, তাই তোমাদেরই তো বাবা মা মনে করে। তার এই দুর্দিনে , এভাবে তাকে মৃত্যুকুলে ঢেলে দেওয়া কি ঠিক, বাবা? আজ যদি আমার এমন হতো তোমরা কি আমার সেবা না করে পারতে? আর আমি এই রোগ এবং এর চিকিৎসা সম্পর্কে জেনেছি । ভয় নেই, আল্লাহর উপর ভরসা রাখো, আমি তার যত্ন করবো। শুধু তোমাদের সমর্থন প্রয়োজন। সমাজের মানুষ ,কে কি বলে , তাতে আমার কিছু আসে যায় না।

আমার মনের আকুতিটুকু , বাবা  বুঝেছে, যদিও মা চাচ্ছিল না, আমি রেহানের সেবা করি। বাবা তখন মাকে বললো, দেখো পৃথিবীতে কেউ সারাজীবনের জন্য বেঁচে থাকে না। আজ য দি আমরা  এই কাজে সমর্থন না দেই , সারাজীবন নিজের বিবেকের কাছে দায়ী থাকবো। এই ছেলেটা আমাদের জন্য নিজের সন্তানের চেয়েও অনেক বেশি কিছু করেছে। আজ নিজেদের সুরক্ষার কথা  ভেবে এভাবে মুখ ফেরানোটা বেইমানি হবে।

আমার মা তখন কাঁদছিলো আর বলছিলো, আমাদের একটা মাত্র মেয়ে, তার কিছু হয়ে গেলে আমাদেরকে  কে দেখবে? আর আমাদের মেয়ে রেহানের সেবা করলে মানুষ কি বলবে?

আমি তখন বললাম, মা , তুমি কি আল্লাহতে বিশ্বাস করো ? যদি  তুমি আল্লাহতে পুরোপুরি বিশ্বাস করো , তাহলে মনে রেখো, তুমি ত্যাগ স্বীকার করলে , আল্লাহ তোমার প্রতি বেখবর হবেন না। বরং তোমার প্রতি তাঁর দরদ অনেক বেড়ে যাবে। আর যার দেখাশোনা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন করে , তার আর কিসের প্রয়োজন হয় বলো? আর তুমি মা, মানুষের কথা বলছো? কে কি বলবে? মানুষ শুধু বলতেই পারে। কিছু করতে পারে না। আমাদের যে কোনো বিপদে কোনো মানুষ আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি। সব সময় , রেহানই আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।

মা, আমরা আমাদের জীবনের সিদ্ধান্তগুলো সমাজের চাহিদা অনুযায়ী না নিয়ে,  আমাদের   নিজেদের প্রয়োজন অনুসারে নিতে শিখি । আর তাহলেই  অন্ততো সমাজের অজুহাতে কোনো জীবনকে আর বিসর্জন দিতে হবে  না।

এবার ছুটে গেলাম রেহানের বাড়িতে। একেবারে পরিত্যক্ত বাড়ির মতো হয়ে আছে। ভিতরে ঢুকে রেহানকে ডাকার সাথে সাথেই , কংকালসার দেহের একটা মানুষ দেখি। এই  কি সেই রেহান ? যে এই গ্রামের সুদর্শন যুবক হিসেবে পরিচিত ছিল। চোখ গুলো এতো ভিতরে গিয়েছে যে , কোনোভাবেই রেহানের চেহারার কোনো চিহ্ন খুঁজে পাচ্ছিলাম না। নিজের মনকে একেবারেই শক্ত রেখে রেহানের পাশে বসলাম। রেহান কোনোভাবে চাচ্ছিল না আমি ওর বিছানায় বসি । এবার আমি ওর হাত দুটি শক্তভাবে ধরে বলি, কিচ্ছু হবে না আমার , ইনশাল্লাহ। আল্লাহ সহায়ক হলে, রেহান খুব দ্রুত সুস্থ হবে। রেহানকে যে সুস্থ হতেই হবে।

 রেহানের চোখে মুখে , আশার আলো, না জানি কতোদিন পরে হাসলো সে। ভালবাসার সমস্ত শক্তি নিজের মাঝে সঞ্চার করে,  আমি দিন রাত রেহানের সেবা করেছি। মাত্র দশদিনের মধ্যেই রেহান পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছে। এই দশদিন একটা মুহুর্তের জন্যও ঘুমায়নি আমি। অথচ কি অদ্ভুত বিষয়, আমার মাঝে এতটুকু ক্লান্তি আর অবসাদ নেই , এতটুকু অসুস্থ হয়নি আমি। বরং রেহানকে একটু একটু করে সুস্থ হতে দেখে আমার মন প্রাণ আনন্দে ভরে উঠতো। আমার মাঝে অসুখ বাসা বাধার কোনো সুযোগই পায়নি। এখন আমি চরম আত্মবিশ্বাসী এক নারী, আর মহান আল্লাহর প্রতি আমার আস্থা বিশ্বাস আরো বহুগুনে বেড়ে গেছে। এবার শুধু মন থেকে দুয়া আসে , সকল করোনা রোগীদের , আল্লাহপাক হেফাজত করুক।