624 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

করোনা এবং আমাদের মানসিকতা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেখ আবুল খায়ের আনছারী: মহামারী করোনা ভাইরাস বিশ্ব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। মহামারী এ করোনার বিস্তার রোধে বিশ্বব্যাপী নানা কর্ম সম্পাদনে বিশ^বাসী গলদঘর্ম।
বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থ্যা বলছে করোনা বিশ^ থেকে কোন দিনই শেষ হবে না। এটা অন্যান্য ভাইরাসের মতোই থেকে যাবে। এইডস যেমন রয়ে গেছে করোনা ভাইরাসও তেমনি থেকে যাবে। বিশ্বে অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশে প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। ক্রমান্বয়ে দেশের প রিস্থিতি ভয়াবহ রুপ নিচ্ছে। এখনই সঠিকভাবে করোনার বিস্তার রোধ না করতে পারলে দেশের ভবিষ্যত নিয়ে যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।
সারা দুনিয়া ব্যাপি করোনা নিয়ে চিন্তার অন্ত নেই। গবেষনায় দিন রাত চেষ্টা করে যাচ্ছে তাবৎ দুনিয়ার সব বিশেষজ্ঞরা। সাধারণ মানুষের মনে একটাই আশা কবে লকডাউন নামক বন্দি জীবন থেকে মুক্তি লাভ করবে। একটাই স্বপ্ন কবে ভাল একটা ওষুধ আবিষ্কার করে ভয়াল এ মহামারী থেকে মানব জাতিকে সুস্থ্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা যাবে। কবে কিভাবে পৃথিবী থেকে এই মহামারী করোনা বিদায় নিবে এ চিন্তা ও উৎকন্ঠায় পৃথিবী নামক এ গ্রহের বাসিন্দাদের মন অস্থির হয়ে আছে। বিজ্ঞানীদের ধারনা করোনাই শেষ নই। এ গ্রহের বসবাসকারী প্রাণীকূলের জন্য এমন মহামারী আরো আছে এবং নিকট ভবিষ্যতে সংক্রমন ঘটাতে পারে।
বৈশি^ক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীতে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন সমস্যা। দেখা দিচ্ছে নানা ধরনের মহামারী ভাইরাস সংক্রমন। এখন প্রশ্ন আসতেই পারে মহামারী কিংবা ভাইরাস সংক্রমনের সাথে বৈশি^ক উষ্ণতার সম্পর্ক কী?
পৃথিবীর প্রাকৃতিক ফ্রিজার নামে খ্যাত গ্লেসিয়ার ও পারমাফ্রস্ট। যেখানে অক্ষত অবস্থায় বরফে ঢাকা পড়ে আছে হাজার হাজার বছরের পুরনো মৃতদেহ। স্বাভাবিকভাবেই বৈশি^ক উষ্ণতার বিরুপ প্রভাব পড়েছে প্রাকৃতিক ফ্রিজার বলে পরিচিত গ্লেসিয়ার ও পারমাফস্টে। যার ফলে গলতে শুরু করেছে জমাট বরফ। উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাবে বরফ গলতে শুরু করার কারণে সেখানে থাকা মৃতদেহগুলো উন্মুক্ত হতে শুরু করেছে। প্রাণীগুলো মৃত অবস্থায় থাকলেও ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া রয়েছ শুপ্ত অবস্থায়। ফলে বরফ গলার সাথে সাথে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াগুলো জীবন্ত হতে শুরু করেছে। বিজ্ঞানীরা এসব অনুজীবের নাম দিয়েছে টাইম ট্রাভেলিং ভাইরাস। ২০১৫ সালে চিন ও আমেরিকার একদল গবেষক তিব্বতের গলিত গ্লেসিয়ারের ওপর গবেষণা চালান। ১৫০০০ বছরের পুরনো গ্লেসিয়ারে তারা ১৫৪ ফুৃট গর্ত করে নমুনা সংগ্রহ করেন। পরবর্তিতে ল্যাবের পরীক্ষায় নমুনায় মোট ৩৩ ধরনের ভাইরাস পাওয়া যায়। এর মধ্যে ২৮টি ভাইরাস আধুনিক বিজ্ঞানের কাছে একদম নতুন। উষ্ণতা বৃদ্ধির সাথে সাথে গলবে পৃথিবীর সব গ্লেসিয়ার আর পারমাফ্রস্ট। পানিতে মিশে যাবে এসব ভাইরাস আর ক্ষতিকর পদার্থ। সহজেই আক্রান্ত হবে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী। একটি মাত্র ভাইরাস করোনা মোকাবিলায় বিশে^র সর্বশক্তি ব্যর্থ হচ্ছে। একই সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক ভাইরাসের আক্রমণ ঘটলে পরিস্থিতি কেমন হবে? জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের একটি গণবিলুপ্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই মুহুর্তে বৈশি^ক উষ্ণতার লাগাম টেনে না ধরলে পরিণাম হতে পারে ভয়াবহ।
ধারনা করা যায় পৃথিবী নামক এ গ্রহের আয়ূ খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। জলবায়ুর পরিবতর্নে এমনটি আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। একটি মাত্র করোনা ভাইরাস ঠেকাতে সারা বিশ^ মরিয়া হয়ে উঠেছে তার পরও এর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রন আনা সম্ভব হচ্ছেনা। কবে নাগাদ এ ভাইরাস পৃথিবী থেকে বিদায় নিবে তা সঠিক ভাবে এখনো পর্যন্ত কেউ বলতে পারছেনা।
বাংলাদেশে করোনা প্রেক্ষিতে প্রথম দিকে বলা হয়েছিল এ দেশের তাপমাত্রায় করোনা ভাইরাস ঠিকে থাকতে পারবেনা। গবেষদের এ ধারনাটি সঠিক নয়। সিঙ্গাপুরের গবেষকরা বলেছিল মে মাসের শেষের দিকে বাংলাদেশ থেকে করোনা চলে যেতে থাকবে এবং মধ্য জুলাইয়ের দিকে বাংলাদেশ থেকে করোনা সম্পূর্ণ রুপে বিদায় নিবে।। বর্তমান পরিস্থিতি লক্ষ করলে বুঝা যায় হচ্ছে এর উল্টো। সম্প্রতি গবেষকরা বলছে বর্তমানে এশিয়াতে বাংলাদেশেই করোনার ঝুঁকি বেশি
মহামারী ভাইরাস এর আগেও পৃথিবীতে সংক্রমন ঘটিয়েছে এবং ভবিষ্যতে হয়তো আরো নতুন নতুন ভাইরাসের সংক্রমন ঘটবে। এসব ভাইরাসের সংক্রমন থেকে বেঁচে থাকার জন্য, মানবজাতি তথা পৃথিবীকে সুরক্ষিত রাখার জন্য বিজ্ঞানীরা প্রানান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আমাদের বিবেক মানবতা ও মানসিকতা নিয়ে। বিশ^জুড়ে মহামারী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতদের জন্য বিশে^র অন্যান্য দেশ কি ভূমিকা পালন করেছে তা আমরা দেখছি। এর বিপরিতে আমাদের মানবতা ও মানসিকতা কী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, আমাদের মানবতা ও মানসিকতা কোন পর্যায়ে আছে সেটা একটু দেখা নেয়া দরকার। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিতে কিংবা দেশের ক্রান্তিলগ্নে দেশের মানুষকে সুরক্ষিত ও নিরাপদে রাখতে নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থেকে যারা আত্মোৎসর্গ করেছেন; ইতিহাসের সোনালী পাতায় তাঁদের নাম অক্ষত অবস্থায় থাকবে। তাঁদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। জাতি তাঁদেরকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরন করবে সারা জীবন। দেশের এই দুঃসময়ে সরকারের পাশাপাশি হৃদয়বান ব্যক্তি, বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠন অসহায়দের পাশে যেভাবে দাড়িঁয়েছে তা মানবতার উজ্জল দৃষ্টান্ত। সংশ্লিষ্ট সকলকে আমরা সাধুবাদ জানাই। এর বিপরীতে কিছু চিত্রও আমাদেরকে ভাবিয়েছে, ভাসিয়েছে চোখের জলে।
করোনায় আক্রান্ত মৃতদের দাফন নিয়ে কিছু খবর পত্রিকা সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রীতিমত ঝড় তুলেছে এবং বিষয়টি বিষ্ময়করও বটে। মৃত্যু একটি চিরন্তন সত্য যা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই । যদিও আধুনিক বিজ্ঞান সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে কিভাবে মানুষকে অমর করা যায় কিন্তু সেটাতো কোনকালেই সম্ভব নয়। পকিত্র কোরআনে বলা হয়েছে ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাধ গ্রহণ করতে হবে’ মৃত্যু অবধারিত যে কোন ভাবেই হবে। কেউই জানে না কখন কিভাবে কার মৃত্যু হবে। মুসলিম ধর্মের রীতি অনুযায়ী মৃত্যুর জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে। তবে, এমন মৃত্যু কারোরই কাম্য নয় যে মৃত্যু অভিশাপ হয়ে আসবে স্বজনদের জন্য। এমন মৃত্যু কেউ আশা করেনা যে মৃত্যুতে আপনজন কাছে আসতে পারবেনা। জানাযায়, দাফনে বা শেষকৃত্যে অংশ নিতে পারবেনা আত্মীয় পরিজন কিংবা শুভাকাঙ্খীরা। করোনা ভাইরাস আমাদেরকে অনেক কিছু শিক্ষা দিচ্ছে। মানুষ বুঝতে পারছে এ দুনিয়াতে কেউ কারো নয়। একমাত্র তিনিই আপন যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, লালন করছেন। দুঃখের বিষয় হলো করোনা ভাইরাসে আমাদের দূর্বল চিত্তের কিছু চিত্র ফুটে উঠেছে। যা সুস্থ বিবেকের কাম্য হতে পারে না।
“বৃদ্ধার লাশ নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে স্ত্রী সন্তান” শিরোনামের এই খবরটি আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়ে যায়। ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুরের আব্দুল হাই নামে এক বৃদ্ধের শ^াসকষ্টে মৃত্যু হলেও জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে বিষয়টিকে করোনা ভাইরাসে মারা যাওয়ার গুজব রটিয়ে মরদেহ দাফনে বাধা সৃষ্টি করেছে মৃত আব্দুল হাই এর আত্মীয়রা। উপায়ন্তর না দেখে লাশ নিয়ে মৃত আব্দুল হাই এর ছেলে শাহজাহান চলে যায় কোনাপাড়ায় এক আত্মীয়ের বাড়ীতে। সেখানেও করোনায় মৃত সন্দেহে দাফন করতে দেয়া হয়নি। অগত্য লাশ ভ্যানে নিয়ে মৃতের ছেলে ও স্ত্রী রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ফজরের নামাযের পর স্থানীয় পুলিশ ও একটি সেচ্চাসেবি সংগঠনের সহায়তায় পৌরসভার কবরস্থানে লাশ দাফন করা সম্ভব হয়। লাশ বহন করার জন্য মসজিদের খাঁটিয়া দেয়ানি গ্রামাবসী, কিংবা করোনার রোগী তাই স্বজনরা কেউ এগিয়ে আসেনি শেষ পর্যন্ত পুলিশই লাশ দাফন করছে। পনেরো বছর যাবত যে বাসায় ভাড়া থাকে ভাড়াটিয়া কাজ না থাকায় দুই মাসের ভাড়া দিতে পারেনি তাই বাসা থেকে বের করে দেয় বাড়িওয়ালা, করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট না থাকলে হাসপাতালে ভর্তি নিচ্ছে না রোগী, এমন দৃশ্য বা খবর দেখলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে আমাদের মানবতা-মানসিকতা কী তবে নির্বাসনে গেছে অচেনা কোন দ্বিপে? এহেন পরিস্থিতে দেশে এমনও কিছু হৃদয়বান ব্যাক্তি আছে যারা মানবতার উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যখন করোনায় মৃতদের লাশ দাফনে এগিয়ে আসছেনা স্বজনেরা কিংবা দাফন করতে বাধা দেয়া হচ্ছে গ্রামের কবরস্থানে ঠিক এই সময়ে কবরস্থানের জন্য জায়গা দান করে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, সিআইডির সিনিয়র এ এসপি মানিকগঞ্জের কৃতি সন্তান এনায়েত করিম রাসেল। মানবতার এমন নজির অবশ্যই শ্রদ্ধার সাথে স্মরন করবে এদেশের মানুষ।
অনেক অসম্ভব কাজকেও আমরা খুব সহজভাবে কখনো সম্ভব করে ফেলি তখন, যখন আমাদের বিবেক ও বোধ শক্তি লোপ পেয়ে যায়। উপরোক্ত এ ঘটনাগুলিই এর জ¦লন্ত উদাহরণ। ইহজাগতিক লোভ লালসার বশবতি হয়ে আমরা যা করি তা পক্ষান্তরে আমাদেরই ক্ষতি বয়ে আনবে নিঃসন্দেহে আমরা তা বুঝেও বুঝিনা।
করোনা এসেছে চলে যাবে, রেখে যাবে আমাদের জন্য শিক্ষা। সে শিক্ষা আমাদের বাস্তব জীবনে কী প্রতিফলন ঘটাবে তা আগামী প্রজন্মের জন্য হবে অনুকরণীয়। তাই সাবধান হতে হবে আমাদেরকে এখনই। জাগ্রত করতে হবে আমাদের ঘুমন্ত বিবেককে। প্রশ্ন থাকে ‘মানুষ মানুষের জন্য’ মূল্যবান এ কথাটি আমাদের বর্তমান প্রেক্ষাপটে উপেক্ষিত নয় কী?
আসুন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাই, বদলাই আমাদের মানসিকতা, পরিবর্তন আসুক আমাদের চিন্তাশক্তিতে।

শেখ আবুল খায়ের আনছারী
লেখক ঃ কলামিস্ট।
মোবাইলঃ ০১৭৩৯২৪০৯৯০