530 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

কোরবানীর ঈদ :সামাজিক দূরত্বের নামে মানসিক দূরত্ব নয়

  • 109
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    109
    Shares

আবিদুর রহমান শাহিন: অতিমারী করোনা সংকটের মধ্য দিয়েই বছর ঘুরে আবার আসলো কোরবানীর ঈদোৎসব । আমাদের মহানবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা ( সাঃ) বলেছেন, “প্রত্যেক জাতির উৎসব আছে । আমাদের উৎসব হলো এই দুই ঈদ । মুসলমানদের ধর্মীয় দুটি উৎসব – ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা । ”

আমরা ত্যাগের আদর্শ নিয়ে কোরবানী উৎসব পালন করতে যাচ্ছি । কোরবানী হল পশুর সঙ্গে পশুত্বের জবাই । গত বছর ঈদুল আজহায় ছিল করোনার প্রথম ঢেউ । এবারে চলছে দ্বিতীয় । তবে আগের চেয়ে এর মাত্রা ভয়ানক । তাই স্বাস্থ্যবিধি মানব। এটি মানতে গিয়ে আমাদের যাপিত জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে । এখন মানুষ ঈদে কোলাকুলি করবে না, মুসাফা করবে না । করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচতে আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখবো । কিন্তু এ কথা ভুলে যাব না যে, ঈদের চেতনাই হলো মানুষে মানুষে ভালবাসার বন্ধন সুদৃঢ় করা । তাই সামাজিক দূরত্বের নামে আমরা যেন মানসিক দূরত্বে জড়িয়ে না যায়। অদৃশ্য দানব করোনার অশুভ ইঙ্গিতে বা ভঙ্গিতে যেন আমাদের মানব সঙ্গীত লংঘিত না হয় , সেটা খেয়াল রাখবো ।
আসলে ভোগে নয় ত্যাগেই প্রকৃত সুখ — কথাটির মর্মবাণী যারা হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছেন, তাদের ভেতরে ত্যাগের বিরল আনন্দানুভূতির দ্যূতি যথারীতি শতধায় বিকিরিত হয়েছে । ক্ষণিক আনন্দের ক্ষতিকর উপকরন ভোগ এর ঢেঁকুর তুলেছেন প্রায় অনেকেই কিন্তু পরার্থে নিবেদনকৃত ত্যাগের চিরঞ্জীব আনন্দে আন্দোলিত হয়েছেন ক’ জন- ই বা । ঈদুল আজহা আমাদেরকে সেই ত্যাগের সর্বোচ্চ শিক্ষা দিলেও আমরা মনে প্রানে কতটুকু গ্রহণ করতে পারছি বা ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে এর অনুশীলন কতটুকু করছি, তা জিজ্ঞাস্য । এটা বুঝতে হবে, শক্তিধর এই ত্যাগের আদর্শ আমাদের চরিত্রকে সুশোভিত করে ।
মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভে হযরত ইব্রাহিম ( আঃ) যে আত্নত্যাগ ও মহান আদর্শ স্থাপন করে গেছেন, তার অনুসরণের জন্যে আমরা ঈদুল আজহার দিনে পশু জবাই করে থাকি । যদিও ” পশুর রক্ত, মাংস, হাড় ইত্যাদি কিছুই পৌঁছায় না, পৌঁছায় শুধু আমাদের অন্তরের তাকওয়া বা ভয়ভীতি । ” এ কথা আল্লাহ পাক নিজেই বলেছেন । আমাদের মহানবী ( সাঃ) হাদিস শরীফে বলেছেন, ” আল্লাহ তোমাদের চেহারার প্রতি তাকান না আর তোমাদের সম্পদ ঐশ্বর্যের প্রতিও দৃষ্টি দেন না । তিনি দেখেন তোমাদের মন ও আন্তরিকতা । “
প্রকৃত অর্থে আমাদের ইচ্ছার ঐকান্তিকতা এবং খোদাভীতির প্রতি সংকল্পের দৃঢ়তা যাচাইয়ে কোরবানী ত্যাগ আমাদের জন্যে সুবর্ণ সুযোগ বয়ে আনে । ত্যাগের মর্মবাণী ” সকলের তরে সকলে আমরা ” – প্রতিধ্বণিত হয়ে ভ্রাতৃত্ববোধের প্রেরণা যোগায় কোরবানীর ত্যাগ। মনে রখতে হবে, ইসলাম শুধু অনানুষ্ঠানিকতা নয়। কর্ম নির্ভর ধর্ম অর্থাৎ সৎ কর্মই ধর্ম । সূরা বাইয়্যেনাহ- তে আল্লাহ বলেছেন, ” সৎকর্মে যারা আজীবন নিবিষ্ট থাকে, তারাই সৃষ্টির সেরা । “
প্রবৃত্তির দাস কখনোই আল্লাহর দাসে পরিণত হতে পারে না । ষড়রিপুর প্রভাবমুক্ত হয়ে মানবতার সেবা এমনভাবে করতে হবে, যেভাবে আল্লাহ আমাদের অনুগ্রহ করেন । শেখ সাদী ( রহঃ) বলেছেন —
তসবিহ আর সিজদাহ দেখে
খোদ ইলাহী ভুলবে না
মানব সেবার কুঞ্জী ছাড়া
স্বর্গ দুয়ার খুলবে না ।
এই কোরবানীর ইদের মূল লক্ষ্যই হলো, আমাদের রক্ত, মাংসের শরীরে সংক্রমিত ষড়রিপুকে কোরবানী করে ত্যাগের আনন্দে অবগাহন করা । আমাদের মনের ভেতরের পাশবিক স্বভাব থেকে নিজেদের বিমুক্ত করা । জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সে চেতনা থেকেই বলেছিলেন —
” মনের পশুরে কর জবাই
পশুরা বাঁচে, বাঁচে সবাই । “
কাজই আমরা মনের পশুরে যখন জবাই করতে পারবো, তখনই মানসিক দূরত্ব ঘুচিয়ে ভ্রতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা পেয়ে মানববসতি শান্তির সুশীতল ছায়ায় অবগুণ্ঠিত হবে । এ অনুভূতির সিংহদুয়ার সবার জন্যে অবারিত হোক, অন্তরে অন্তরে আসুক শুভ্রতা, অঙ্গনে অঙ্গনে আসুক উদারতা, জীবন পরিসরে নেমে আসুক চিত্তের প্রবল প্রশস্থতা ।
  • 109
    Shares