380 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

ক্যালেন্ডারে বেদনার রঙে ২৭ মে : আবেদুর আর শাহীন ।

  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share
২৭ মে ২০২০ ।  জীবনের ক্যালেন্ডারে নীল রঙে আঁকা এতই বেদনাবিধূর যার উপশম নেই। সেদিন ঢাকা থেকে মাইক্রোবাসে বাড়ী ফিরছিলাম। কঠোর লকডাউনে ফাঁকা ছিল মহাসড়ক । সুনসান নীরবতা। একদিকে ড্রাইভার তার গাড়ীর গতি বাড়িয়ে আপন মনে ছুটছে অন্যদিকে শোঁ শোঁ গতির দুরন্ত বাতাস কালো মেঘের সৃষ্টি করে ভাগ্যাকাশকে যেন আচ্ছন্ন করে মহা দুর্যোগের ঘনঘটা পাকাচ্ছে।
চক্রাকার কাঁটায় তখন সকাল দশটা । আইলা, সিডর, আম্পান কিংবা ইয়াশের চেয়ে শক্তিশালী ঝড়ের আঘাতে মাইক্রোবাসটি নরসিংদীর রায়পুরাস্থ হাইওয়ে মহাসড়কের সন্নিকটে ছায়াদানকারী বিশাল কড়ই গাছে প্রচন্ড ধাক্কা লেগে আমার পাশটি দুমড়ে মুচড়ে যায়। গাড়ী এবং গাছের মাঝখানে চাপা পড়েছে আমার নিথর দেহ । মারাত্মক দুর্ঘটনা । সঙ্গে সঙ্গে মহান আল্লাহর কুদরত শুরু। আমি ধীর, প্রশান্ত ও সজ্ঞান । আমার বাম পায়ের তিনটি অংশ ভেঙ্গে হাত পা থেকে রক্ত ঝরছে অবিরত ।
অথচ ন্যূনতম কোন ব্যাথা নেই আমার। সুশীতল ছায়াদানকারী বিশাল কড়ই গাছটির চেয়েও প্রশান্তিময় ছিল আল্লাহর রহমতী ছায়া । কয়েক মিনিট আগেও যে রাস্তায় কোন জনমানব ছিল না, সেখানে মুহূর্তেই শ শ মানুষ আমাকে উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই থানা পুলিশ ছুটে আসল রেকার নিয়ে । আমার পরামর্শে ক্ষতির আশংকায় রেকার ব্যবহার না করে ফায়ার ব্রিগেডে খবর পৌঁছায়। বিশ মিনিটের মাথায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ী হাজির। ফায়ার সার্ভিসের অফিসার কিছুটা নুয়ে কাত হয়ে আমাদের গাড়ির ভেতরে ঢুকে আমার মাথায় হাত রেখে আমাকে একটি চকলেট খেতে দেন ।
তারপর কাটার মেশিনে গাড়ীটি একটু একটু করে কেটে আমাকে বের করে ওই অফিসার কোলে নিয়ে তাদের এম্বুল্যান্সে উঠিয়ে নরসিংদী জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান । ওখান থেকে আমি দুর্ঘটনার সংবাদটি আমার ছোট ভাই ডাঃ অাশেকুর রহমান মিলনকে জানালে সে আমাদের চাচাত ভাই মোঃ সাইফুল মোস্তফা ও মোঃ আবেদ শাহ কে সঙ্গে করে সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা জনাব ডাঃ নোমান ভাইয়ের সহযোগিতায় সরকারী এম্বুল্যান্সটি নিয়ে যায় নরসিংদীতে। সেখান থেকে দ্রুত ও উন্নত চিকিৎসা দিতে আমার সহোদর ভাই ডাঃ মিলন আমাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আধুনিক বেসরকারী সেন্ট্রাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার এন্ড হাসপাতালে নিয়ে আসে। হাসপাতালের স্বনামধন্য ও রোগীবান্ধব পার্টনার, সবার প্রিয়মুখ জনাব সোহরাব ভাইয়ের আন্তরিকতায় কয়েকজন সরকারী ডাক্তারের সমন্বয়ে বোর্ড বসিয়ে আমার সফল অপারেশনের ব্যবস্থা করেন । ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে কর্মরত বয়সে নবীন অথচ অভিজ্ঞতায় প্রবীন অর্থোপেডিক ডাক্তার জনাব সোলায়মান স্যার আমার অপারেশন করেন এবং বর্তমানে আমি তাঁর অধীনেই চিকিৎসাধীন রয়েছি । তাঁর কর্মদক্ষতা, ভদ্রোচিত ব্যবহার, পরবর্তী ফিডব্যাক সবকিছু মিলিয়ে তিনি আমার নিকট দেবীশেঠীর মতই । এ পর্যন্ত প্রতিটি মুহুর্ত দয়াময় আল্লাহর কুদরতে পূর্ণ ছিল । এর রেশ এখনও শেষ হয়নি । আমার সে দৃশ্যগুলি মনে হলে আমি নিথর – নিশ্চল এবং কুসুম কোমল হয়ে কৃতজ্ঞতার সেজদায় রাব্বুল আলামিনের দরবারে লুটিয়ে পড়ি । এ লুটিয়ে পড়ার মধ্যেই রবের সান্নিধ্য, রহস্য ও পরম প্রশান্তি অনুসন্ধান করি । অশ্রুজলে কপোল সিক্ত করে বিরল আনন্দে অবগাহনের মাধ্যমে বেহেশতী সুধা আকন্ঠ পান করি ।
সেই দুর্ঘটনা, সেই দৃশ্য, প্রতিটা মুহুর্ত, সেই সুখস্মৃতি আমাকে এতটা নেয়ামতের আচ্ছাদনে আবৃত রাখে, যা ভাষায় বিশ্লেষণ করা দুরূহ । এতে আমি কৃতজ্ঞ, আপ্লুত, অভিভূত, এবং অস্থিমজ্জা সমর্পিত ।
আমি জানি, এখানেই শেষ নয় খোদার মেহেরবানী । আমার দুর্ঘটনার পরে সরকারী পদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে অনেক জ্ঞানী গুণি ও বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ আমাকে দেখতে আমার ক্ষুদ্রালয়ে এসেছেন । অনেকে আবার মুঠোফোনে খোঁজ নিয়ে জীবনে দাঁড়াবার শক্তি অর্জন বা সামনে এগুনোর প্রেরণা দিচ্ছেন । আমি আপনাদের সবার নিকট চির কৃতজ্ঞ ।
আমার দুর্ঘটনাটি আমি ধৈর্যের সাথে আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামত হিসেবে গ্রহন করেছি সানন্দে সাগ্রহে । ধৈর্যশীলদের সাথে যেহেতু আল্লাহ রয়েছেন এবং তাদের জন্যে পুরস্কারের কথাও বলেছেন । কাজেই আমাদের প্রত্যকের উচিত সতত সততার সাথে ধৈর্যধারণ করে পরিমিত জীবন অতিবাহিত করা ।
আমাদের নানাবিধ বিপদ বিগ্রহের পাশাপাশি অতিমারী করোনার ঝড় মানুষের ভিতে কাঁপন ধরিয়ে বিপর্যস্থ করে তুলছে । এ নড়বড়ে অবস্থায় ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া কঠিন হলেও আমাদেরকে আরো সংযত হতে হবে । কারন করোনার ঝড় একদিন থেমে যাবে, পৃথিবী আবার শান্ত হবে । জীবনে আসবে ঐশ্বর্য । তাই প্রয়োজন ধৈর্য ।
কারন ধৈর্যের সাগরে ডুব দিয়ে দেখি
হীরা মতি পান্না এবং আরো কত কী !
ভোরোর বাতাসে ফুলের সুবাসে
ঘাসের উপরে শিশিরেরা হাসে ।
প্রীতির বাঁধনে সবুজ মায়ায় কী স্নিগ্ধ পরশ
পুলকিত মানব কাননে অনাবিল হরষ ।
কথার ফুলঝুরি নয়, যেন মোহনীয় সুর
তাই কীভাবে করবো, ধৈর্যকে ঠেলে দূর ?
আপনারা সবাই ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন, শান্তিতে থাকুন, নিরাপদে থাকুন, দীর্ঘজীবি এবং ধৈর্যশীল হোন ।
  • 1
    Share