398 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

ক্রিকেট বিশ্বকাপের ৫টি স্মরণীয় ঘটনা

ক্রিকেট বিশ্বকাপের ৫ স্মরণীয় ঘটনা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

১৯৭৫ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপের গোড়াপত্তন হওয়ার পর এখন পর্যন্ত মোট ১২টি আসর হয়েছে। এই ৪৪ বছরের ইতিহাসে অনেকে যেমন ভালো নৈপুণ্যে প্রদর্শনের মাধ্যমে মধুর স্মৃতি তৈরি করেছেন অন্যদিকে অনেকে ব্যক্তিগত বাজে খেলার জন্য দলকে ডুবিয়েছেন চরম হতাশার সাগরে ।

বিশ্বকাপ ক্রিকেটপ্রেমী ও খেলোয়াড়দের জন্য সবসময়ই খুবই বিশেষ একটি উপলক্ষ। বিশ্বকাপ নামক সোনার হরিণের প্রত্যাশা সবাই করলেও কেবলমাত্র একটি দল এই মর্যাদা অর্জন করতে পারে।

আমরা আজকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের এমনই কিছু ঘটনার স্মৃতিচারণ করব যেগুলো স্থায়ীভাবে ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে জায়গা করে নিয়েছে।

সুপার ওভারে ইংল্যান্ডের ভাগ্যবদল
২০১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে নিউজিল্যান্ড ও ট্রফির মাঝখানে বাধা হয়ে অবস্থান করছিলেন বেন স্টোকস। তার লড়াকু মানসিকতাই ইংল্যান্ডকে সুপার ওভারের মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে টনিক হিসাবে কাজ করছিল। নিঃসন্দেহ এটিই ক্রিকেট বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় ফাইনাল ছিল। যার প্রতিটি মুহূর্ত দর্শকরা উপভোগ করেছেন।

নির্ধারিত ৫০ ওভারে নিউজিল্যান্ড ২৪১ রানের রান করতে পেরেছিল। যদিও লক্ষ্যটা আধুনিক ক্রিকেটের বিচারে খুব বড় ছিল না। কিন্তু প্রতিপক্ষ যেখানে নিউ জিল্যান্ড সেখানে খুব স্বাভাবিকভাবেই ইংল্যান্ডের জন্য একটি মোটেও সহজ কাজ ছিল না। লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ইংল্যান্ডের টপ অর্ডার খুব বেশি সুবিধা না করতে পারলেও মিডলঅর্ডারে বেন স্টোকস ও জস বাটলারের ১১০ রানের পার্টনারশিপে খেলায় ঘুরে আসে। কিন্তু জস বাটলার আউট হওয়ার পর লোয়ার মিডলঅর্ডারের ব্যর্থতায় শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডও নির্ধারিত ওভারে ২৪১ রানে অলআউট হয়ে যায়। যার ফলে নিয়মমাফিক ভাবে খেলা সুপারওভারে গড়ায়।

সুপার ওভারে বেন স্টোকস ও জস বাটলারের জুটিতে ১৬ রানের টার্গেট দেয়। জবাবে নিউ জিল্যান্ড ১৫ রান করতে সক্ষম হয়। নির্ধারিত ৫০ ওভারের মধ্যে ইংল্যান্ড বাউন্ডারি বেশি মারায় তাদের ওয়ার্ল্ড কাপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। মুহূর্তটা আসলেই খুব রোমাঞ্চকর ছিল।

নিউ জিল্যান্ডের কিংবদন্তি ভাষ্যকার ইয়ান স্মিথ শ্রুতিমধুর শব্দ চয়নের মাধ্যমে ওই মুহূর্তটাকে স্মরণীয় করে রেখেছেন। তিনি বলেন “Absoulte ecstasy for England and agony for New Zeland” – যার অর্থ ইংল্যান্ডের জন্য অত্যন্ত আনন্দের একটি উপলক্ষ অন্যদিকে নিউ জিল্যান্ডের জন্য একটি চরম যন্ত্রণাদায়ক মুহূর্ত।

উড়ন্ত জন্টি রোডসের দুরন্ত রান আউট
১৯৯২ বিশ্বকাপ ছিল সাউথ আফ্রিকার ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ এবং সেই বিশ্বকাপের মাধ্যমে তারা দীর্ঘ নির্বাসনের পর ক্রিকেটে ফিরে এসেছিল।

গ্রুপ পর্বের এই ম্যাচটিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে সাউথ আফ্রিকা নির্ধারিত ৫০ ওভারে এন্ড্রু হাডসনের অর্ধশতকের উপর ভিত্তি করে ২১১ রান করেছিল। জবাবে পাকিস্তানের দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানের দ্রুত আউট হয়ে যাওয়ার পর ইনজামামুল হকের ইনিংসে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছিল পাকিস্তান।

ইনজামামুল হক ৪৮ রানে খেলছিলেন এবং অপরদিকে তার সাথে তার সঙ্গী ছিলেন অধিনায়ক ইমরান খান। ইনিংসের ৩১তম ওভার একটি বল ইনজামামের প্যাডে লেগে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টের দিকে যায় যেখানে ছিলেন ফিল্ডিং করছিলেন জন্টি রোডস। ইনজামাম ১ রান নেওয়ার জন্য বের হওয়ার পর ইমরান রান নিতে অস্বীকৃতি জানান। ততক্ষণে রোডস বলের দিকে ছুটে গিয়ে নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছিলেন। তারপর সবাই অবাক করে দিয়ে বলকে থ্রু না করে জন্টি রোডস দৌড় দিয়ে শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্ট্যাম্প ভেঙে দেন ইনজামাম ফেরার আগে। সেইখান থেকে পাকিস্তান আর খেলায় ঘুরে দাড়াতে পারেনি, যার ফলে সাউথ আফ্রিকা ২০ রানে ম্যাচটি জিতে নেয়।

অ্যালান ডোনাল্ডের রানআউটে সাউথ আফ্রিকার স্বপ্নভঙ্গ
সাউথ আফ্রিকার বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত বিষাদময় অধ্যায়ই বেশি। দল হিসাবে তারা হাতেগোনা কয়েকটার মধ্যে একটা হলেও এই বিশেষ টুর্নামেন্টে বরাবরই তারা মুখ থুবড়ে পড়েছে। এজন্য অনেকেই তাদেরকে চোকারস (chokers) বলে অভিহিত করে থাকেন।

১৯৯৯ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া বনাম সাউথ আফ্রিকার দ্বিতীয় সেমিফাইনাল ম্যাচকে ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ২১৪ রান তাড়া করতে নেমে ইনিংসের মাঝখানে সেট হওয়া ক্যালিস ও জন্টি রোডসকে হারিয়ে সাউথ আফ্রিকা যখন ধুঁকছিল তখন ক্রিজে আগমন ঘটে ল্যান্স ক্লুসনারের। একদিক থেকে উইকেট পড়ছিল কিন্তু অন্যপ্রান্তে ক্লুসনার ১৪ বলে ৩১ রানের একটি টর্নেডো ইনিংস খেলেছিলেন।

শেষ ওভারে সাউথ আফ্রিকার প্রয়োজন ছিল ৯ রান। ৫০তম ওভারে ফ্লেমিং এর প্রথম দুই বলে ক্লুসনার টানা দুইটি বাউন্ডারি মারার ফলে শেষ ৪ বলে মাত্র মাত্র ১ রান এবং উইকেটের অন্যদিকে প্রান্তে ছিলেন ১১ নং ব্যাটসম্যান অ্যালান ডোনাল্ড। ওভারের তৃতীয় বলটি ডট হওয়ায় তিন বলে প্রয়োজন ছিল ১ রান।

ক্লুসনার চার নম্বর বলে হালকা হাতে খেলে শর্ট মিডঅফে খেলে এক রান নেওয়ার জন্য তিনি নন-স্ট্রাইক প্রান্তে পৌছা পর্যন্ত ডোনাল্ড তার জায়গায় তিনি অটল ছিলেন। ডোনাল্ড যতক্ষণে প্রান্ত বদলের প্রস্তুতি নেবেন ততক্ষণে মার্ক ওয়াহ নিজের নিয়ন্ত্রণে বল নিয়ে বাম দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বোলারের কাছে নিক্ষেপ করেন। এরপর ফ্লেমিং তৎক্ষণাৎ উইকেটের পেছনে থাকা গিলক্রিস্টকে ফিরতি বল প্রেরণ করলে তিনি নিমিষেই স্ট্যাম্প ভেঙে দেন। ততক্ষণে সাউথ আফ্রিকার ফাইনালে ওঠার স্বপ্নও ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

বাংলাদেশের ক্রিকেট পরাশক্তি পাকিস্তানকে বধ
১৯৯৯ সালের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে হারিয়ে ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ঘটনার জন্ম দিয়েছিল। ১৯৯২ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নকে অখ্যাত বাংলাদেশ হারিয়ে দেবে এটা অনেকের চিন্তার বাইরে ছিল। বাংলাদেশ এই জয়ের দ্বারা ক্রিকেট বিশ্বের বড়সারির দলগুলোকে খুব ভালো একটা বার্তা দিয়েছিল। অনেকের মতে বাংলাদেশ দলের বর্তমান অবস্থানের উন্নতির ক্ষেত্রে এই জয় অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছে।

টসে জিতে পাকিস্তান বাংলাদেশকে ব্যাট করতে পাঠানোর পর বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ২২৩ রানের একটা মধ্যম মানের একটি টার্গেট দিয়েছিল। ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে প্রতিপক্ষকে নতুন বলে সবচেয়ে বেশি ঘায়েল করা যায় এবং বাংলাদেশের বোলাররা সেটি খুব ভালোভাবে করতে সক্ষম পেরেছিল। বাংলাদেশি বোলারদের তোপে পাকিস্তান ৪২ রানে তাদের প্রথম পাঁচ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল। এই অবস্থা থেকে পাকিস্তান আর খেলায় ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি, যার ফলে তারা ১৬১ রানে অলআউট হয়ে গিয়েছিল।

যদিও এই ম্যাচের ফলাফল পাকিস্তানের জন্য খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলনা কারণ ইতিমধ্যে তারা পরবর্তী রাউন্ডে জায়গা করে নিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেটের অনুপ্রেরণার জন্য অত্যাবশ্যকীয় ছিল।

জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে কেনিয়ার সেমিফাইনালে প্রবেশ
১৯৯৬ এবং ১৯৯৯ এই দুই বিশ্বকাপে কেনিয়া মাত্র একটি ম্যাচ জিতেছিল। সুতরাং কেনিয়া দলের সবচেয়ে বড় ভক্তও হয়ত এটা আশা করেননি যে তাদের দল ২০০২ সালের বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে খেলবে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে তার এটি করতে সক্ষম হয়। ক্রিকেট বিশ্বকাপের ইতিহাসে অপেক্ষাকৃত ছোট দলগুলোর ভালো করার নজির নিতান্তই বিরল। সেই প্রেক্ষাপট থেকে চিন্তা করলে কেনিয়ার সেমিফাইনালে ওঠা ছিল একটি অভূতপূর্ব ফলাফল। যদিও নিরাপত্তা ঝুঁকির জন্য নিউ জিল্যান্ডের কেনিয়ার মাটিতে না খেলার সিদ্ধান্ত তাদের পক্ষে কাজ করেছে।

কানাডার বিপক্ষে একটি প্রত্যাশিত জয় এবং শক্তিশালী শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে অপ্রত্যাশিত জয় তাদের সুপার-সিক্সে ওঠানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। গ্রুপ থেকে সুপার-সিক্সে ওঠা অন্য দুটি দল হল শ্রীলঙ্কা এবং নিউ জিল্যান্ড এবং কেনিয়া সর্বোচ্চ পয়েন্ট অর্জন করেছিল। সেজন্য তাদের জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে একটা জয়ের প্রয়োজন ছিল সেমিফাইনালে ওঠার জন্য। যদিও ২০০২ বিশ্বকাপে তাদের রোমাঞ্চকর অভিযানের শেষ হয়েছিল সেমিফাইনালে শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে হেরে। কিন্তু তারপরও ২০১২ বিশ্বকাপটি কেনিয়ার জন্য অসাধারণ ছিল।

বিশ্বকাপ ক্রিকেট বরাবরই ক্রিকেট অনুসারীদের জন্য সেরাটা নিয়ে আসে। এটি এমন একটি মঞ্চ যেখানে বিশ্বের ক্রিকেটের তারকারা তাদের অসাধারণ নৈপুণ্যে প্রদর্শনের মাধ্যমে অমরত্ব লাভ করেন।