466 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

গল্পঃ- কালো নেকাব

  • 23
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    23
    Shares

মোঃ জাহের আলী:  ভোর পাঁচটায় এসে পেঁৗঁছলো ওসমানী বিমান বন্দরে আমজাদ হোসেন। আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর হওয়ার পর আর ঢাকায় নেমে টানা হেছড়ার কবলে পড়তে হয়না অন্ততঃ সিলেট অঞ্চলের যাত্রীদের।

যথা সময়ে বাড়ী পৌঁছেও মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল, এক মাত্র মেয়েটাকে দেখতে না পেয়ে। স্কুলে রেখে প্রবাসী হয়েছে আজ দশ বছর। ইতি মধ্যে স্কুল, কলেজ সফলতার সাথে অতিক্রম করে বিশ্ব বিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্রী রাবেয়া।

খুবই লাজুক ও বুদ্ধিমতি মেয়ে সে। ছোট বেলা থেকেই লেখা পড়ার প্রতি খুবই আগ্রহ। আর সেই আগ্রহ কাজে লাগিয়েই আজ সাফল্যের শিখরে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু তার লাজুকতা নিয়েই সব চেয়ে বড় ভয় আমজাদ হোসেনের। কারণ বর্তমান সমাজে লজ্জা, ভয় নিয়ে চললে মুখ তুবড়ে পেছনে পড়ে থাকা ছাড়া সামনে এগোনোর পথ প্রায় বন্ধ।

এই দশ বছর প্রবাস জীবনে আরও একবার বাড়ী এসেছিল আমজাদ হোসেন। সেই সময় একমাত্র আদুরী মেয়ে রাবেয়া কলেজ পড়ুুয়া। কত আশা-আকাক্সক্ষা, কত আনন্দের মাঝে কয়েক দিন ছুটি কাটিয়ে আবার সবাইকে কাঁন্নার বন্যায় ভাসিয়ে দিয়ে সু-দূর লন্ডনে পাড়ি জমাতে হয়েছিল।

সে দিন থেকেই দায়িত্ববান পিতার দায়িত্বের কথা বার বার স্মরণ হয়েছে। চিঠি, টেলিফোনে স্ত্রীর সাথে আলাপও হয়েছে বহু বার। যোগ্য ছেলের সন্ধানও মিলে গেছে অনায়াসেই।

ফরহাদের যোগ্য পুত্রই বটে মিঃ রশিদ। ক্যামব্রিজ বিশ্ব বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত সে। যেমন সুন্দর চেহারা, তেমনি তার চাল-চলন। আধুনিক সভ্যতার সাথে পুরো পুরি তাল মিলিয়ে চলা সম্ভব বলেই তো কথা প্রায় পাকা-পাকি।

ফরহাদ আমজাদ হোসেনের ছোট বেলার বন্ধু হলেও তিনি প্রবাসী হয়েছেন বহু আগে। তাই মাঝে কয়েক বছর বিচ্ছিন্ন থাকলেও আমজাদ হোসেন লন্ডন যাওয়ার পর প্রথম কিছুদিন বন্ধুর বাসায় অবস্থান করতে হয়েছিল, অবশ্য বন্ধুর একান্ত অনুরোধেই। সেখান থেকে তার ছোট ছেলে মিঃ রশিদকে অনেক কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে এবং পছন্দ।

এতদিন প্রবাসে, বিশেষ করে লন্ডনের মত উগ্র আধুনিকতার দেশে থেকেও ফরহাদ সেকেলেই রয়ে গেল। কট্রর মৌলবাদী ভাবটা এখন পর্যন্ত দূর করতে পারলনা মন থেকে। পুরোনো ধর্ম-কর্ম নিয়েই ব্যস্থ থাকতে ভাল লাগে তাঁর। ক্ষণস্থায়ী জীবনের কয়েকটা দিন নিজেকে ধর্মের পিঞ্জরে বন্দী রেখে কি লাভ ? “খাও দাও ফুর্তি কর ”তবেই না জীবন স্বার্থক। কিন্তু ফরহাদ ওসব মানতে রাজি নয়। আখেরাতের ভয় তাঁকে সব সময় জড় সর করে রাখে। তাই ওরা স্বামী-স্ত্রী দু’জনই আধুনিকতার নামে বেহায়াপনা মোটেই পছন্দ করতে পারেনা। সারা দিন ধর্ম-কর্ম নিয়ে ব্যস্থ। বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্টান ছাড়া বাইরে তেমন বেরই হয়না। কিন্তু তার ছেলে মেয়েরা সম্পুর্ণ ভিন্ন ধাঁচের হয়েছে। বিশেষ করে মিঃ রশিদই পুরোপুরি প্রার্শ্চাত্য সংস্কৃতির সাথে জড়িত ও নিজেকে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। ক্লাব-থিয়েটার, ফ্যাংশন সহ আধুনিক সভ্যতার আনন্দ উপভোগের সব গুলিই মিঃ রশিদের আয়ত্বে। আর এ কারণেই প্রার্শ্চাত্য অনুসারী আমজাদ হোসেনের এত পছন্দ। এমন একটা ছেলের হাতে মেয়েটাকে তুলে দিতে পারলে মেয়ের জীবন যেমন স্বার্থক, সেই সাথে মা-বাবারও।

বন্ধু ফরহাদের সাথে আলাপ করতেই এক বাক্যে সম্মতি দেয়ায় আরও আনন্দ ও নিঃশ্চিত। তবে বিয়ের আগে শুধু মেয়েটাকে একবার দেখতে চেয়েছে তাঁরা।

আর বর্তমান সময়ের মুখ্য বিষয় দাবী-দাওয়া সম্বন্ধে কোন কথা-ই নেই। ফরহাদ মৌলবাদী মনোভাবের হওয়ায় এ ব্যাপারে যথেষ্ট উপকারই হয়েছে আমজাদ হোসেনের।

যৌতুকের পক্ষপাতি নন বলে কোন দাবী-দাওয়াও নেই ফরহাদের। একমাত্র মেয়েটা পছন্দ হলেই তারিখ ও বিয়ে। এই সুবাদে কয়েক লক্ষ টাকা যৌতুক থেকে বেঁচে গেল আমজাদ হোসেন। মেয়ে তাদের অপছন্দ হবেনা এ বিশ্বাস তাদের আছে। সুন্দরী, বুদ্ধিমতি এবং শিক্ষায়-দীক্ষায় কোন অংশেই কম্তি নেই। মিঃ রশিদের সাথেও এ ব্যাপারে কথা হয়েছে। ছবি দেখে পছন্দ করে সম্মতিও দিয়ে দিয়েছে।

অবশ্য সন্মতির পেছনে আমজাদ হোসেনের চেষ্টার কোন ত্রুটি ছিলনা। মাঝে মধ্যে ক্লাব, থিয়েটারে এক সাথে যাওয়া, নিজের পকেট থেকেই বিল পরিশোধ, প্রয়োজনীয় সবই করেছেন তিনি। আসলে ছেলেকে পছন্দ হওয়ার পর তাকে বাগে আনতে চেষ্টার কোন কম্তি ছিলনা বলেই আধুনিকতায় অভ্যস্থ মিঃ রশিদ এত সহজে দেশের একটা সাধারণ মেয়েকে বিয়ে করতে রাজী হয়েছে ছবি দেখেই। তবে তার সাথে তাল মিলিয়ে চলার নিঃশ্চয়তা অবশ্য আমজাদ হোসেন আগেই দিয়েছে। তাছাড়া দেশে তো আর থাকছেনা তারা। সেই সাথে আমজাদ হোসেনও স্ব-পরিবারে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা পাকা করেই এসেছে।

আজই রাবেয়াকে নিয়ে আসতে হবে ঢাকা থেকে। আগামী কাল দেখতে আসবে ফরহাদ দম্পতি। সাথে মিঃ রশিদও আসবে।

সারা বাড়ীতে সাজ সাজ রব। আমজাদ হোসেনের একমাত্র মেয়েকে দেখতে আসবে বর পক্ষ। বিয়ের পর পরই লন্ডন নিয়ে যাবে তাকে, তাই পাড়া প্রতি বেশীদের মাঝেও যেন একটা বাড়তি আনন্দ বয়ে চলেছে।

সকালে রওয়ানা হয়েছে কিন্তু ঢাকায় পৌঁছতে রাত্র সাড়ে নয়টা। সমস্ত আনন্দ যেন ম্ল­ান হয়ে গেল। আজই বাড়ী ফিরে যাওয়ার কথা মেয়েকে নিয়ে, কিন্তু চার ঘন্টার পথ পাড়ি দিতে হল তের ঘন্টায়। যানজট আর রাস্তার অপ্রস্ততার কারণে গাড়ী চালানোই যায়না। এমনি ভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় বসে থেকে নির্দ্ধিষ্ট সময়ে কোন জায়গায় যাওয়া যেমন অসম্ভব, তেমনি অসম্ভব কোন দরকারী কাজ করা।

রাত্র সাড়ে নয়টার আগেই বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছাত্রী হল গুলো বন্ধ হয়ে গেছে। তবুও গেলে যাওয়া যায় মনে মনে ভাবে আমজাদ। তার চেয়ে এত রাতে বাড়ী না ফিরে সকালে গিয়েই মেয়েকে নিয়ে বাড়ী ফিরলে ভাল হবে।

অন্য বন্ধুর বাসায় যেতেও মন চাইল না। অবশেষে অনিচ্ছা সত্বেও ঢাকার এক অভিজাত হোটেলেই উঠতে হ’ল। অবশ্য দেশে থাকতে প্রায়Ñই হোটেলে যাওয়ার অভ্যেস আগেও ছিল আমজাদ হোসেনের।

হোটেলের বল রুমেও ভাল লাগছে না। ভাল লাগছেনা নাচ, গান, কোন কিছুই। হালকা ডিনার সেরে, লাইট অফ করে, ড্রিম লাইটের আলোকে কতক্ষণ চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হল, তখন আর প্রতিজ্ঞা ঠিক রাখা সম্ভব হ’লনা।

বাড়ী থেকে বেড়োনোর সময় আজ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, অন্ততঃ আজ কোন প্রকার ড্রিংকস্ করবেনা। কিন্তু বাঁধ সাধল রাস্তার যানজট। নতুবা যথা সময়ে ঢাকা পৌঁছে মেয়েকে নিয়ে সন্ধ্যার আগেই বাড়ী ফিরতে পারলে এমনটি সহজে হত না। তাই নিত্য দিনের অভ্যেসটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।

অস্বস্তি বাড়তে থাকায় কলিং বেলে হাত রাখতে হ’ল। বয়কে বলল  দু’বোতল হুইস্কি।

অভিজ্ঞ হোটেল বয় দু’বোতল হুইস্কির সাথে নিয়ে এলো এক নতুন খোঁশ-খবর।

নতুন একটা মেয়ে এসেছে আজ। এর আগে আর কোনদিন হোটেলে আসেনি সে। তার বান্ধবী অনেক বুঝিয়ে-সুজিয়ে, লোভ-লালসা দেখিয়ে, অনেক কষ্টে বশ্ করে নিয়ে এসেছে। বলা যায়, ছয় মাসের সাধনার ফসল।

মিতা অবশ্য নিয়মিত আসা যাওয়া করে হোটেলে অনেকদিন থেকেই। ছাত্রী হোষ্টেলে তার নির্দ্ধিষ্ট কক্ষ থাকলেও রাতে খুব কম সময়ই থাকে সেখানে। মাঝে মধ্যে দু/একজন নতুন বান্ধবী নিয়ে আসতে পারলে অতিরিক্ত কিছু পাওয়া যায়। তাই কয়েক বছর থেকেই নিজে আসার সাথে সাথে নতুনদেরকেও এ পথে নিয়ে আসার কাজ করছে। আর এই পথ ধরার পর থেকেই জীবনের গতি যেন পাল্টে গেছে মিতার। নিজের ইচ্ছে মত উচ্ছাভিলাষী চলা ফেরার পরও মাসে মাসে বহু টাকা বাড়ী পাঠাচ্ছে। যা দেখে অনেকেই লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখ্ছে। এবং এই লালসার শিকার হয়েই এই কুপথে পা বাড়িয়েছে। যার ফলে মিতারও এগিয়ে যাওয়ার পথ হয়েছে সুগম।

বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়ুয়া মেয়েদের এসব হোটেলে অবশ্য আলাদা একটা কদরও আছে। বিশেষ করে বড় বড় ব্যবসায়ী, কিছু সরকারী আমলা, কালো টাকার অধিকারী কিছু মুখোশদারী সন্মানী ব্যাক্তি বা বিদেশী পর্যটক। যেÑই হোন, নতুন মেয়ের কথা শুনলেই জিবে পানি এসে যায় তাদের। তাছাড়া কোন ছবির নায়িকা হলে তো কথা-ই নেই। আমজাদ হোসেনও এর ব্যাতিক্রম নয়।

নতুন মেয়েটাকে নিয়ে আসতে বলেই ঢক্ ঢক্ এক বোতল তরল পদার্থ গিলে ফেলে, অন্য বোতলটি হাতে নিয়ে কাম্ড়িয়ে বোতলের ছিপি খুলে দূরে নিক্ষেপ করে গিলতে থাকে পুর্ববত।

ইতি মধ্যে কালো নেকাবে ঢাকা সুন্দরী নতুন মেয়েটাকে অনেকটা জোর করেই ঠেলে দেয়া হয়েছে কক্ষের ভিতরে। জীবনে প্রথম বান্ধবীর পাল্লায় পড়ে এ কোন্ সর্বনাশের পথে পা বাড়িয়েছে জানেনা সে নিজেও। দুরু দুরু বক্ষে কক্ষে প্রবেশ করেই বজ্রাহতের মত টক্ টক্ করে কাঁপতে শুরু করছে। ভয়ে, লজ্জায় সমস্ত শরীর হিম্ শীতল হয়ে যেন বরফের মত জমে কাঠ হয়ে গেছে। না পারছে বেড়িয়ে আসতে, না পারছে দাঁড়িয়ে থাকতে। টল্তে টল্তে দু’পা এগিয়ে খাটের উপর ধপাস্ করে পড়তে গিয়েও কোন মতে হেলান দিয়ে বসে পড়ে খাটের কোণায়।

দ্বিতীয় বোতলের পানিও নিঃশেষ করে ফিরে তাকিয়েছে আমজাদ হোসেন। কালো নেকাবে ঢাকা মেয়েটার চেহারা দেখতে না পেলেও পায়ের দিকে দৃষ্টি পড়তেই মাংস খেকো বাঘের মত লিক্ লিক্ করতে থাকে জিবের ডগা। ফুটন্ত হাড়ির মত টগ বগিয়ে ফুটতে থাকে গায়ের রক্ত। সুরা পানের সাথে সাথে নব-সুধা পানের আকাঙ্খায় অধীর হয়ে উঠে সে। নেশায় টল্তে টল্তে এগিয়ে যায় রক্ত পিপাসু হায়েনার মত। মেয়েটাকে এক টানে ঝাপ্টে ধরে বুকের সাথে। হেস্কা টানে খুলে নেয় মুখের “কালো নেকাব”। ভুত দেখার মতই চম্কে উঠে। সমস্ত  দুনিয়া যেন মাথার উপর ভেঙ্গে খান্ খান্ হয়ে পড়তে থাকে শিলা বৃষ্টির মত। কাল বৈশাখী ঝড়ের তান্ডবে পাখার মত ঘুরতে থাকে সমস্ত কক্ষ। যম-দূতের পদধ্বনি যেন শুন্তে পায়।

মেয়েটাকে মুহুর্তে বাহু মুক্ত করে দিয়ে লাফিয়ে পড়ে খাট থেকে মাটিতে। শুধু একটা আর্ত চিৎকারে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠে রাবেয়া

  • 23
    Shares
  • 23
    Shares