84 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

জনগণের কর দেওয়ার মতো টাকা নেই, এটি আমি বিশ্বাস করি নাঃ স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নগর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে জাতীয় সংলাপের আয়োজন করা হয়। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে।

দেশের অধিকাংশ পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা অনিয়মিত। দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-আন্দোলন চলছে। এর মধ্যে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেছেন, কোনো পৌরসভা কর্মীদের ১২ মাসের বেতন দিতে না পারলে পরিষদ ভেঙে দিতে আইন সংশোধন করা হবে। তবে পৌর মেয়ররা বলছেন, কেন্দ্রীয় সরকার শুধু আয় বাড়াতে বলে, কিন্তু আয় বাড়াতে যেসব সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন, তা দিচ্ছে না।

নগর স্থানীয় সরকারগুলো শক্তিশালী করতে করণীয় বিষয়ে গতকাল রোববার রাজধানীতে একটি জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন’ প্রকল্প এ সংলাপের আয়োজন করে। সংলাপে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তা, বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়র এবং উন্নয়নকর্মীরা আলোচনায় অংশ নেন।

নিজের কর্মীদের জীবনমানই উন্নয়ন করতে পারছি না, জনগণের জীবনমান কীভাবে উন্নয়ন করব? আয় বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া যায় না। পৌরসভার নিজস্ব জমি নেই। আয় বাড়াতে মার্কেট নির্মাণ করতে খাসজমি পেতে নানা জটিলতায় পড়তে হয়। শুধু বাসাবাড়ির গৃহকর দিয়ে আয় বাড়ানো সম্ভব না বললেন রফিকুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক (ম্যাব)

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, অধিকাংশ পৌরসভা তাদের কর্মীদের বেতন-ভাতা দিতে পারছে না। আইন অনুযায়ী, যেসব খাতে আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে, সেগুলো কাজে লাগাতে হবে। তিনি বলেন, ‘জনগণের কর দেওয়ার মতো টাকা নেই, এটি আমি বিশ্বাস করি না।’

যেসব পৌরসভা কর্মীদের ১২ মাস পর্যন্ত বেতন দিতে পারবে না, তাদের পরিষদ ভেঙে দিতে আইন সংশোধন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করলেই হবে না, জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

প্রায় মন্ত্রীর সুরেই কথা বলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। তিনি বলেন, পৌরসভাগুলোকে নিজেদের আয় বাড়ানোর পথ নিজেদেরই খুঁজতে হবে, মন্ত্রণালয় আইনি সহায়তা দেবে। গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকলে লোকজন অহেতুক শহরে আসবে না।

দেশের ৩২৯টি পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার প্রধান উৎস নিজস্ব আয়। কিন্তু আয় পর্যাপ্ত না থাকায় বেতন-ভাতা দেওয়ার সামর্থ্য অধিকাংশ পৌরসভার নেই। পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠন পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, ৪০টি পৌরসভায় ১০ মাস থেকে ৬০ মাস পর্যন্ত বেতন-ভাতা বকেয়া। ১ মাস থেকে ৫৯ মাস বেতন-ভাতা বকেয়া ১৭০টি পৌরসভায়।

সংলাপে পৌরসভার মেয়রদের সংগঠন মিউনিসিপ্যাল অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ম্যাব) সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নিজের কর্মীদের জীবনমানই উন্নয়ন করতে পারছি না, জনগণের জীবনমান কীভাবে উন্নয়ন করব? আয় বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া যায় না। পৌরসভার নিজস্ব জমি নেই। আয় বাড়াতে মার্কেট নির্মাণ করতে খাসজমি পেতে নানা জটিলতায় পড়তে হয়। শুধু বাসাবাড়ির গৃহকর দিয়ে আয় বাড়ানো সম্ভব না।’

জনগণের কর দেওয়ার মতো টাকা নেই, এটি আমি বিশ্বাস করি না  বলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম।

সংলাপে সভাপতিত্ব করেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, পৌরসভাকে বরাদ্দ পেতে হয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দেনদরবার করে। সরকার পৌরসভাগুলোকে যে বরাদ্দ দেয়, তা উন্নয়নকাজের জন্য। সেগুলো দিয়ে কর্মীদের বেতন দেওয়া ঠিক নয়। তিনি বলেন, ‘উদ্যোগ নিলাম, পলিসি করলাম কিন্তু মাঠপর্যায়ে কী কাজ হলো, সেটি দেখতে হবে। শুধু কাগুজে উদ্যোগ নিলে হবে না।’

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, সিটি করপোরেশনের আয় বেশি না হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে উপায় থাকে না। সিটি করপোরেশনের সমন্বয় সভায় ডিসি, এসপিরা আসেন না। তাঁদের প্রতিনিধি পাঠান। শিশুবান্ধব নগরী গড়তে হলে পার্ক, খেলার মাঠ দরকার। কিন্তু পার্ক, মাঠের জন্য খাসজমি চেয়েও পাওয়া যায় না।

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো অতিমাত্রায় কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভরশীল বলে মনে করেন সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘জাতীয় নগর উন্নয়ন নীতিমালা’ প্রণয়ন করা প্রয়োজন। বিভিন্ন সংস্থা প্রকল্প নেয়, এসব প্রকল্প নেওয়ার আগে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে না।

স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব দীপক চক্রবর্তী বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো অতিমাত্রায় গৃহকরের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আদর্শ কর তফসিল অনুযায়ী আরও নানা ধরনের কর সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। একেক সিটি করপোরেশনে গৃহকরের একেক হার, এটিও একক হার করা প্রয়োজন।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দেশের ১১টি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। সংলাপে গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইপিই গ্লোবালের ভাইস প্রেসিডেন্ট শ্রীপর্ণা আইয়ারের উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এসব প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি সমাধানে করণীয় তুলে ধরা হয়। প্রকল্পটিতে বাংলাদেশ সরকার, ব্রিটেনের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস এবং ইউএনডিপি বাংলাদেশ আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা করছে।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দেশের নগরায়ণ প্রক্রিয়া সমন্বয়হীন, অপরিকল্পিত ও নীতিনির্ধারণী কাঠামো অনুকূল নয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে লোকবল সংকট তীব্র। প্রশিক্ষিত ও দক্ষ লোকবল নেই। প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজেট প্রক্রিয়া বাস্তবসম্মত নয়। প্রস্তাবিত ও সংশোধিত বাজেটে বিস্তর পার্থক্য থাকে। একই ধরনের অনেক প্রকল্প রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও সংযোগ থাকতে হবে।

করোনা মহামারিতে নগরে বসবাসকারী দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমানের অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে বলে মনে করেন বাংলাদেশ নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট ডিকসন। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। পরিকল্পনা নেওয়ার ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি সুদীপ্ত মুখার্জি বলেন, নগরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। সংলাপে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, পিপিআরসির রিসার্চ ফেলো এ এম এম নাসিরুদ্দীন প্রমুখ বক্তব্য দেন।

সূত্রঃ প্রথম আলো

পথিকটিভি/ এ আর