211 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে হোটেল-রেস্তোরাঁ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পথিক রিপোর্ট: দেশে জনসমাগম স্থানে ধূমপান নিষিদ্ধ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। রেস্তোরাঁসহ পর্যটন এলাকায় ধূমপান এখন নিত্যদিনের ঘটনা। রাজধানী ঢাকার ৯৮ শতাংশ হোটেল-রেস্তোরাঁ তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। এতে প্রত্যক্ষ ধূমপায়ীদের পাশাপাশি অনেকে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে। গবেষণা বলছে, প্রাপ্তবয়স্কদের ৪২.৭ শতাংশ আচ্ছাদিত কর্মক্ষেত্রে, ৪৯.৭ শতাংশ রেস্তোরাঁয় এবং ৪৪ শতাংশ গণপরিবহনে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। অপ্রাপ্তবয়স্কদের (১৩-১৫ বছর) ৫৯ শতাংশ পাবলিক প্লেসে এবং ৩১.১ শতাংশ বাড়িতে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়। কর্মক্ষেত্র, রেস্তোরাঁসহ সব জনসমাগম স্থানকে শতভাগ ধূমপানমুক্ত করা গেলে সেখানে আগতদের হৃদরোগের ঝুঁকি ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ জন্য রেস্তোরাঁসহ পর্যটন এলাকাকে শতভাগ ধূমপানমুক্ত করতে আইন সংশোধনের দাবি উঠেছে।

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা বাবদ প্রত্যক্ষ ব্যয় আট হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং তামাক ব্যবহারের ফলে অকাল মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের কারণে উৎপাদনশীলতা হারানোর ক্ষতি ২২ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। পরোক্ষ ধূমপানের আর্থিক ক্ষতি তামাকজনিত মোট আর্থিক ক্ষতির ১৩.৫ শতাংশ। ২৫ থেকে ৬৯ বছর বয়সী পুরুষ অধূমপায়ীদের তুলনায় ধূমপায়ীদের সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতার সময় তামাকজনিত অসুখে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার ঝুঁকি ৭০ শতাংশ বেশি।

 

তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো বলছে, রেস্তোরাঁসহ পর্যটন এলাকায় ধূমপানের জন্য নির্দিষ্ট স্থান রাখার বিধান বাতিল করা উচিত। ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডস বাংলাদেশের গ্র্যান্টস ম্যানেজার আবদুস সালাম মিয়া বলেন, ‘অনেকে মনে করতে পারেন শতভাগ ধূমপানমুক্ত স্থান পর্যটনের প্রসারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু পার্শ্ববর্তী ভুটান শতভাগ ধূমপানমুক্ত দেশ হওয়া সত্ত্বেও পর্যটনে তারা অনেক এগিয়ে রয়েছে। হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোকে পুরোপুরি ধূমপানমুক্ত করতে আইন সংশোধন করতে হবে।’

 

ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য সেক্টরের সহকারী পরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘কানাডা, স্পেন, নেপালসহ বিশ্বের ৬৩টি দেশে পাবলিক প্লেসে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত জায়গা নিষিদ্ধ করে আইন রয়েছে। অথচ আমাদের দেশের আইনে পাবলিক প্লেসে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত এলাকা, চার দেয়ালে আবদ্ধ এক কক্ষবিশিষ্ট নয় এমন রেস্টুরেন্ট, একাধিক কক্ষবিশিষ্ট গণপরিবহনে ও অযান্ত্রিক পাবলিক পরিবহনে ধূমপানের স্থান রাখা যাবে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারা ৭ সংশোধন করে সব ধরনের পাবলিক প্লেসে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান নিষিদ্ধ করা এবং ধূমপানসহ যেকোনো ধরনের তামাক ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।’

 

রাজধানী ঢাকার ৯৮ শতাংশ হোটেল-রেস্তোরাঁ তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন মানছে না বলে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের একটি জরিপে বলা হয়েছে। ঢাকা শহরের রেস্তোরাঁয় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের অবস্থা যাচাইয়ের জন্য ‘ক্রস সেকশনাল’ পদ্ধতিতে দুই সিটি করপোরেশন এলাকার ৩৭১টি রেস্তোরাঁয় পরিচালিত জরিপের ফল সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।

 

জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩৭১টি রেস্তোরাঁর মধ্যে ২ শতাংশ রেস্তোরাঁ যথাযথভাবে আইন বাস্তবায়ন করছে। আর ট্রেড লাইসেন্স আছে এমন রেস্তোরাঁয় আইন লঙ্ঘনের হার ৩১.৪ শতাংশ এবং ট্রেড লাইসেন্সবিহীন রেস্তোরাঁয় আইন লঙ্ঘনের হার ৩৯.৭ শতাংশ। এ ছাড়া ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী ‘ধূমপান হতে বিরত থাকুন, ইহা শাস্তিযোগ্য অপরাধ’ লেখা বিজ্ঞপ্তি সাঁটানোর নিয়ম থাকলেও ৯৮ শতাংশ রেস্তোরাঁয় এ ধরনের কোনো সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি পাওয়া যায়নি। আবার ৯২ শতাংশ রেস্তোরাঁয় কোনো ধরনের সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তিও পাওয়া যায়নি।

 

আইনের শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে সিটি করপোরেশনের বাজেটে সুনির্দিষ্টভাবে বরাদ্দ রাখা, সব রেস্তোরাঁ ট্রেড লাইসেন্সের আওতায় এনে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রতিপালনের শর্ত আরোপ, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, রেস্তোরাঁ মালিক ও কর্মচারীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে সভা আয়োজনসহ বিভিন্ন সুপারিশ ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের পক্ষ থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কাছে তুলে ধরা হয়।

 

ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও ওয়াশ সেক্টরের পরিচালক ইকবাল মাসুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে অনেক হোটেল, রেস্টুরেন্ট, কফিশপ ইত্যাদি রয়েছে, যেগুলোর চারপাশ দেয়াল দ্বারা আবদ্ধ নয়। সেসব জায়গাসহ সব ধরনের পাবলিক প্লেস, কর্মক্ষেত্র ও গণপরিবহনে ধূমপানসহ যেকোনো ধরনের তামাক ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে হবে।’

 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আইন সংশোধনী কমিটির অন্যতম এই সদস্য বলেন, ‘তামাক আইন সংশোধনে সম্প্রতি একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরই মধ্যে খসড়া প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। আমরা আশা করছি, শিগগিরই এ বিষয়ে অগ্রগতি হবে।’

 

এদিকে পর্যটনকেন্দ্র যাতে পুরোপুরি ধূমপানমুক্ত থাকে সে জন্য বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় কাজ করবে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে হসপিটালিটি সেক্টর যেমন-বিনোদনকেন্দ্র, হোটেল-মোটেল ও এক কক্ষবিশিষ্ট নয় এমন রেস্তোরাঁয় ধূমপানের জন্য নির্দিষ্ট স্থান রাখার বিধান রয়েছে। অনেক সময়ই দেখা যায়, ধূমপান করার জন্য নির্দিষ্ট স্থানটি পুরোপুরি সুরক্ষিত নয়। ফলে ধূমপানের ধোঁয়া ধূমপানমুক্ত এলাকাতেও চলে যায়। যার ফলে অন্যরাও পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। পাবলিক প্লেসে ধূমপানমুক্ত এলাকাকে পুরোপুরি ধূমপানমুক্ত রাখা উচিত। এর ফলে অধূমপায়ী পর্যটক, নারী ও শিশু পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবেন।’

 

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘ধূমপানে নিরুৎসাহ দিতে সিগারেটের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি আইন সংশোধন করতে হবে। আমরা আগামীর স্বাস্থ্যবান তরুণদের পেতে চাই। তাহলেই উন্নত বাংলাদেশ গড়তে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা আমরা পাব।’