244 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

দুই-দুইটি বিশ্বযুদ্ধের কারিগর জার্মানি

দুই-দুইটি বিশ্বযুদ্ধের কারিগর জার্মানি

  • 8
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    8
    Shares

দুই-দুইটি বিশ্বযুদ্ধের কারিগর জার্মানি। একসময় বিশ্বের বৃহত্তম মিলিটারি পাওয়ার ছিল দেশটি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর বিধ্বস্ত জার্মানি আবার চরম প্রতিশোধ স্পৃহায় মেতে ওঠে। হিটলারের নেতৃত্বে দ্রুত জার্মানি আবার একটি শক্তিশালী মিলিটারি পাওয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। জার্মান মিলিটারি তখন অনেক দেশের জন্য চরম আতঙ্ক আর ভীতিকর হিসেবে আবির্ভূত হয়। আবার জার্মানি শুরু করে যুদ্ধ। আবার পরাজিত হয়। এরপরের ইতিহাস হলো- জার্মানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে স্নায়ুযুদ্ধে জার্মানি পরিণত হয় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে।

জার্মানিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ২১টি সামরিক ঘাঁটিসহ মোট ৪০টি সামরিক স্থাপনা। সেখানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫ হাজার সৈন্য এবং বিপুলসংখ্যক বেসামরিক আমেরিকান। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এ সৈন্য সংখ্যা কমানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। এতে রাশিয়ার দিক থেকে জার্মানি নিরাপত্তা হুমকিতে পড়েছে। ৭৫ বছর ধরে জার্মানিতে অবস্থান করছে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য। যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা জার্মানিতে নিয়ে এসেছে তাদের সংস্কৃতি। ২০১৯ সালে জার্মানির বিভিন্ন ঘাঁটিতে ১৭ হাজার আমেরিকান বেসামরিক লোকজনকে চাকরি দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া ছিল জার্মানির বিরুদ্ধে। কিন্তু খুব শীঘ্রই যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া শত্রুতে পরিণত হলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে জার্মানি। এর কারণ জার্মানির কৌশলগত অবস্থান। রাশিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘ স্নায়ুযুদ্ধে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘাঁটি হয়ে ওঠে জার্মানি।

অবশ্য ২০ বছর আগের ইরাক যুদ্ধের সময় জার্মানি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগ দেয়নি। তখন শুরু হয় জার্মান-যুক্তরাষ্ট্র তিক্ততার অধ্যায়। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় জার্মান-যুক্তরাষ্ট্র তিক্ততা চরম আকার ধারণ করে। অনেকের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন জার্মানি থেকে ১২ হাজার সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জার্মানির গুরুত্ব কমবে না। কারণ, রাশিয়ার অব্যাহত হুমকির ক্ষেত্রে জার্মানির রামস্টেন সামরিক ঘাঁটির গুরুত্ব অপরিসীম। জার্মানির এ ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপ এয়ার ফোর্সের সদর দফতর।

সামরিক দিক দিয়ে জার্মানি বর্তমানে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো দেশ নয়। সামরিক শক্তির দিক দিয়ে জার্মানির অবস্থান বিশ্বে ১৫তম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির নিজস্ব তৈরি বিভিন্ন ধরনের শক্তিশালী ফাইটার জেট ছিল। যুদ্ধে পরাজয়ের পর এলাইড কন্ট্রোল কমিশন কর্তৃক জার্মানির মিলিটারি এভিয়েশন সম্পূর্ণরুপে নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৫৫ সালে পশ্চিম জার্মানি ন্যাটোতে যোগ দেয়ার পর সোভিয়েত ইউনিয়নের মোকাবেলায় জার্মানির আত্মরক্ষার প্রয়োজন স্বীকার করে বিজয়ী শক্তি। ১৯৫৬ সালে ৯ জানুয়ারিতে আবার গঠিত হয় জার্মান এয়ার ফোর্স। আসুন জেনে নেই জার্মানির সামরিক শক্তির কিছু তথ্য।

সামরিক দিক দিয়ে জার্মানি বর্তমানে বিশ্বে কোনো আলোচিত দেশ না হলেও সমরাস্ত্র শিল্পে জার্মানি বিশ্বে অন্যতম শক্তিশালী একটি দেশ। জার্মানি বিশ্বের চতুর্থ শীর্ষ সমরাস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং ফ্রান্সের পর জার্মানির অবস্থান । ২০১৯ সালে জার্মানি রেকর্ড ৮ বিলিয়ন ইউরো সমরাস্ত্র বিক্রি করেছে।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্স ইনস্টিটিউট বা সিপ্রির তথ্য অনুসারে ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিশ্বে যত সমরাস্ত্র বিক্রি হয়েছে তার সাড়ে ৫ ভাগ বিক্রি করেছে জার্মানি।

জার্মানির সমরাস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলো দক্ষিন কোরিয়া। এরপর আলজেরিয়া এবং মিশর। ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত জার্মানি যে সমরাস্ত্র বিক্রি করেছে তার ২৪ ভাগ কিনেছে দক্ষিন কোরিয়া, ১০ ভাগ কিনেছে আলজেরিয়া এবং ৯ ভাগ কিনেছে মিশর। গত ৫ বছরে জার্মান বিশ্বের মোট ৫৫টি দেশের কাছে সমরাস্ত্র বিক্রি করেছে। জার্মানি তাদের আর্মির প্রয়োজনীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমরাস্ত্র নিজেরাই তৈরি করে।

জার্মান যেসব সমরাস্ত্র বিক্রি করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সাবমেরিনসহ বিভিন্ন ধরনের রণতরী। গত ৫ বছরে জার্মানি যেসব সমরাস্ত্র বিক্রি করেছে তার ৪৬ ভাগ হলো রণতরী। গত ৫ বছরে জার্মানি মোট ১১টি সাবমেরিন বিক্রি করেছে। এর মধ্যে তিনটি কিনেছে মিশর। রণতরী ছাড়া জার্মানি বিভিন্ন ধরনের সাঁজোয়া যান বিক্রি করে বিভিন্ন দেশের কাছে।

উন্নতমানের ভারী শিল্পের জন্য বিশ্বখ্যাত জার্মানি। জার্মান শিল্প পণ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো টেকসই । এ কারণে বিশ্বব্যাপী জার্মান সমরাস্ত্রসহ শিল্প পণ্যের রয়েছে সুনাম এবং চাহিদা। ইউরোপে এরোস্পেস এবং ডিফেন্স মার্কেটে জার্মানির অবস্থান তৃতীয়। এ খাতে ২০১৮ সালে জার্মানির আয় হয় ৪৭ বিলিয়ন ডলার।

এক সময় গোটা জার্মানিতে ছড়িয়ে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি। রাশিয়ার সাথে স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর সেখান থেকে মোট ২২০টি সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটি গুটিয়ে আনা হয়। ন্যাটোর নিউক্লিয়ার শেয়ারিং কনসেপ্ট এর আওতায় জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্রের বি-৬১ পারমানিবক বোমা মুজদ রয়েছে। শত্রু রাষ্ট্র দ্বারা পারমানিবক বোমা হামলার শিকার হলে জার্মানি এ বোমা ব্যবহার করতে পারবে। আসুন জেনে আসি জার্মানির সামরিক শক্তির আরো কিছু তথ্য

জার্মানির বর্তমান সৈন্য সংখ্যা ২ লাখ ১৫ হাজার। সক্রিয় সৈন্য সংখ্যা ১ লাখ ৮৫ হাজার। রিজার্ভ সৈন্য ৩০ হাজার। জার্মানির ট্যাঙ্কা সংখ্যা ২৪৪টি। সাজোয়া যান ৫ হাজার ২৬০টি। সেলফ প্রপেল্ড আর্টিলারি ১১৭টি। রকেট প্রজেক্টর ৩৮টি।

জার্মানির মোট রণতরীর সংখ্যা ৮০টি। এর মধ্যে ফ্রিগেট ১০টি, করভেট ৫টি, সাবমেরিন ৬টি, মেরিন ওয়ারফেয়ার ১২টি। তাদের কোনো ডেস্ট্রয়ার ও বিমানবাহী রণতরী নেই।

হেলিকপ্টারসহ জার্মানির বিমান বাহিনীতে মোট বিমানের সংখ্যা ৭০১টি। এর মধ্যে ফাইটার জেট ১৩৭টি। ্ডেডিকেটেড এটাক ফাইটার জেট ৭৫টি। সামরিক পরিবহন বিমান ৭২টি এবং প্রশিক্ষন বিমান ৩২টি। জার্মানির হেলিকপ্টার সংখ্যা ৩৩৮টি। এর মধ্যে এটাক হেলিকপ্টার রয়েছে ৫৬টি।

জার্মান বিমান বাহিনীতে ১৪১টি ফোর্থ জেনারেশন ইউরো ফাইটার টাইফুন রয়েছে। এ বিমানের নির্মাতা এয়ারবাস, ইতালীর লিওনার্দো এবং বৃটেন। এ বিমান নির্মান প্রকল্পের সাথে যুক্ত রয়েছে জার্মান এবং স্পেন।

জার্মানির কাছে ৬০টি পানাভিয়া টরনাডো বহুমুখী ফাইটার জেট রয়েছে। পানাভিয়া টরনাডো বোমারু বিমান হিসেবেও পরিচিত। এটি পারমানবিক বোমা বহনে সক্ষম। পানাভিয়া টরনাডোর নির্মাতা যৌথভাবে জার্মানি, ইতালী এবং বৃটেন।

জার্মানির কাছে যেসব সামরিক পরিবহন, সার্ভিলেন্স ও ফুয়েল ট্যাঙ্কার বিমান রয়েছে সেগুলো মূলত ইউরোপের এয়ারবাস নির্মিত। ্ এছাড়া রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড মার্টিন নির্মিত সি১৩০ জে সুপার হারকিউলিস।

জার্মানির কাছে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড-সিকোরস্কি নির্মিত ৭২টি সিএইচ-৫৩ হেলিকপ্টার। এ ছাড়া ইউরো কপ্টারসহ ইউরোপের নির্মিত বিভিন্ন ধরনের লাইট এটাক, পরিবহন ও প্রশিক্ষন হেলিকপ্টার রয়েছে।

জার্মানির মেইন ব্যাটল ট্যাঙ্ক লিওপার্ড ২ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ইনফ্যান্ট্রির ফাইটিং ভিহিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং ভিহিক্যালস, আরমারড পারসোনাল ক্য্যারিয়ারসহ আর্মির যাবতীয় সাজোয়া ও পরিবহন যান জার্মানি নির্মিত। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের এন্টি ট্যাঙ্ক উইপনস যেমন গ্রেনেড ও গ্রেনেড লঞ্চার, রকেট লঞ্চার, রকেট প্রপেল্ড গ্রেনেড, এন্টি ট্যাঙ্ক মিসাইল, শোল্ডার লঞ্চ মিসাইল জার্মানি নির্মান করে।

জার্মান আর্মিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের হ্যান্ড গান, সাব মেশিনগান, এসল্ট রাইফেল, ব্যাটল রাইফেল, লাইট মেশিনগান, জেনারেল মেশিন গান, হেভি মেশিন গান এবং বিভিন্ন ধরনের রাইফেল সম্পূর্ণরুপে জার্মান নির্মিত।

আর্টিলারি এবং এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এর ক্ষেত্রে জার্মানি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথভাবে নির্মান করে মাল্টিপল রকেট লাঞ্চার। জার্মানির রয়েছে নিজস্ব তৈরি সেলফ প্রপেল্ড আর্টিলারি। জার্মান আর্মিতে রয়েছে জার্মান এবং ফ্রান্সের যৌথভাবে তৈরি বিভিন্ন ধরনের হেলিকপ্টার।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তার রাজনীতিতে অনুপস্থিত জার্মানি। তবে সামরিক দিক ছাড়া অর্থনীতিসহ অন্যান্য দিক দিয়ে জার্মানি বর্তমানে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী একটি দেশ। ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি বর্তমানে জার্মানি। ইউরোপীয় ইউনিয়নে জার্মানি একটি অন্যতম প্রভাবশালী দেশ।

অর্থনীতিসহ বিভিন্ন খাতে উন্নতি এবং স্থিতিশীলতার পাশপাশি জার্মানি এখন বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজেকে আবার একজন খেলোয়াড় হিসেবে হাজির করতে চায়। বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চল, পারস্য উপসাগর কেন্দ্রিক রাজনীতিতে ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে জার্মানি।

২০১৯ সালে ওমান উপসাগরে নরওয়ের একটি তেল ট্যাঙ্কারে আক্রমন এবং ২০২০ সালে হরমজু প্রণালীতে ব্রিটিশ পতাকাবাহী তেল ট্যাঙ্কার আটক করে ইরান। এ ঘটনার পর এ অঞ্চলে স্বাধীন সমুদ্র চলাচল নিশ্চতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের হয়ে ভূমিকা পালন করতে চায় জার্মানি। এ জন্য জার্মানি ইউরোপীয় ইউনিয়নকে প্রস্তাবও দিয়েছে। অপর দিকে জার্মানি গত কয়েক বছর ধরে মাঝে মধ্যে ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে অংশ নিচ্ছে বিভিন্ন ধরনের নৌ মহড়ায়। মাঝে মধ্যে মোতায়েন করছে তাদের রণতরী।

  • 8
    Shares