
বৃষ্টি মানেই আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়, বরং মনোজাগতিক এক অভ্যুত্থান। বাংলা সাহিত্যে বৃষ্টি কখনও হয়েছে রোমান্টিকতার প্রতীক, কখনওবা চিরবিচ্ছেদের কান্না। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায়, “প্রকৃতি কখনো একা থাকে না”—এই একাকিত্বই আজ আমার ভিতরে প্রবলভাবে ধ্বনিত হচ্ছে। তুমি নেই, তবুও আজ এই মেঘলা বৃষ্টির দুপুরে মনে হচ্ছে তুমি পাশে বসে আছো, ঠিক যেন জীবনানন্দ দাশের সেই কুয়াশায় ঢাকা মেয়েটির মতো—”আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে — এই বাংলায়…”
তোমাকে মনে পড়ে, কারণ এই বৃষ্টি শুধু আকাশ নয়, আমার হৃদয়কেও ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছে।
বৃষ্টি যে কেবল জল নয়—সে তো আকাঙ্ক্ষার একান্ত ভাষ্য, এক অস্পষ্ট ব্যাকরণ, যার ব্যাখ্যা করা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।
হুমায়ূন আহমেদের বৃষ্টির সংলাপের মতো, “জানালার কাঁচে বৃষ্টি পড়ছে আর আমি তোমাকে ভাবছি।” আমি ঠিক সেই চরিত্র, যে জানালার ধারে বসে পৃথিবীর সমস্ত কষ্ট একা গ্রহণ করে নেয়, শুধু একটি মুখ মনে রেখে।
আহমদ ছফা বলেছিলেন, “যে প্রেম গভীর, সে নীরব।”
তাই এই বৃষ্টির দিনে আমি চিৎকার করি না, কান্নাও করি না,
আমি শুধু অনুভব করি, তুমি কতটা অভাব হয়ে আছো আমার জীবনে।
তোমার অনুপস্থিতির শব্দ, এই বৃষ্টির শব্দের চেয়েও বেশি প্রবল, বেশি ধারালো।
তোমাকে হারিয়ে আমি এখন শব্দহীন বৃষ্টির মতো—ঝরে পড়ি, কিন্তু শোনা যায় না।
প্রকৃতি কখনো নিছক পটভূমি হয় না—সে যেন অন্তর্গত এক চরিত্র।
মেয়ের চোখে বৃষ্টি যেমন ভালোবাসা,
ছেলের মনে বৃষ্টি তেমনি এক গোপন যন্ত্রণা।
কাজী নজরুল ইসলাম যেমন বিদ্রোহের কবি, তেমনি প্রেমের বৃষ্টিতেও তিনি ভিজেছেন।
“দু’টি নয়ন যবে এল জলে ভরে, আমার দেহ-মন রহিল না আর ঘরে”—
আমার অবস্থাটাও ঠিক তেমনই,
বৃষ্টি এলেও ঘরে থাকতে ইচ্ছে করে না,
তোমার পথ ধরে ছুটে যেতে মন চায়।
আজকের এই নিঃসঙ্গ দুপুরে, আমি জানি—তুমি অনেক দূরে।
তবু কোথাও মনে হয়, এই মেঘের নিচে তুমি আর আমি একই ছাদের নিচে,
একই বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছি,
একই বৃষ্টিতে ভিজছি, যদিও আলাদা দিগন্তে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “আকাশ ভাঙে বৃষ্টিতে, মন ভাঙে নীরবে।”
আমার মনের ভাঙনের শব্দ কেউ শোনে না,
তোমার অনুপস্থিতি আমাকে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত করে।
এই যে বৃষ্টি—তোমার মতোই নিষ্ঠুর।
সে এসে সব ভিজিয়ে দেয়, আবার সব রেখে চলে যায়—আদ্রতা রেখে যায়, কিন্তু সাথে থাকে না।
আমি আজ আর প্রেমিক নই,
আমি একজন পাঠক,
যে প্রতিটি ফোঁটায় তোমার নাম খুঁজে ফেরে,
প্রতিটি জমে থাকা কাদায় পদচিহ্ন দেখে ভাবে—”এটা যদি তোমার হতো!”
তুমি যদি এই প্রবন্ধ পড়ো, তাহলে জেনে রেখো,
তোমাকে নিয়ে লেখা এই শব্দগুলো অলঙ্কার নয়,
এগুলো আমার হৃদয়ের ভেজা মাটি।
যেখানে প্রেম নেই, সেখানে শুধু স্মৃতির ধানসিঁড়ি,
ভাঙা নৌকা হয়ে আমি ভেসে চলেছি—
কেবল সেই চেনা তটের সন্ধানে,
যেখানে তুমি একদিন হাত ছুঁয়ে বলেছিলে,
“বৃষ্টিতে হাত ছুঁইয়ে দিলে মনে থাকে, শুষ্ক দিনে তার মর্ম বোঝা যায় না।”
তুমি নেই।
বৃষ্টি আছে।
আমি আছি।
এই তিনজন মিলে আজ এক অদ্ভুত, অপূর্ণ একটি গল্প হয়ে রইলাম।
আর কোথাও একবারও যদি বৃষ্টি পড়ে—
জানো, সেখানে আমি আছি। তোমার আশায়, তোমার স্মরণে,
একজন ব্যর্থ প্রেমিক হয়ে।
সমাপ্ত
