474 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

নিশীর চোখে আলো : পর্ব – ২

এই প্রথম হাসানের মনে নাড়া দিলো নিশী নামের সেই মেয়েটি , যাকে তার বন্ধুর জন্য বাছাই করা হয়েছে।

মুখলেস সাহেবের জীবনে দুইজন নারী। একজন তার স্ত্রী, যিনি আকাশের মতো বিশাল হৃদয়ের অধিকারী। তিনি শুধু মুখলেসকেই ভালবাসেননি, তার পরিবার, তার অতীত এমনকি তার প্রেমিকাকে ও ভালবেসেছেন,
  • 46
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    46
    Shares

কনে দেখার এমন আনুষ্ঠানিকতা হাসান এর আগে কখনো দেখেনি। খাবারের এতো আয়োজন, কতো রকমারি পিঠা। জহিরদের বাড়ি থেকে ৭ জন মানুষ, হাসান সহ মোট ৮ জন । আর নিশীদের আশেপাশের বাড়ির মুরুব্বিদের মিলিয়ে প্রায় ৩০ জন মানুষের এক বিশাল কারখানা।এতো মানুষের ভীড়ে হাসানের খুব অস্বস্তি হচ্ছিল।  জহিরের এক চাচী, দুই চাচাতো বোন, জহিরের এক বোন, ভাই এবং ভাবি এসেছে, মেয়ে দেখতে। প্রায় ১৫ বছর পর হাসানের এদের সাথে দেখা। বানিয়াচং এ হাসানের এক ফুফু ছিল। তবে তিনি হাসানের আপন ফুফু ছিলেন না। হাসানের দাদার পালিত কন্য ছিলেন। হাসানের ফুফুর নাম সাজু। হাসানের দাদার একমাত্র ছেলে হাসানের বাবা। যদিও হাসানের গ্রামের বাড়ি বানিয়াচং নয়,। হাসানের দাদার বাড়ি, বানিয়াচং এর পাশ্ববর্তী একটি গ্রামে। তবে এই বানিয়াচং গ্রামে হাসানের দাদা মুখলেস সাহেবের কিছু প্রিয় মুখ ছিল। মুখলেশ সাহেবের একজন সহপাঠী ছিলেন আসিয়া খাতুন। এই আসিয়া খাতুনকে ঘিরেই হাসানের দাদার সমস্ত স্বপ্ন, ভালবাসা, ত্যাগ, বিচ্ছেদ, কষ্ট সবকিছু । আসিয়ার বাড়ি ছিল বানিয়াচং। বানিয়াচং হাইস্কুলে দুজন একসাথে পড়াশোনা করতো। হাসানের দাদা দরিদ্র পরিবারের ছেলে ছিল। আসিয়াকে ঘিরে এক সময় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি। আসিয়া ও মনের সবটুকু উজার করে ভালবাসতো মুখলেস সাহেবকে৷ কিন্তু আসিয়ার বাবা এত গরিব ছেলের সাথে মেয়েকে বিয়ে দিবেন না। আর আসিয়ার এতো সাহস ছিল না যে পরিবার এবং সমাজের সীমা অতিক্রম  করে মুখলেস সাহেবের কাছে চলে যাবেন। এদিকে মুখলেস সাহেবের বাবার ছিলেন হার্টের সমস্যা। মরনাপন্ন অবস্থা। মুখলেস পরিবারের বড় ছেলে। মা এবং ছোট ভাইদের জন্য, তিনি ছিলেন গার্ডিয়ান। মুখলেসের বাবার একজন খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, সাত্তার হোসেন। সেই বন্ধুর ছিল এক সুন্দরী, গুনবতি কন্যা।মুখলেসের বাবার শেষ ইচ্ছে, সেই মেয়ের সাথে মুখলেসের বিয়ে হউক।

মুখলেস সাহেবের জীবনের সবচেয়ে টানাপোড়নের দিন ছিল তখন। একদিকে আসিয়ার বাবার  চরম আপত্তি, আসিয়াকে কোনো ভাবেই মুখলেসের কাছে বিয়ে দিবে না। অন্যদিকে,  বড় ছেলে হওয়ার পারিবারিক দায়িত্ব।  সবশেষে, বাবার শেষ ইচ্ছেটুকু রাখতে গিয়ে মোখলেস বিয়ে করে নিলো, তার বাবার বন্ধু সাত্তার সাহেবের কন্যা নাজুয়া জাহানকে।

কিন্ত আসিয়া, তার পরিবারের হাজার পিড়াপীড়ির পরেও বিয়ে করেনি। আজ অবদি একাকিত্বের জীবনযাপন করছেন৷

আসিয়া আর নিশীদের বাড়ি কাছাকাছি। নিশীকে সে খুব ভালবাসে। নিশীও আসিয়াকে নিজের খুব আপনজন, আত্মার আত্মীয় ভাবে। একজন আরেকজনের সাথে সব কথা ভাগাভাগি করে।যদিও তাদের বয়সের ব্যবধান দাদী নাতনির। আসিয়া একটি মেয়েকে দত্তক নেয়, মেয়েটির নাম সাজু৷ মোখলেস সেই মেয়েটির বাবার দায়িত্ব নেয়, যদিও মোখলেসের বিয়ের পর এই মেয়েটির সাথে এবং আসিয়ার সাথে তার সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে ছয় বার দেখা হয়েছে। মোখলেসের স্ত্রী, নাজুয়া সব কিছই জানেন। মোখলেস তার কাছে কিছুই লুকায়নি। নাজুয়া নিজেও সাজুকে নিজের মেয়ে মানে। সাজুকে বানিয়াচং গ্রামেই বিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাজুর এক বছর বয়সে তাকে দত্তক নিয়েছিল, আসিয়া। সাজুর মা বাবা কেউ ছিল না। সেই তখন থেকে মুখলেস  সাহেব, সাজুকে মেয়ের মতো ভালবেসেছে। তার বেড়ে উঠা প্রতিটি মুহূর্তকে মনে মনে ধারন করেছে। বিয়ের তিনবছর পর নাজুয়াএক পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়।

তবে, মুখলেস কারো প্রতি  দায়িত্বের তিল পরিমাণ অবহেলা করেনি।  কিন্তু আসিয়া এবং তার পালিত কন্যার জন্য মুখলেসের দরদ একটু বেশি ছিল। কারন আসিয়া ছিল একা, যদিও আসিয়ার বাবার অঢেল সম্পদের একমাত্র উত্তরাধিকার শুধু আসিয়া। অন্যদিকে নাজুয়ার বাবার ও বিশাল সম্পদের একমাত্র উত্তরাধিকার নাজুয়া। তাই হাসানের দাদা মুখলেস সাহেব বিশাল বড় ব্যবসায়ী হয়ে উঠেন৷ বিশাল গ্রুপ অব কোম্পানির একক মালিক হয়ে উঠেন।

মুখলেস সাহেবের জীবনে দুইজন নারী। একজন তার স্ত্রী, যিনি আকাশের মতো বিশাল হৃদয়ের অধিকারী। তিনি শুধু মুখলেসকেই ভালবাসেননি, তার পরিবার, তার অতীত এমনকি তার প্রেমিকাকে ও ভালবেসেছেন,

আরেকজন আসিয়া, যিনি তার জীবন যৌবন, ভালবাসা, সম্পদ সব কিছু বিসর্জন দিয়েছেন, শুধুমাত্র মুখলেসের স্মৃতিগুলো নিয়ে থাকবে বলে, আর বিনিময়ে সারাজীবনের জন্য চোখের কোণে জমা রেখে দিলো এক ফোটা জল। দুজন নারীর অকৃত্রিম ভালবাসায় ভরপুর হয়েও, মুখলেস কখনো, এক মুহূর্তের জন্য নিজের হৃদয়কে কষ্টের লেলিহান থেকে  মুক্ত করতে পারেনি। যতোটা জ্বলেছে, আসিয়া, তার চেয়ে বেশি পুড়ে ছারখার হয়েছে মুখলেস।

মুখলেসের একটা সুখী পরিবারের কথা ভেবে আসিয়া কিছুটা সুখ পেতো। কিন্তু আসিয়ার নিঃসংগ জীবনের কথা ভেবে, মুখলেস সারাজীবন নিরবে কেদেছে।

এই বানিয়াচং গ্রামকে ঘিরেই মুখলেসের জীবনের সকল স্মৃতি। আর আজ এই গ্রামে তার নাতি হাসান, বন্ধুর জন্য মেয়ে দেখতে গেলো। আর না জেনে জীবনে এই প্রথম এমন একজন মেয়ে তার হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে, যাকে তার বন্ধু জহিরের জন্য বাছাই করা হয়েছে।

  • 46
    Shares