722 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

নিশীর চোখে আলো : রাবেয়া জাহান

এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বড় গ্রাম। গ্রামের মানুষগুলো খুব অমায়িক। বহদিন পর ঢাকার বাইরে যাওয়া হচ্ছে হাসানের। কাজের বাইরে কখনো সুযোগই হয়ে উঠে না বাইরে যাওয়ার।গ্রামের রকমারি দৃশ্যাবলী, একের পর এক হাসানকে শুধু মুগ্ধই করছে। গ্রামের বিশুদ্ধ, সতেজ হাওয়ায় হাসানের দেহ মন আনন্দে শিহরিয়ে উঠছে। তার মনের এই মুহূর্তের দাবি, সমস্ত কাজ কার্মকে ছুটি দিয়ে এই গ্রামে একটা ঘর বানিয়ে,আজীবনের জন্য এখানেই থেকে যেতে। এখানকার মেয়েদের হাতে স্মার্ট ফোন নেই, কেউ জিন্স আর টি- শার্ট পরেনা ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সেদিন ছিল রবিবার। কাজে যাবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো  হাসান , তখনি ফোন আসল, জহিরের।

জহিরঃ ( টেলিফোন) হাসান, তুই কোথায়?

হাসানঃ আমি বাসায়, অফিসে যাবো, এখন।

জহিরঃ দোস্ত তুর তো নিজের প্রতিষ্ঠান ।  একদিন না গেলে কিছু হবে না। তুই জলদি বানিয়াচং চলে আয়।

হাসানঃ কি বলিস। কথা নেই, বার্তা নেই। এই মুহুর্তে বানিয়াচং! কাল আসি না হয়।

জহিরঃ তুই কাল আসতে আসতে আমি তো ফাসির কাষ্ঠে ঝুলে যাব।

হাসানঃ কি বলিস! তুর নামে কোনো মামলা হয়েছে নাকি?

জহির ঃ মামলা নয় দোস্ত, মামলার চেয়ে ভয়ানক কিছু।আজ প্রথম বার মেয়ে দেখতে যাব। বাড়িতে বিয়ে করার জন্য খুব চাপ দিচ্ছে ।

কিন্তু এই বিষয়টা আমার জন্য যে কি সাংঘাতিক, টেনশানে আমার পা চলছে না।মেয়ের সামনে কেমন করে যাব? তুই আসলে যদি একটু বল পাই,

হাসানঃ এখন তো ৯ টা বাজে।

জহিরঃ তাইতো বলছি, এখনই রওয়ানা দিয়ে দে। বিকেল পাচঁটাই মেয়ের বাড়ি যাব। দেখ বন্ধ তুই আমার একমাত্র ভরসা। তোর প্রাইভেট কারেই চলে আই, তুই আসলেই আমি যাবো, নয়তো আজীবন বিয়েই করবো না।

হাসানঃ আচ্ছা আচ্ছা, তোকে আর ব্রহ্মচারী হয়ে থাকতে হবে না। কিন্তু বন্ধু আমার একটা শর্ত আছে,

জহির  ঃ মেয়ে দেখবো আমার জন্য, আর শর্ত রাখবি তুই, সে কেমন কথা?

আচ্ছা সমস্যা নাই, তোর সব শর্ত মাথায় করে নিলাম। আমার একমাত্র ভরসার জায়গাটাতো তুই।

হাসান ঃ ভেবে বলিস কিন্তু,

জহিরঃ আরি, ভেবেই বলছি। তুই বল, তুর শর্ত।

হাসানঃ মেয়ে দেখে যদি আমার ভাল লেগে যাই, তাহলে কিন্তু আমি বিয়ে করে ফেলবো।

( আগেই কিন্তু বলেছিলাম, ভেবে বলিস)

জহিরঃ হা !!!!   আচ্ছা সমস্যা নাই৷ তোর মতো বন্ধুর জন্য এক মেয়ে নয়, হাজার মেয়ে কোরবান।

হাসানঃ আহ, বন্ধু আমার, তুই আমায় এতো ভালবাসিস!!!

জহিরঃ তুই কি প্রমাণ চাস বল?

হাসান ঃ থাক, থাক। আর কোনো প্রমাণ লাগবে না।

জহিরঃ বন্ধু আমার, এতো বিশাল কারখানার এমডি তুই, এতো এতো কর্মী পরিচালনা করছিস, প্রতি মাসেই বিদেশ যাচ্ছিস, অথচ নিজের জন্য একখানা মনের মানুষ পেলি না।

হাসানঃ মানুষতো কতই আছে।  কিন্ত আমার মন ছুঁয়ে যায়, এমন কাউকে তো পেলাম না আজ অবদি। জানি বাবা অনেক কষ্ট পাচ্ছেন। শহরের এমন কোনো শিল্পপতি নেই, যাদের  মেয়ের ছবি বাবা আমায় দেখায়নি। কিন্তু আমি কি করবো দোস্ত, এদের কাউকে আমার ভাল লাগে না।

জহিরঃ কি বলিস! এদের একজনও সুন্দরী নয়, তাহলে ধনীরা কি সুন্দরী হয় না??

হাসানঃ আরে না রে। আমি তো সুন্দরী চাচ্ছি না। আমি এমন একটা মেয়েকে নিজের স্ত্রী হিসেবে চাই, যার চোখে অসম্ভব মায়া। যার কথায়, তার সরলতা প্রকাশ পায়। যাকে দেখলে হৃদয়ে শিহরন সৃষ্টি হয়।

জহিরঃ তোর এই কাব্যিক ভাষা আমার বুঝা সম্ভব নয়। মেয়ে দেখার আগে মাথাটা আর এলোমেলো করতে চাচ্ছি না। তুই জলদি রওয়ানা দিয়ে দে।

হাসানঃ আচ্ছা, ঠিক আছে। বুঝতে পারছি, তোর আর সইছে না। আমি এক্ষুনি রওয়ানা হচ্ছি

জহিরঃ শুন দোস্ত, যদি তুর আসতে পাচঁটা বেজে যায়, তাহলে তুই নিশীদের বাড়িতে চলে আসিস,

আমি তোকে তাদের বাড়ির ঠিকানা এস এম এস করে দিচ্ছি।

হাসানঃ নিশী  কে ???

জহিরঃ আরি, ওর নাম, যাকে দেখতে যাবো।

হাসানঃ তাতো আমি বুঝেছি, কিন্তু তুই এমন ভাবে বলছিস, যেনো নিশী নামের এই কন্যাটিকে আমি অনেক আগে থেকেই চিনি।

আচ্ছা, অনেক কথা হলো। এবার রওয়ানা দেই।

হাসান মনে মনে ভাবছে জহিরের জন্য মেয়ে দেখতে যাবো, কিন্তু আমার কেনো এতো আনন্দ লাগছে। একটা অদ্ভুত শিহরণ,

যাক, এতো বেশি ভেবে লাভ নেই। আমার রওয়ানা হওয়া দরকার।

কি ভাব আসলো হাসানের মাঝে, সে ড্রাইভার কে বিদায় দিয়ে নিজেই ড্রাইভ করতে উদ্যত হলো।

দুপুর ১২ টাই রওয়ানা হলো, কিছু পেপার সাইন করার ছিল, সেইসব কাজগুলো সম্পূর্ণ করে নিলো। রওয়ানা হলো বানিয়াচং এর উদ্দেশ্যে।

এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বড় গ্রাম। গ্রামের মানুষগুলো খুব অমায়িক। বহদিন পর ঢাকার বাইরে যাওয়া হচ্ছে হাসানের। কাজের বাইরে কখনো সুযোগই হয়ে উঠে না বাইরে যাওয়ার।গ্রামের রকমারি দৃশ্যাবলী, একের পর এক হাসানকে শুধু মুগ্ধই করছে। গ্রামের বিশুদ্ধ, সতেজ হাওয়ায় হাসানের দেহ মন আনন্দে শিহরিয়ে উঠছে। তার মনের এই মুহূর্তের দাবি, সমস্ত কাজ কার্মকে ছুটি দিয়ে এই গ্রামে একটা ঘর বানিয়ে,আজীবনের জন্য এখানেই থেকে যেতে। এখানকার মেয়েদের হাতে স্মার্ট ফোন নেই, কেউ জিন্স আর টি- শার্ট পরেনা ।

এখানকার মেয়েদের দেখে মনে হচ্ছে তারা খুব পরিশ্রমী। মেয়েদের মাঝে কেউ ঝাড়ু দিচ্ছে, কেউ রান্না করছে, কেউ পুকুরে গান গাইছে, আর কাপড় ধৌত করছে, আবার কেউ বা বই পড়ছে। এদের সবাইকে দেখে মনে হচ্ছে, তারা হাসানের অনেক ঘনিষ্ঠজন।

হঠাৎ করেই  হাসানের গাড়ির টায়ার পাংচার হয়ে গেলো। ফোনেও নেটওয়ার্ক নেই। হাসানের ইচ্ছে ছিল, জহিরকে সাথে নিয়ে সে নিশীদের বাড়িতে যাবে। কিন্তু জহির হাসানকে নিশীদের বাড়ির ঠিকানা দিয়েছে, তার নিজের বাড়ির ঠিকানা বলে নাই। শৈশবে একবার এসেছিল, হাসান  জহিরদের বাড়িতে। কিন্তু এখনতো তার মনে নেই কিছু।

কি আর করার, হাসান নিশীদের বাড়িতেই গেলো। নিশীর বাড়ির মানুষদের ব্যস্ততা দেখে মনে হচ্ছে আজ বিয়ে বাড়ি। বাড়িটা হাসানের অনেক পছন্দ হয়েছে, খোলা মাঠ, চার পাশে জমি, সরিষা ক্ষেত। সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে নারিকেল গাছ। হাসান যে ছেলে পক্ষের কেউ হবে, এ কথা  বুঝতে তাদের আর  বাকি রইলো না। একজন মুরুব্বি রান্না ঘর থেকে এসে নিজের পরিচয় দিলো, সে নিশীর মা। হাসান সালাম দিলো। তিনি খুব আন্তরিক সম্ভাষণে হাসানকে বসার ঘরে নিতে চাচ্ছে, কিন্তু হাসান এবার কিছুটা লজ্জিত হচ্ছে।

ঘরে না বসে বরং আপনাদের পুকুরটা দেখে আসি, এতো বিশাল আকারের পুকুর সচারাচর দেখা যায় না,  একথা বলে হাসান পুকুরের দিকে রওয়ানা হলো। এক ঝাঁক ছোট ছেলে মেয়ে হাসানের পিছু নিয়েছে। হাসানের ভালই লাগছে। মনে হচ্ছে কিছু চকোলেট থাকলে বেশ হতো। বাচ্চাগুলো খুব খুশি হতো। বাচ্চাগুলোর মধ্যে দু একজন ফিস ফিস করে বলছে, ” এইডা মনে হয় নিশী আফার জামাই”। হাসান আবারো কিছুটা বিব্রত হলো, এবং না শুনার ভান ধরে, পুকুর ঘাটে গিয়ে বসলো। একটু দূর একটা জাম গাছের নিচে একটা মেয়ে ঠিক জাম কালারের একটা পোশাক পরে, খোলা চুলে, মোটা একখানা বই হাতে বসে আছে।

হঠাৎ করে এক উত্তাল হাওয়ায় মেয়েটার চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে, এবার মেয়েটা চট করে  কি চমৎকারভাবে এক প্যাচে খোপা করে নিলো। খোপা করার পর মেয়েটার চেহারাটা কিছুটা দেখা যাচ্ছে। এতো কোমল, এতো স্নিগ্ধ আর এতো জ্যোতির্ময় চেহারা, হাসান এর আগে কখনো দেখেনি।

এবার কোনোভাবেই তার পাশে না গিয়ে থাকতে পারলো না হাসান। এই প্রথম হাসান নিজ থেকে কোনো মেয়ের কাছে যেতে চাচ্ছে।

ইউনিভার্সিটি থেকে শুরু করে আজ অবদি অসংখ্য মেয়ে, হাসানকে মন দিয়েছে। কেউ কেউ হাসানের জন্য চরম উন্মাদনা প্রকাশ করেছে,

কিন্তু কাউকে হাসানের মনে ধরেনি। অথচ, আজ কেমন করে বিনা মেঘে বৃষ্টি নেমে গেলো।

হাসানের তিল তিল করে জমিয়ে রাখা ভাবনাগুলো, মনে হচ্ছিল, হুবহু মিলে যাচ্ছিল। আর কিছু না ভেবে মেয়েটার পাশে দাড়িয়ে বললো, কার লিখা বই পড়ছেন। মেয়েটি তো হতবাক, কে এই ছেলে?? এতো সুদর্শন, এতো সুন্দর হাসি। কোথা থেকে এলো?  কিন্তই কিছুই বলতে পারছে না সে।

পরে হাসান  মেয়েটির হাতে বইয়ের দিকে তাকিয়ে  বললো, ও আপনি সমরেশ মজুমদারের বই পড়ছেন? আমারো খুব প্রিয় লেখক। কিছু মনে না করলে আমি কি আপনার নাম টা জানতে পারি?

নিশী, আমি নিশী, খুব অস্ফুট স্বরে মেয়েটি বললো। হাসান মনে মনে ভাবতে লাগলো , তবে,জহিরের জন্য কি এই মেয়েটিকে …. এক নিমিষেই হাসানের আকাশটা অন্ধকার হয়ে গেলো…………চলবে