278 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

পরীমনি যখন বিজ্ঞ আদালতের সামনে

  • 6
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    6
    Shares
নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর :  আদালতে একজন নারীকে হাজির করা হলো। বিজ্ঞ আদালত তাকালেন, তাকিয়েই আছেন। আর সরকার পক্ষ উপস্থাপনা করতে বিজ্ঞ আদালতের সম্মতির জন্য অপেক্ষা করছেন।
বিজ্ঞ আদালত টেলিভিশনে মেয়েটির গ্রেফতার হওয়ার খবর ক’দিন যাবত বারবার প্রচারিত হতে দেখেছেন। বলা যায় দেখে দেখে বিরক্ত হয়েছেন। দেশ বিদেশে এত কিছু ঘটন অঘটন ঘটছে সেগুলোর গুরুত্ব না দিয়ে একটি মেয়ে নিয়ে মেতে আছে মিডিয়া।
বিজ্ঞ আদালতের মনে হয়, নিজের চিন্তায় আসা শব্দগুলো বুঝি সঠিক হয় নি। তিনি ভাবেন, কেবল আদেশ লেখা নয়, বিচারিক ভাবনার ক্ষেত্রেও শব্দ চয়নে আরও মনোযোগী হতে হবে। কিন্তু এখন যুৎসই শব্দ তিনি এখন খুঁজে পাচ্ছেন না। ইদানীং বাজে শব্দও কেমন করে মস্তিষ্কে ঢুকে পড়ে। তার মনে হয়, সমকালীন সমাজ শব্দ তৈরি করে। বিশেষ করে মিডিয়া।
বিজ্ঞ আদালত মেয়েটার দিকে তাকান। একটা অসহায় মুখ তার চোখের সামনে কাতর চোখ মেলে কৃপা প্রার্থনা করছে। তার মেয়েটা ওর চাইতে আরো কিছুটা বয়সে ছোটো হলেও নিজের মেয়ের মুখের সঙ্গে কোথাও যেন একটা মিল দেখতে পাচ্ছেন। নিজের মেয়েটাও কবছরের মধ্যেই এমন বয়সে পৌঁছাবে। অনবরত কদিন ধরে মিডিয়া মেয়েটিকে দেখিয়েই যাচ্ছে। এই প্রদর্শনীর কারণ সে একজন নায়িকা। নায়িকা সে তো সিনেমায়, মিডিয়া বা আদালতে নয়। আদালতেও ক্যামেরা নিয়ে আসতে চেয়েছিল। তিনি অনুমতি দেন নি। বিজ্ঞ আদালতও বিস্মিত হন যখন দেখেন একজন নায়িকা যে একজন ব্যক্তি, একজন নারী সেটা মিডিয়া ভাবেই না! কিন্তু মিডিয়াকে সামলাতে পারে এ দেশে এমন কেউ নেই। মিডিয়াকে স্টেটের সঙ্গে তুলনা করা হয়!
পরীমনির খবরটা বিজ্ঞ বিচারক হয়তো দেখতেনই না। সচরাচর টেলিভিশন দেখেন না। মেয়েও দেখে না। সে ল্যাপটপ আর মোবাইল দেখে। তার স্ত্রী টিভি দেখেন। তিনিই তাকে দেখার জন্য টিভির সামনে নিয়ে গিয়েছিলেন। টেলিভিশনের পর্দায় অনেকটা কাণ্ডজ্ঞানহীন এলাহি কাণ্ড। মাথায় কালো রুমাল আর চোখ কালো চশমায় ঢাকা র্যাবের সদস্যরা বাড়িটা ঘিরে আছে। তাদের ঘিরে আছে অসংখ্য ক্যামেরা। ধারভাষ্য হচ্ছে। ভাষ্যকারের মুখ থেকে ফেনায়িত উত্তেজনা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। মেয়েটার মুখ যথা সম্ভব কাছে টেনে দেখানোর চেষ্টা চলছে। সম্ভব হলে ওকে বুঝি ঘর থেকে বের করে এনে দর্শকের চোখের সামনে এনে হাজির করে। বিজ্ঞ হাকিম ভাবছেন, অপরাধ একটা মেয়ে হয়তো করে থাকতে পারে। কী অপরাধ, সেটা কতখানি গর্হিত তা আদালতে বিচার্য। এর আগেই এমন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আর গণমাধ্যম তাকে নাস্তানাবুদ করবে? বিজ্ঞ হাকিম তার স্ত্রীর মুখের দিকে তাকান। তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছেন। কিছু বলছেন না। তিনি বিরক্ত কিনা বোঝা যাচ্ছে না। বিচারকের স্ত্রী হলেও আইন প্রয়োগ বা বিচার নিয়ে কখনো তিনি মন্তব্য করেন না। সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্রী ছিলেন। তবু বিচারকের বউ হবার পর সমাজের অসঙ্গতি নিয়েও কোনো কথা বলেন না। আগে বইটই পড়তেন। ইদানীং তাও পড়েন মনে হয় না। মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। আর ফেইসবুকে। আজকাল মেয়েও তার কাছে থাকা পছন্দ করে না। সে একা থাকতে পছন্দ করে। ফলে সমাজ বিজ্ঞানের পাঠ তার কোনো কাজে লাগে না। বরং তিনি গার্হস্থ বিদ্যায় পড়ালেখা করলেই যেন ভালো ছিল। রান্নাঘরের কাজ সেরে টিভি দেখেন। ভারতীয় সিরিয়াল দেখেন। আজ কেন খবর দেখছেন হাকিম সাহেব বুঝতে পারেন নি। স্ত্রী তাকে ডেকে আনায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও পরীমনি সম্পর্কিত তাৎক্ষণিক খবর তিনি দেখেন।
মেয়েটার বাসা অনেক পুলিশ আর র্যাব সদস্য ঘিরে আছে। হলি আর্টিজান ঘিরে রাখার ঘটনা মনে করিয়ে দেয়। তবে মেয়েটা মোবাইলে ওর বাসা ঘিরে রাখা র্যাব আর পুলিশের ফটো ধারণ করে তাকে আইনগত সহায়তা করার জন্য আবেদন জানাচ্ছে।
বিচারক ভেবেছিলেন, অত পুলিশ আর র্যাব যখন তল্লাশি করতে গেছে তাহলে কোনো সাধারণ অপরাধের অভিযোগ হবে না। মেয়েটার মুখটা চেনা মনে হয়েছিল। কোথাও যেন দেখে থাকবেন। তার স্ত্রী চিনিয়ে দিতে বলেছিলেন, নায়িকা পরীমনি।
নামটা বিজ্ঞ হাকিমের মনে পড়েছিল। বোটক্লাবের ঘটনার পর থেকে যারা পরীমনির অভিনয় দেখে নি তারাও তার নাম জানে। তিনিও জানেন। মিডিয়া এর পর থেকে পরীমনিকে ঘিরে ছিল কিছুদিন। ছাড়া যেন আর কাউকে দেখে না। তার চাইতে ভি আই পি যেন আর নেই। সে সাহস করে বোটক্লাবের এক কর্ণধারের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করেছিল। কোন নায়কের সাথে অভিনয় করতে হয় সেটা জানে কিনা বিচারক জানেন না, তবে পরীমনি জানত না কার বিরুদ্ধে মামলা করে জেতা যায়। এই না জানা না বোঝার খেসারত তাকে দিতে হচ্ছে। কিন্তু মিডিয়া জেনেছিল। তাই হঠাৎ নীরব হয়ে গিয়েছিল। তারপর পরীমনির নতুন গল্প বের করতে, কেউ কেউ গল্প রচনাও করতে লেগে গেল। কিছুদিন এটা চলতে থাকল।
বোটক্লাব বিচারক চিনতেন না। চেনার কথাও নয়। তিনি তো নাবিক নন, বিচারক। পরীমনির মামলার পর টিভি ফুটেজ আর পত্রিকা দেখে বোটক্লাব সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন। তার ধারণা হয়েছিল বোটক্লাব নাবিকদের একটা বিনোদনের ঘর। জাহাজীরা জাহাজ নোঙর করে এ ঘরে বসে একটু মদটদ খায় আর কি! পানি নেই, এমন কি ডিঙ নৌকাও ভাসে না এমন একটা ছোট নদীর তীরে বোটক্লাব! মিডিয়ার সুবাদে দেখেছেন একটা বিশাল বেঢপ আকারের কালো ঘর। কোনো নান্দনিক রুচির প্রকাশ নেই। ভেতরে কী আছে, কী কী হত বাইরে থেকে জানার সুযোগ নেই। সামনে নদীর খানিকটা বালিতে ভরাট করে বিশাল চত্বর গড়ে তোলা হয়েছে যেখানে অসংখ্য গাড়ি রাখা থাকে। পত্রিকার ফটোতে দেখা গেছে অগুনতি দামি গাড়ি রাতের অন্ধকারে জড়ো হয়। বোটক্লাবে কারা যায়, কেন যায় জানা যায় না। কেবল সদস্যরাই যায়। আর ঢুকতে পারে সদস্যদের সুপারিশ যারা নিতে পারে। কারা সদস্য বোটক্লাব ঘটনার পরই কেবল সাধারণ মানুষ জানতে পেরেছিল। জনগণের নিরাপত্তার দায়িত্বশীল সর্বোচ্চ পদের ব্যক্তি এর প্রেসিডেন্ট। এ তথ্য হয়তো জানা যেত না যদি না পরীমনি ঘটনার রাতে সরাসরি তার নাম না উচ্চারণ করতেন। পরীমনি তাঁর সহযোগিতা চেয়েছিলেন। পেয়েছিলেন। যে ব্যক্তি তার সাথে দুর্ব্যবহার করেছিলেন বলে তিনি অভিযোগ করেছিলেন সেই ব্যক্তি আস্ফালন করে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেও গ্রেফতার এড়াতে পারেন নি। এতে পরীমনির যে ক্ষমতার উচ্চপর্যায়ে সম্পর্ক আছে সেটা বোঝা যায়। কিন্তু অচিরেই মানুষ দেখতে পেয়েছিল ক্ষমতা ক্ষমতাবানকেই রক্ষা করতে এগিয়ে আসে। পরীমনির ক্ষমতা ব্যক্তিগত, সেটা সীমিত। কিন্তু যার বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ করেছেন তার ক্ষমতা বহুমাত্রিক, তাই অসীমও বলা যায়। পরীমনি সেটা জানতেন না। তাই তার অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন নি। বরং এখন তাকেই মক্ষীরানি বানিয়ে ফেলার চেষ্টা চলছে। তার ফ্লাটে মদের বোতল আর মাদক পাওয়া গেছে। আরও কোনো অপরাধে জড়িত কিনা তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। পরীমনির কাছে পুরুষরা আসেন তার সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে যেমন ফুলের কাছে বিশাল কালো ভোমর আসে। পরীমনি আহ্লাদিত হয়ে কালো ভোমরদের বিনোদিত করতেন বলে সর্বশেষ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে।
বিজ্ঞ আদালতের মনে হচ্ছে বোটক্লাবে যাওয়াটাই পরীমনির ভুল হয়েছিল। ফুল ভোমরার কাছে যেতে পারে না, গেলে আর জীবন বাঁচে না। বোটক্লাবে যাওয়াটা যে বৃন্তচ্যুত ফুলের মতো ভোমরার কাছে যাওয়ার মতো ছিল তিনি বুঝতে পারেন নি। তিনি বৃন্তচ্যুত ফুল হয়ে গেছেন। তার জীবন বাঁচানো দায় হয়ে পড়েছে।
এখন আদালতের সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে তিনি নায়িকা পরীমনি নন, অভিনেত্রী নন, পরী নন, তার মাথায় মনিও নেই, তিনি মানবী, যে কোনো একজন নারী মাত্র। তবু তার চারপাশে কালো ভোমরা পাখা মেলে উড়ছে তার শরীরে বিষাক্ত হুল ফুটাবে বলে।
  • 6
    Shares