তিতাস নদীর তীরে বসে বিজয়নগরের মানুষ যখন তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর ঐক্যের গল্প বুনছিল, তখনই নির্বাচন কমিশনের একটি খসড়া প্রস্তাব এসে তাদের হৃদয়ে ছুরি চালিয়েছে। বিজয়নগর উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন—বুধন্তী, চান্দুরা, আর হরষপুর—ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসন থেকে ছিন্ন করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব এমন এক আঘাত, যা শুধু ভৌগোলিক সীমানা নয়, বিজয়নগরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আর রাজনৈতিক ঐক্যের মূলে কুঠারাঘাত করেছে। এই প্রস্তাবে প্রায় ৯৬,০০০ ভোটারের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছে, যারা উপজেলার মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক। স্থানীয়রা এই সিদ্ধান্তকে কেবল অযৌক্তিক নয়, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের এক কালো অধ্যায় হিসেবে দেখছে। তাদের কণ্ঠে ক্ষোভ, রক্তে আগুন, আর হৃদয়ে একটাই দাবি—বিজয়নগরের ঐক্য অটুট রাখো, আমাদের পরিচয় নষ্ট করো না!
নির্বাচন কমিশন গত ৩০ জুলাই ২০২৫-এ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ৩৯টি সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাসের খসড়া তালিকা প্রকাশ করে। এই তালিকায় বিজয়নগরের তিনটি ইউনিয়নকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ থেকে বিচ্ছিন্ন করে সরাইল-আশুগঞ্জের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব আসে। কমিশনের দাবি, এই পুনর্বিন্যাস ভোটার সংখ্যার সমতা আনবে, প্রশাসনিক কার্যকারিতা বাড়াবে, আর ভৌগোলিক যুক্তি বজায় রাখবে। কিন্তু স্থানীয়রা বলছে, এ কোন যুক্তি? তিতাস নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত বিজয়নগরের ১০টি ইউনিয়ন—ইছাপুরা, চম্পকনগর, চান্দুরা, চর ইসলামপুর, পাহাড়পুর, পত্তন, বুধন্তী, বিষ্ণুপুর, সিংগারবিল, আর হরষপুর—একটি অভিন্ন ভৌগোলিক, সামাজিক, আর সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক। এই ইউনিয়নগুলোর ভাষা এক, সংস্কৃতি এক, জীবনযাত্রা এক। তিনটি ইউনিয়নকে সরাইল-আশুগঞ্জের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া মানে এই ঐক্যকে ছিন্নভিন্ন করা, বিজয়নগরের আত্মাকে খণ্ডিত করা।
এই প্রস্তাব প্রকাশের পর থেকে বিজয়নগরের রাজপথ জেগে উঠেছে। ৩১ জুলাই থেকে শুরু করে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে বিক্ষোভ, মানববন্ধন, আর প্রতিবাদ সভায় মুখরিত হয়েছে উপজেলার প্রতিটি গ্রাম-পাড়া। বিজয়নগর উপজেলা সর্বদলীয় ঐক্য পরিষদের ব্যানারে কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, নারী, যুবক—সবাই একসঙ্গে রাস্তায় নেমেছেন। তাদের হাতে প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন, আর মুখে একটাই স্লোগান—“বিজয়নগর ভাগ করা চলবে না!” তারা দাবি করছেন, তিনটি ইউনিয়নকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সঙ্গে রাখতে হবে, নয়তো বিজয়নগরকে একটি স্বতন্ত্র সংসদীয় আসন ঘোষণা করতে হবে। এই দাবির পেছনে রয়েছে তাদের ২ লক্ষাধিক ভোটারের শক্তি, যা একটি পূর্ণাঙ্গ সংসদীয় আসনের জন্য যথেষ্ট।
৩১ জুলাই দুপুরে ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনের সামনে বিজয়নগরের মানুষ প্রতীকী অনশন করে। গোলাম মোস্তফা, এ কে এম গোলাম মুফতি ওসমানী, মো. জাহিদুজ্জামান চৌধুরী, আর মো. বায়েজিদ মিয়ার নেতৃত্বে একটি স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ আতাউল্লাহ আরেকটি আবেদনে এই সিদ্ধান্তকে “অনাকাঙ্ক্ষিত, হতাশাজনক, আর বেআইনি” বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, “৯৬,০০০ ভোটারকে সরাইল-আশুগঞ্জে ঠেলে দিয়ে বিজয়নগরের রাজনৈতিক শক্তি খর্ব করা হচ্ছে। এটা কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র!”
বিজয়নগরের মানুষের ক্ষোভের মূলে রয়েছে তাদের ঐতিহ্য আর পরিচয়ের প্রশ্ন। এই উপজেলা, ২২১.১৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তন আর প্রায় ২,৫৭,২৪৭ জনসংখ্যা নিয়ে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিতাস নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত এর ১০টি ইউনিয়ন একটি অভিন্ন ভৌগোলিক ইউনিট। এই ইউনিয়নগুলোর মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, আর জীবনযাত্রা একই সুতোয় গাঁথা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা—ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক, কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়ক, আর চম্পকনগর-শিমরাইলকান্দি সড়ক—অত্যন্ত সুবিধাজনক। বিপরীতে, সরাইল ও আশুগঞ্জের সঙ্গে ভৌগোলিক দূরত্ব বেশি, যোগাযোগ ব্যবস্থা জটিল। তিনটি ইউনিয়নকে সরাইল-আশুগঞ্জের সঙ্গে যুক্ত করলে স্থানীয়রা প্রশাসনিক সেবা পেতে ছুটতে হবে অনেক দূর, সময় আর অর্থের অপচয় হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের সঙ্গে বিজয়নগরের সম্পর্ক শুধু ভৌগোলিক নয়, এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আর অর্থনৈতিক। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল, সরকারি কলেজ, আর জেলা প্রশাসনের কার্যালয় বিজয়নগরের মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্থানীয় উৎসব, মেলা, আর ধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহ্য এই অঞ্চলকে বাংলাদেশের মানচিত্রে একটি বিশেষ স্থান দিয়েছে। তিনটি ইউনিয়নকে বিচ্ছিন্ন করলে এই সাংস্কৃতিক ঐক্য ভেঙে পড়বে, মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার বীজ বপন হবে।
নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত শুধু ঐক্য নষ্ট করছে না, বিজয়নগরের উন্নয়নের পথেও কাঁটা বিছাচ্ছে। এই উপজেলা গত ৫৪ বছর ধরে প্রশাসনিক অবহেলার শিকার। স্থানীয়রা বলছেন, “আমরা পৌরসভা চাই, সরকারি কলেজ চাই, উন্নয়ন চাই। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত আমাদের আরও পিছিয়ে দেবে।” তিনটি ইউনিয়নের ৯৬,০০০ ভোটার রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়। তাদের বিচ্ছিন্ন করা মানে বিজয়নগরের রাজনৈতিক শক্তি কমানো, স্থানীয় নেতৃত্বের সম্ভাবনা মুছে দেওয়া। মোহাম্মদ আতাউল্লাহ বলেন, “এটা বিজয়নগরের উন্নয়নের স্বপ্নকে চাপা দেওয়ার ষড়যন্ত্র। আমাদের নেতৃত্ব, আমাদের সম্ভাবনা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।”
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি চলছে। ২০১৮ সালে রংপুর-৩ আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাসের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছিল, স্থানীয় জনগণের মতামত আর ভৌগোলিক ঐক্য বিবেচনা করতে হবে। মৌলভীবাজার-৪ আসনের ক্ষেত্রেও জনগণের প্রতিবাদের মুখে কমিশন সিদ্ধান্ত সংশোধন করেছিল। বিজয়নগরের মানুষ এই নজিরের ভিত্তিতে হাইকোর্টে রিট দায়েরের পরিকল্পনা করছে। তারা বলছে, “আমাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না। এটা গণতান্ত্রিক লড়াই।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী। সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, কথাসাহিত্যিক অদ্বৈত মল্ল বর্মণ, আর শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জন্মভূমি এই জেলা। বিজয়নগর তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিতাস নদীর তীরে এই উপজেলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আর ঐক্য বাংলাদেশের গর্ব। এই সীমানা পুনর্বিন্যাস শুধু তিনটি ইউনিয়নকে বিচ্ছিন্ন করছে না, এটি বিজয়নগরের আত্মাকে খণ্ডিত করছে, এর ঐতিহ্যকে মুছে দিচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন বলছে, জনগণের মতামত বিবেচনা করা হবে। কিন্তু খসড়া তালিকা প্রকাশের আগে কোনো জনসভা, কোনো আলোচনা হয়নি। স্থানীয়রা বলছে, “এটা গণতন্ত্রের পরিহাস। আমাদের মতামত ছাড়া আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে।” তারা দাবি করছে, বিজয়নগরের ১০টি ইউনিয়নকে একসঙ্গে রাখা হোক, অথবা এটিকে স্বতন্ত্র আসন ঘোষণা করা হোক। এই লড়াই শুধু বিজয়নগরের নয়, এটি গণতান্ত্রিক অধিকার, স্থানীয় ঐক্য, আর স্বায়ত্তশাসনের লড়াই।
বিজয়নগরের মানুষের কণ্ঠে এখন একটাই আওয়াজ—“আমাদের ভাগ করা চলবে না!” তাদের এই আন্দোলন শুধু রাস্তার মিছিল নয়, এটি একটি জীবন্ত বিপ্লব, যা সত্যের পক্ষে, ঐক্যের পক্ষে, আর ন্যায়ের পক্ষে। নির্বাচন কমিশনের কাছে তাদের প্রশ্ন—কেন এই ষড়যন্ত্র? কেন বিজয়নগরের হৃদয়ে ছুরি চালানো হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত, বিজয়নগরের মানুষ থামবে না। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ একটি প্রতিবাদ, প্রতিটি কণ্ঠ একটি বিপ্লব। এই লড়াই শুধু তিনটি ইউনিয়নের নয়, এটি বিজয়নগরের আত্মার লড়াই, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের লড়াই।