248 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

বিপদে ধৈর্যধারণ, ২য় পর্ব।

  • 8
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    8
    Shares

মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামঃ-

সবরের অর্থ:-

সবরের আভিধানিক অর্থ বাধা দেয়া বা বিরত রাখা। শরী‘অতের পরিভাষায় সবর বলা হয় অন্তরকে অস্থির হওয়া থেকে, জিহ্বাকে অভিযোগ করা থেকে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গাল চাপড়ানো ও বুকের কাপড় ছেঁড়া ইত্যাদি থেকে বিরত রাখা।

কারো কারো মতে, এটি হলো মানুষের অন্তরগত একটি উত্তম স্বভাব, যার মাধ্যমে সে অসুন্দর ও অনুত্তম কাজ থেকে বিরত থাকে। এটি মানুষের একটি অন্তরগত শক্তি, যা দিয়ে সে নিজকে সুস্থ ও সুরক্ষিত রাখতে পারে।

হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে সবর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “হাসি মুখে তিক্ততার ঢোক গেলা।”

হযরত যুন্নূন মিসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ থেকে দূরে থাকা; বিপদের সময় শান্ত থাকা এবং জীবনের কুরুক্ষেত্রে দারিদ্রের কষাঘাত সত্ত্বেও অমুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করা।”

কারও মতে, “সবর হলো সুন্দরভাবে বিপদ মোকাবিলা করা।” আবার কারও মতে, “বিপদকালে অভিযোগ-অনুযোগ না করে অমুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করাই সবর।”

এক বুযুর্গ এক ব্যক্তিকে অন্যের কাছে তার সমস্যা নিয়ে অনুযোগ করতে শুনে বললেন, “তুমি যখন মানুষের কাছে অভিযোগ কর, তখন মূলত দয়াময়ের বিরুদ্ধে নির্দয়ের অভিযোগ কর।”

অভিযোগ দু’টি পন্থায় করা হয়:-

একটি হলো, আল্লাহ তাআলার কাছে অনুযোগ করা। এটি সবর পরিপন্থী নয়। যেমন হযরত ইয়াকূব আলাইহিস সালাম প্রিয় পুত্র হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে হারিয়ে বলেছিলেন,

إِنَّمَا أَشْكُو بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ

“আমি আল্লাহর কাছেই আমার দুঃখ বেদনার অভিযোগ জানাচ্ছি”।

অপরটি হলো, নিজের মুখ বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ভাষার মাধ্যমে মানুষের কাছে অভিযোগ করা। এটি সবর পরিপন্থী।

সবরের প্রকারভেদ: সবর তিন প্রকারের। যথা: –

১. আল্লাহ তাআলার আদেশ-নির্দেশ পালন ও ইবাদত-বন্দেগী আদায় করতে গিয়ে ধৈর্যধারণ করা।

২. আল্লাহ তা’আলার নিষেধ ও তাঁর বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে ধৈর্যধারণ করা এবং

৩. তাকদীর ও ভাগ্যের ভালো-মন্দে অসন্তুষ্ট না হয়ে তার ওপর ধৈর্যধারণ করা।

এই তিন প্রকার সম্পর্কেই হযরত আবদুল কাদের জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তদীয় গ্রন্থ ‘ফুতুহুল গাইব’ এ বলেন, “একজন বান্দাকে অবশ্যই তিনটি বিষয়ে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে: “কিছু আদেশ পালনে, কিছু নিষেধ থেকে বিরত থাকায় এবং ফয়সালাকৃত তাকদীরের ওপর।”

একজন প্রকৃত মুমিন কিন্তু সর্বাবস্থায় দৃঢ়ভাবে এ কথা বিশ্বাস করে যে, সে যে অবস্থায় আছে, তাতে কোনো কল্যাণ নিহিত রয়েছে। যেমন মুসলিম শরীফে সুহাইব ইবন সিনান রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে,

عَجَبًا لأمرِ المؤمنِ إِنَّ أمْرَه كُلَّهُ لهُ خَيرٌ وليسَ ذلكَ لأحَدٍ إلا للمُؤْمنِ إِنْ أصَابتهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فكانتْ خَيرًا لهُ وإنْ أصَابتهُ ضَرَّاءُ صَبرَ فكانتْ خَيرًا لهُ ( صحيح مسلم গ্ধ كتاب الزهد والرقائق গ্ধ باب المؤمن أمره كله خير, رقم الحديث- ২৯৯৯ )

“মুমিনের অবস্থা কতইনা চমৎকার! তার সব অবস্থাতেই কল্যাণ বিরাজমান। এটি শুধু মুমিনেরই বৈশিষ্ট্য যে, যখন সে আনন্দে থাকে, তখন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে এবং যখন সে কষ্টে থাকে, তখন সবর করে। আর এ উভয় অবস্থাই তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।” (মুসলিম-২৯৯৯)

এ জন্যই কিন্তু হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলতেন,

لَأَنْ أُعَافَى فَأَشْكُرَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أُبْتَلَى فَأَصْبِرَ

روى الطبراني في “المعجم الأوسط” (৩১০২) ، وأبو نعيم في “الطب” (১১২) ، والعقيلي في “الضعفاء” (১/৪৫) من طريق إِبْرَاهِيم بْن الْبَرَاءِ بْنِ النَّضْرِ بْنِ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: نا شُعْبَةُ بْنُ الْحَجَّاجِ ، عَنِ الْحَكَمِ بْنِ عُتَيْبَةَ ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي لَيْلَى، عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ قَالَ: ” كُنْتُ جَالِسًا بَيْنَ يَدَيِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ يَذْكُرُ الْعَافِيَةَ ، وَمَا أَعَدَّ اللَّهُ لِصَاحِبِهَا مِنْ عَظِيمِ الثَّوَابِ إِذَا هُوَ شَكَرَ، وَيَذْكُرُ الْبَلَاءَ ، وَمَا أَعَدَّ اللَّهُ لِصَاحِبِهِ مِنْ عَظِيمِ الثَّوَابِ إِذَا هُوَ صَبَرَ، فَقُلْتُ : بِأَبِي وَأُمِّي يَا رَسُولَ اللَّهِ، لَأَنْ أُعَافَى فَأَشْكُرَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أُبْتَلَى فَأَصْبِرَ، فَقَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ( وَرَسُولُ الِلَّهِ يُحِبُّ مَعَكَ الْعَافِيَةَ ) . وقال الطبراني عقبه : ” لَمْ يَرْوِ هَذَا الْحَدِيثَ عَنْ شُعْبَةَ إِلَّا إِبْرَاهِيمُ ” .

“আমার কাছে বিপদে পড়ে সবর করার চেয়ে সুখে থেকে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করাই অধিক পছন্দনীয়।”

আল-তাবারানী: “আল-মু’আজাম আল-আওসাত” (৩১০২), আল-অকাইলি “আল-দুয়া’ফ” (১/৪৫৫) আবু নায়ীম: আত্ত্বিব: (১১২)

আমাদের মনে রাখতে হবে, মুমিনের পুরো জীবনই কিন্তু পরীক্ষা। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

وَنَبْلُوكُم بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ فِتْنَةً ۖ وَإِلَيْنَا تُرْجَعُونَ

“আর ভাল ও মন্দ দ্বারা আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করে থাকি এবং আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে” (সূরা আম্বিয়া: ৩৫)।

আল্লাহ তাআলা মুমিনকে সম্পদ-সন্তান সব কিছু দিয়েই পরীক্ষা করেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ ۚ وَاللَّهُ عِندَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ

“তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষা বিশেষ। আর আল্লাহর নিকটই মহান প্রতিদান” (সূরা তাগাবুন: ১৫)।

 

লেখক

———

সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আয্হারী

খতিব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম।

সহকারী অধ্যাপক, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

মোবাইলঃ- ০১৬১৯-১৯৭৯৭৮

  • 8
    Shares