452 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

বিবর্ণ ঈদ (আশাহতের বেদনা)

  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    9
    Shares

মোঃ জাহের আলী:  জনাব আসাদুজ্জামান খাঁন এই পলাশ পুর গ্রামেরই কৃতি সন্তান, তিন তিন বারের নির্বাচির ইউ পি চেয়ারম্যান। সৎ, যোগ্য ও জনসেবক হিসাবে পুরো জেলাতেই বেশ নাম ডাক। তিনি সারা বছর বিভিন্ন সেবা মুলক কাজের জন্য গ্রামের বাড়িতে থাকতে না পারলেও অন্ততঃ বছরের দুই ঈদে তিনি গ্রামে আসেন, বাড়িতে থেকে গ্রামবাসীর সাথেই ঈদের নামাজ পড়েন. হত দরিদ্রদের খোঁজ খবর নেয়া থেকে সমাজ সেবামুলক কাজে সাধারণ মানুষের পাশে থাকার কারণে সবাই তাকে শ্রদ্ধা-সন্মান করেন একটু বেশীই। তিনিই প্রতি বছর ঈদগাহের মাঠে, মসজি-মাদ্রাসা, কবরস্থান সহ যাবতীয় উন্নয়নমুলক কাজে মানুষের কাছ থেকে সাহায্য সহযোগীতা নিয়ে কাজকে বেগবান করতে বদ্ধ পরিকর।
আর একারণেই ঈদগাহে জামাত শুরু হওয়ার আগেই মানুষের কল্যাণে জনগণের কাছ থেকে চাঁদা বা হাদিয়া আদায়ের জন্য তিনি আবদার জানালে সবাই স্বতস্পুর্ত ভাবেই সাধ্যমত সাহায্যের হাত বাড়াতে কার্পণ্য করেনা কেউ।
গত বছরেও ঈদের মাঠে তার উদার্থ আহব্বানে সাড়া দিয়ে সবচেয়ে বেশী পরিমান সাহায্য দেয়ার জন্য যিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনিও এই গ্রামেরই আরেক কৃতি সন্তান ডাক্তার বদরুদ্দোহা সাহেব। যিনি ঢাকাতে থাকলেও প্রতি বছর পরিবার পরিজন, গ্রামবাসীকে নিয়ে ঈদ করতে বাড়িতেই চলে আসেন নাড়ীর টানে।
গ্রামবাসী দশ/বিশ টাকা বড়জোর এক/দুই শত টাকা দিলেও তিনিই ঈদগাহের মাঠের জন্য সামিয়ানা, জায়নামাজ সহ ঈদগাহে নামাজের ব্যবস্থা করতে যত টাকা লাগে সবই একাই দেয়ার ঘোষণা দেয়ায় গ্রামবাসী সবাই হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানাতে কার্পণ্য করেনি উনার বারণ সত্বেও।
ঈদগাহে নামাজের ব্যবস্থা করতে অবশ্য বেশ কিছু টাকা খরচ হয়। তা অবশ্য গ্রামের মানুষ স্বতস্পুর্ত ভাবেই সওয়াব পাওয়ার নিয়তে দান করে থাকেন।
জায়নামাজ, সামীয়ানা, মাইক ইত্যাদি ভাড়ায় প্রতি বছর নিয়ে আসলেও আগামী বছর থেকে সবকিছু ডাক্তর বদরুদ্দোহা সাহেব কিনে দেবেন যাতে প্রতি বছর আর ভাড়ায় আনতে না হয়। আর এতেই গ্রামবাসী আনন্দ একটু বেশী। তাছাড়া চেয়ারম্যান সাহেবের মনে আর একটা বাসনাও আছে যে কারণে ডাক্তার সাহেবকে একটু আলাদা নজরেই দেখেন চেয়ারম্যান সাহেব।
চেয়ারম্যান সাহেবের উচ্ছ শিক্ষিতা মেয়ে রোকেয়ার সাথে বিশ^ বিদ্যালয়ে পড়া লেখার সময় থেকেই জানা শোনা ডাক্তার বদরুদ্দোহার। যে কারণে দুইজনই প্রায় একমত।
বছর ঘুরে ঈদ আসার আগেই সারা পৃথিবী জুড়ে নেমে আসে এক বয়াবহ দুর্যোগের ঘনঘটা। করোনা ভাইরাসের মত প্রাণঘাতী মহামারীর কারণে সারা পৃথিবী হয়ে যায় স্তব্দ, নিথর খুব অল্প দিনেই। এই প্রাণঘাতী মাহামারীতে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে থাকে হাজারে হাজার মানুষ, আক্রান্ত হয় লক্ষ লক্ষ। যে কারণে প্রতি বছরের মত এবারে ঈদ আর মাঠে ময়দানে বা ঈদগাহে অনুষ্টিত হওয়ার সুযোগ থাকেনা। ঈদগাহের মাঠ সাজানো, মাইকিং ব্যবস্থা, চাঁদা কালেকশন সবই বন্ধ হয়ে যায়। তবু গ্রামের বাড়িতে গিয়ে সবার সাথে ঈদ করার বাসনা কেউ যেন মন থেকে দূর করতে পারেনা। তাই লক্ ডাউন, যান চলাচল বন্ধ থাকার পরও মানুষ যে যেভাবে পারে গ্রামের বাড়িতে পরিবার পরিজন, আত্মীয় স্বজনের সাথে ঈদ করার ইচ্ছা থাকা সত্বেও নিরুপায় হয়েই যে যেখানে আছে সেখাইে থাকতে বাধ্য হয়। তবে সরকারী নির্দেশনা অমান্য করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ বা গ্রামে গিয়েও বিরাম্বণার শেষ নেই। তাছাড়া এবছর ঈদগাহের মাঠের যাবতীয় খরচ যেমন বহণ করার কথা ছিল ডাক্তার বদরুদ্দেহা সাহেবের তেমনি ঈদের পর পরই শুভ কাজটাও সেরে নেয়ার কথা প্রায় পাকাপাকি করেই রেখেছিলেন দুই পরিবারে আলাপ অলোচনায়।
তাই অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই নিজস্ব গাড়ি নিয়ে বাড়ি চলে আসেন ডাক্তার বদরুদ্দোহা সাহেব কিন্তু তাতেও বাধ সাধলেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা বৃন্দ। তিনি বাড়ি পৌঁছার প্রায় সাথে সাথেই সারা গ্রামে ছড়িয়ে যায় তিনি আসার খবর এবং কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পুরো এলাকায়। পরদিন পুলিশ প্রশাসন দলবল নিয়ে এসে হাজির এবং সরকারী নির্দেশ মোতাবেক করোনা ভাইরাসের টেস্ট তো করাতেই হবে। তিনি একজন ডাক্তার এবং দেশের একজন সচেতন নাগরিক, তাই তাকে ঘরে থাকতে দিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে পাঠনো হয় ঢাকায় পরীক্ষার জন্য। তিনি যেহেতু ঢাকা থেকে এসেছেন এবং ঢাকা শহরেই ভাইরাসের সংক্রমণ বেশী সেই কারণে সতর্কতাও বেশী প্রয়োজন। তাছাড়া ডাক্তার সাহেব নিজেও জানেন সামাজিক দুরত্বের গুরুত্ব কতটা। দুর্ভাগ্য যেন পিছু ছাড়েনা। দুইদিন পর রিপোর্টে পজিটিভ আসার কারণে আর বাড়িতেই থাকা হয়না ডাক্তার বদরুদ্দোহা সাহেবের। চিকিৎসার জন্য প্রশাসনের নির্দিষ্ট এম্বোলেন্সেই ফিরে যেতে হয়েছে ঢাকায়। আর ফেরা হ’লনা ডাক্তার বদরুদ্দোহা সাহেবের। কোথায়, কি অবস্থায় আছেন, শারীরিক অবস্থাই বা কেমন তাও জানা গেলনা। দেখতে দেখতে চলে এলো পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদগাহে বা মাঠে ময়দানে আর কেউ ঈদের নামাজ পড়ার সুযোগ হ’লনা। পাড়ায় পাড়ায় মসজিদ গুলোতেই সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে খুশির ঈদের নামাজ নিরানন্দে আদায় করলেও কারো সাথে করমর্দন, কোলাকোলি, বাড়ি বাড়ি গিয়ে কোরমা-পোলাও, সেমাই-পায়েস তো দূরের কথা তিন ফুট দূরে থেকে মৃদু পায়ে হেটে হেটে সবাইকে যার যার বাড়িতে যাওয়া ছাড়া রাস্তায় চায়ের দোকানে বসে আড্ডা তো দূরের কথা এক কাপ চা-ও খাওয়া হয়নি কারো। দীর্ঘদিনের স্বপ্নজাল বোনা রোকেয়া বেগম ফোনে অনেক চেষ্টা করওে কোন যোগাযোগ করতে না পেরে আশাহতের বেদনায় অধীর আগ্রহ নিয়ে বেঁচে থাকা ছাড়া যে আর কিছুই রইলনা।।

  • 9
    Shares
  • 9
    Shares