ভাইরালের নেশা, নৈতিকতার পতন: এক অসুস্থ সামাজিক বাস্তবতা
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও উদ্বেগজনক সামাজিক ব্যাধিগুলোর একটি হলো—সোশ্যাল মিডিয়ার অসংযত ব্যবহার ও এর মাধ্যমে ব্যক্তি জীবনকে পণ্য করে তোলার প্রবণতা।
এক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল মানুষের ভাব বিনিময়, সৃজনশীলতা প্রকাশ এবং মত প্রকাশের মাধ্যম। কিন্তু এখন তা পরিণত হয়েছে ভিউ, লাইক আর ভাইরাল হওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার মঞ্চে।
আজকাল আমরা প্রায়ই দেখি—স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া, প্রেমিক-প্রেমিকার বিরোধ, বা পরিবারের অন্দরমহলের ঘটনাও ফেসবুক লাইভে কিংবা ইউটিউব ভিডিওর মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। কেউ কেউ আবার যৌথভাবে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, এমনকি ঘরোয়া ঝামেলাকেও রূপান্তরিত করছেন কনটেন্টে। উদ্দেশ্য একটাই—ভিউ বাড়ানো, অর্থ আয়, আর ভাইরাল হওয়া।
সম্প্রতি কুমিল্লার মুরাদনগরে এক নারীর ওপর বর্বরতা ও সেই দৃশ্যের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনা আমাদের আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, আমরা কোন সমাজে বাস করছি। সেখানে মানুষের লজ্জা, যন্ত্রণা বা নিরাপত্তা নয়—প্রাধান্য পাচ্ছে ভিডিও কনটেন্টের উপযোগিতা।
এই ভিডিও কারা দেখছে, কারা শেয়ার করছে, তা নিয়েও কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না। কেউ বলছে—‘নারী পরকীয়ায় জড়িয়েছিল’, কেউ বলছে—‘ঘরে ঢুকে ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছিল’। সত্য যাই হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট—একজন নিরস্ত্র, বিপন্ন নারীকে বিবস্ত্র করে পেটানো এবং তা ভিডিও করে ছড়িয়ে দেওয়ার মানসিকতা আমাদের সমাজে দিন দিন গা-সওয়া হয়ে যাচ্ছে।
এই মানসিকতা ভয়ংকর। এটি কেবল ব্যক্তির সম্মান বা নিরাপত্তার হুমকি নয়, বরং পুরো সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ডকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। আজ করিমের ঘটনা ভাইরাল হলে কাল রহিমের ঘটনা শেয়ার হবে। ব্যক্তিগত গোপনতা আজ খেলনা, আর মানুষ হয়ে উঠছে ‘কন্টেন্ট’।
এই প্রবণতা রুখতে হলে দরকার সামাজিক, পারিবারিক ও আইনি তিন দিক থেকে একযোগে কাজ করা।
প্রথমত, ডিজিটাল শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে হবে—কী শেয়ার করা উচিত আর কী নয়। দ্বিতীয়ত, আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যেন ভিক্টিম ব্লেমিং বা ভিডিও ছড়ানোর সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শাস্তি হয়।
তৃতীয়ত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে—যাতে ছোটবেলা থেকেই মানুষ শেখে, সম্মান ও গোপনীয়তা রক্ষা করা একটি মানবিক কর্তব্য।
আমরা যদি এই রোগের উৎসে আঘাত না করি, তবে ভবিষ্যতে কেউ কারও ওপর ভরসা করতে পারবে না। বাঙালি সংস্কৃতি, সম্পর্ক, ও মানবিক মূল্যবোধ—সব কিছুই হবে কেবল নাটকীয় প্রকাশ আর ভাইরাল কনটেন্টের উপাদান।
আমাদের মনে রাখতে হবে—সোশ্যাল মিডিয়া যেমন মানুষকে মুক্ত চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতার সুযোগ দিয়েছে, তেমনি তা হয়ে উঠেছে নৈতিক অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার পথ। আমরা যদি এখনই সজাগ না হই, আগামী প্রজন্মকে আমরা একটি মানবিকতা-বর্জিত, অসংবেদনশীল, এবং সামাজিকভাবে হিংস্র সমাজ দিয়ে যাব।
আর তখন হয়তো ভাইরাল হব আমরা সবাই—কিন্তু কেউ আর মানুষ হিসেবে মনে রাখবে না।
লেখক, গণমাধ্যমকর্মী ও সামাজিক বিশ্লেষক