লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার পথে নিখোঁজ মাদারীপুরের ১০ যুবক

লেখক: Arisha Eme
প্রকাশ: ৩ মাস আগে
লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার পথে নিখোঁজ মাদারীপুরের ১০ যুবক

উন্নত জীবনের আশায় লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ার পর মাদারীপুরের ১০ যুবকের খোঁজ মিলছে না টানা ১০ মাস ধরে। তারা বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন—সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই পরিবারের কাছে। সন্তানদের সন্ধান পেতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ ও দালাল চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

নিখোঁজ যুবকদের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রত্যেকের কাছ থেকে ২৮ থেকে ৩০ লাখ টাকা করে আদায় করেছে একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্র। অথচ সন্তানদের খোঁজ নিতে গেলেই চক্রের সদস্যরা আত্মগোপনে চলে যায়। অভিযোগ রয়েছে, মানব পাচারের অর্থেই দালালরা রাতারাতি ডুপ্লেক্স বাড়ির মালিক বনে গেছে।

নিখোঁজ যুবকেরা হলেন—মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের নয়াকান্দি এলাকার লিমন বেপারী (১৯), রবিউল মাতুব্বর (২২), দত্তেরহাট এলাকার জয় মাতুব্বর (২০) ও জীদান হোসেন হাওলাদার (১৮), মোস্তফাপুর ইউনিয়নের ওয়ালিদ হাসান অভি (১৯), পেয়ারপুর ইউনিয়নের মোহাম্মদ আলী (২২), রাজৈর উপজেলার শরিফুল ইসলাম (২৭) ও আজমুল খাঁ (৩০), মোল্লাকান্দি এলাকার তুহিন মজুমদার (২৩) এবং মাদারীপুর শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকার মাহাবুব (২১)।

স্বজনদের অভিযোগ, মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের গাজীরচর এলাকার জাহাঙ্গীর ঢালীর স্ত্রী পেয়ারার বেগমের প্রলোভনে পড়ে যুবকেরা বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রত্যেককে সরাসরি ইতালি পাঠানোর কথা বলে প্রথমে ১৫ লাখ টাকার চুক্তি করা হয়। গত বছরের জানুয়ারিতে তারা বাড়ি ছাড়ে। পরে লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে আটকে রাখা হয়।

পরিবারগুলোর দাবি, লিবিয়ায় আটকে রেখে যুবকদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। মুক্তিপণের নামে একের পর এক ধাপে পরিবারের কাছ থেকে আরও লাখ লাখ টাকা আদায় করা হয়। সবশেষ গত বছরের এপ্রিলে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে লিবিয়া হয়ে ইতালির উদ্দেশে রওনা দেওয়ার পর থেকে তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

নিখোঁজ লিমনের বাবা আনোয়ার বেপারী বলেন, “পেয়ারার বেগমের কথায় বিশ্বাস করে ছেলে বিদেশ যেতে চায়। পরে লিবিয়ায় আটকে রেখে মোট ২৮ লাখ টাকা নেওয়া হয়। ১০ মাস ধরে ছেলের কোনো খোঁজ নেই।”

জয়ের বাবা টিটু মাতুব্বর বলেন, “আমার ছেলে পেয়ারার বেগমের বাড়িতে কাজ করত। সেখান থেকেই বিদেশ যাওয়ার লোভ দেখানো হয়। লিবিয়ায় একবার মাফিয়াদের হাতে ধরা পড়লে ১২ লাখ টাকা দিয়ে ছাড়াতে হয়। এরপর থেকে আর কোনো খবর নেই।”

শরিফুলের মা রাজিয়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “ছেলে বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে—জানি না। পেয়ারার বেগম আর তার লোকজন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। আমি আমার সন্তানের সন্ধান চাই, আর দালালদের কঠিন বিচার চাই।”

অভিযোগ রয়েছে, পেয়ারার বেগমের বড় ছেলে ফারদিন ঢালী ইতালি থেকে মানব পাচারের নির্দেশনা দিতেন এবং ছোট ছেলে সৌরভ ঢালী টাকা সংগ্রহ করতেন। এই চক্রের সঙ্গে শরীয়তপুরের সবুজ কাজী ও মুজাহিদ শেখ জড়িত। তারা সম্পর্কে শ্যালক ও দুলাভাই।

স্থানীয়রা জানান, এক বছর আগেও পেয়ারার বেগমের ছিল একটি টিনশেড ঘর। এখন সেখানে গড়ে উঠেছে একাধিক ডুপ্লেক্স ভবন। বিষয়টি জানাজানি হলে চক্রের সদস্যরা আত্মগোপনে চলে যায়।

এ বিষয়ে মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “নিখোঁজ ১০ যুবকের মধ্যে একজনের পরিবার মামলা করেছে। ওই মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যান্য পরিবার লিখিত অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে সন্তানদের অনিশ্চিত ভাগ্য নিয়ে চরম উৎকণ্ঠা ও হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে নিখোঁজদের পরিবারগুলো। দ্রুত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাদের সন্ধান ও মানব পাচারকারী চক্রের কঠোর বিচার দাবি করেছে তারা।

 

  • লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার পথে নিখোঁজ মাদারীপুরের ১০ যুবক