774 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

শেষ পর্যন্ত : মোঃ জাহের আলী

দেশের সেরা ব্যাংকের উর্ধতন কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী ভাইটি নিজের সবকিছু বিসর্জন দিলেন যাদের জন্য, তাঁর মৃত্যুতে তাদের কাছ থেকে কোন ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়া না পাওয়ায় প্রশাসন সহ সাধারণ মানুষ পর্যন্ত মর্মাহত, দুঃখিত। শুধু দুঃখবোধের আলামত নেই আপনজনদের কাছে। শেষ পর্যন্ত শেষকৃত্যের ভারটাও এসে পড়ে পুলিশ সদস্যের ঘাড়েই।।
  • 28
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    28
    Shares

ডঃ পরিমল ভৌমিক দেশের একজন মান্য গণ্য ব্যাক্তি, অর্থনীতিবিধ, গবেষক। যে কোন কঠিন, জটিল হিসাব নিকাশ তাঁর নখদর্পণে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন স্বনামধন্য পরামর্শক। অথচ তাঁর বাল্য জীবন অনেক অভাব অনটন আর অনিঃশ্চয়তার মধ্যেই কেটেছে। তাঁর বাবার অভাব অনটনের সংসার নিজের চোখে তিনি দেখেছেন। দেখেছেন অর্থাভাবে চালানো সংসারে মা-বাবার নিত্য দিনের ঝগড়া ঝাটির সব কিছুই।
নুন আনতে পান্তা পুরোয় তাদের অবস্থ্া ওনার চেয়ে আর কারো বেশী জানার কথা নয়। তারপরও একমাত্র মা-বাবার অনুপ্রেরণায় আর নিজের চেষ্টা তদবীরেই আজ এতটা স্বনামধন্য ও সফলতার শীর্ষে পৌঁছার সুযোগ হয়েছে, যদিও সেই সফলতা মা-বাবা দু’চোখ ভরে দেখে যেতে পারেননি। সংসারের অভাব অনটন আর সন্তানের ভবিষ্যত চিন্তায় এতটাই ক্লান্ত, অবশন্ন অবস্থায় পতিত হয়েছিলেন তারা যে, দুই মানের ব্যবধানে দু’জনই ইহলোক ত্যাগ করে স্বর্গবাসী হয়ে গেলেন আকাঙক্ষা পূরণের আগেই।
যে কারণে ডঃ পরিমল ভৌমিকের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। নিজের পড়াশোনা ছাড়াও অন্য দুই ভাই বোনের লেখা পড়া, মানুষ করা, তাদেরকে অন্ততঃ সমাজে একটা প্রতিষ্টিতি পর্য্যায়ে দেখার সাধ আরও ব্যাকুল করে তোলে তাঁকে।
তারপর আস্তে আস্তে অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে ছোট্র একটা চাকুরী পাওয়ার সুবাদে। নিজের পড়া লেখা, ভাই বোনের লেখা পড়া, সংসারের পুরোপুরি দায়িত্বের বোঝা বহন করতে রীতিমত গলদ ঘর্ম অবস্থা। তবে যত কষ্টই হোক দমে যাওয়ার পাত্র নন তিনি।
পাড়া প্রতিবেশী, গ্রামবাসী, এমনকি আত্মীয় স্বজন থেকে চাপের যেন শেষ নেই, বিয়ে করার জন্য। অন্ততঃ ভাই বোন ও নিজের জন্যই। কিন্তু তিনি কারো কথাই শুনতে নারাজ। কারণ তাঁর ধারণা সংসার ধর্মে জড়িয়ে গেলে নিজের উচ্ছ শিক্ষিতি হওয়ার স্বপ্ন পূরণের পথে যেমন বাধা পড়বে তেমনি বাধাগ্রস্থ হবে ভাই বোনের লেখা পড়ায়ও। তাই এ ব্যাপারে কারো কথা মানা সম্ভব নয় তাঁর পক্ষে পরিস্কার ভাবেই সবাইকে জানিয়ে দিলেন। যে কারণে পরামর্শ দাতা সবাই নাখোশ তাঁর প্রতি। কেউ কেউ তো তাঁর বিরুদ্ধে মহা সংগ্রামেই লিপ্ত হয়ে গেছেন আদা জল খেয়ে।
অক্লান্ত পরিশ্রম আর সাধনায় নিজের উচ্ছ শিক্ষার সাথে সাথে ভাই বোনের উচ্ছ শিক্ষারও ব্যবস্থা করতে তিনি সমর্থ হন। ভাই বোনকে উচ্ছ শিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠিয়ে অনেকটা নিঃশ্চিত হলেও নিজের একটা ভাল চাকুরী জুটানো আরও জটিল হয়ে পড়ে।
অবশেষে ভাগ্যের চাকা যেন বিধাতা নিজের হাতেই ঘুরিয়ে দেন অবলীলায় একদিন। উচ্ছ শিক্ষা আর অভিজ্ঞার নিরিখে সুযোগ চলে আসে একটা ভাল চাকুরীর, হয়েও যায় কিন্তু জীবনের অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে ততদিনে।
বন্ধু বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশীর কথা গুলো মাঝে মধ্যে মনে পরতে থাকে অবলীলায়। মনের মাঝে নতুন ভাবনার উদয় হয় ক্ষীণ ভাবে। নিজের মনেই প্রশ্ন জাগে Ñ তাহলে সবার কথা উপেক্ষা করে কি ভূলই করে ফেললাম?
বিয়ের বয়সও প্রায় শেষের পথে। পঁয়তাল্লিশের কোটা পার হয়ে গেছে তিন বছর আগেই। আবার ভাবেন Ñ তাতে কি হয়েছে? এদেশে বা অন্য দেশেও সত্তুর বছর বয়সে বিয়ে করারও তো ভূরি ভূরি নজীর রয়েছে! একবার না হয় চেষ্টা করেই দেখা যাক না?
তাঁর কথাটা শুনে তো অনেকেই যেন আকাশ থেকে পড়ল, তবু পাড়া প্রতিবেশী, বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজন সবাই মহা খুশী। যাক্ এতদিনে তাহলে সুমতি হ’ল বেচারা বুদ্ধিমানের?
মেয়ের খোঁজে নিজেরা দেখার সাথে সাথে গুটি কয়েক ঘটককেও দায়িত্ব দেয়া হ’ল। কিন্তু সমস্যা বেঁধে গেল বয়স নিয়ে। যে দেশে বাল্য বিয়ে রোধের জন্য আইন করেও ঠেকানো যায়না। তের/চৌদ্দ বছর বয়সেই মিথ্যে জাতীয় পরিচয় বানিয়ে বিয়ে/শাদীর কাজ চলে প্রশাসনের চোখ এরিয়ে তাদের নাকে ডগার উপর। সেখানে এত বেশী বয়সী পাত্রের জন্য পাত্রী পাওয়া তো অনেকটা কঠিন ব্যাপারই বটে। তবু ঘটকের তেলেসমাতিতে পাত্রীর কোন সমস্যা হয়নি। কিন্তু ডঃ পরিমল ভৌমিক একজন উচ্ছ শিক্ষিত, উন্নত চিন্তা চেতনা, ধ্যান ধারণার মানুষ, যে কারণে পাত্রী পছন্দ করা প্রায় অসম্ভবই হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষিতা মেয়ে হলেও ভাল বিষয়ে পড়া শোনা, স্মার্ট না হলে ভাল জ্ঞাণী হবে কিনা সে বিষয়ে তো সন্ধেহ থেকেই যায়! তাছাড়া এত শিক্ষিত, ভাল, উন্নত পদবীদারী পাত্রের জন্য সাধারণ চাকুরীজীবি বা বেকার পাত্রী হলে তো সমাজে মুখ দেখানেই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তাছাড়া লোকেই বা কি বলবে? বন্ধু বান্ধব তো মুখ বাঁকা করে টাট্রা মস্করা করে হেয় প্রতিপন্ন করতেও ছাড়বেনা।
এমনি ভাবণার মধ্যে আরও কেটে গেছে দুই/তিন বছর। যে কারণে এই শুভ কাজটি আর করা হয়েই উঠেনি যথা সময়ে।
ভাই বোন দু’জনই বিদেশে উচ্ছ শিক্ষা শেষ করে নিজেদের ইচ্ছে মত বিদেশের মাটিতেই সংসার নিয়ে থেকে গেছে। আদরের বোনটা যদিও একটু জানিয়েছিল। ভাইটা তাও করেনি। নিজে নিজে বিয়ে করার কথা বড় ভাই শুনলে রাগ করবে ও মনে মনে খুব কষ্ট পাবে মনে করে যোগাযোগই ছেড়ে দিয়েছে কয়েক বছর আগে থেকেই।
সময় ও শ্রোত তো কারো জন্য অপেক্ষা করেনা। যে কারণে ডঃ পরিমল ভৌমিকের জন্যও ব্যাতিক্রম হয়নি।
এতটা বয়েস হয়ে গেছে অথচ বিয়ে শাদি না করার কারণে কোন বংশধরও হয়নি বেচারার। ঢাকা শহরের নিজের ফ্লাটেই গবেষণা আর উচ্ছ থেকে উচ্ছতর পড়া শোনা নিয়ে সারাদিন ব্যস্থ থাকেন তিনি।
গত তিন/চারদিন থেকে বাড়ির দারোয়ানের চোখেও পড়েনা সাহেবকে। বাড়ি থেকে বের হতে বা বাড়িতে ঢুকতেও দেখা যায়নি। তিনি তো সাধারণত বাড়ির বাইরে ইদানিং খুব কমই যান। আর গেলেও দারোয়াানকে বলেই যান। আসলে তিনি বাড়ি থেকে বের হলে গেইটের সামনে থাকা দারোয়ান এমনিতেই দেখতে পায়। তবে মালিক না ডাকলে দারোয়ান কোনদিন মালিকের ঘরে সাধারণত যায়না। এমনকি মাস শেষে বেতনের জন্যও কোনদিন এত বছরে যেতে হয়নি। মাস শেষে তিনি নিজে এসেই তাদের হাতে বেতনের টাকা দিয়ে যান সব সময়। বিভিন্ন সময়ে পূঁজা পার্বণে বোনাস ভাতা, কোন কোন সময় উপহার সামগ্রী পর্যন্ত কোনদিন বলতে হয়নি। কারণ সবাই জানেন ডঃ পরিমল ভৌমিক কোন অবিবেচক লোক নন। তিনি একজন অত্যন্ত ভাল এবং অমায়িক লোক।
নানাবিধ ভাবনা নিয়ে দারোয়ান দু’জন এক সাথেই মালিকের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে চোখ তাদের ছানাবড়া।
দরজা ঘরের ভিতর থেকে বন্ধ দেখে প্রথমে অনেকটা উতস্ততঃ করলেও সাহস নিয়ে বার কয়েক দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাক দিতে থাকলেও কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে ভাল ভাবে দেখে বুঝতে পারে আসলেই দরজা ঘরের ভিতর থেকে আটকানো, মনে একটা অজানা সন্ধেহ জাগে।
অনেক ডাকাডাকি, ধাক্কাধাক্কি করে ভিতর থেকে কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে দুইজনই দ্রুত চলে যায় পার্শবর্তী থানায়। কারণ সন্ধেহজনক কিছু হলে বা ঘটলে আগে পুলিশকে জানানোই আসলে নিয়ম।
পুলিশকে অবহিত করার পর দারোয়ান দুইজনকে সাথে নিয়েই থানার এস আই শ্যামল মিত্রের নেতৃত্বে একদল পুলিশ চলে আসে বাসায়।
পুলিশ এসে তাদের নিয়ম মত প্রথমে এসেই বাসার চারিদিক ভালভাবে দেখে ঘটনা অনুমানের চেষ্টা করে, চেষ্টা করে দরজার ফাঁক ফোঁকর দিয়ে ভিতরে কিছু দেখা যায় কিনা। কিন্তু তাতে কোন ফলোদয় না হওয়ায় ডাকা হয় মিস্ত্রিকে দরজা ভেঙ্গে ভিতরে যেতে।
ততক্ষণে এলাকার বাসিন্দারা পুলিশের বাধা উপেক্ষা করেই জড়ো হতে শুরু করে, যদিও কাউকেই ঘরের ভিতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি পুলিশ ছাড়া।
দরজা ভেঙ্গে ভিতরে গিয়ে পুলিশও হতবাক। খাটে বিছানার উপর স্বাভাবিক ঘুমিয়ে থাকার মতই বালীশে মাথা রেখে যেন নিঃশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছেন ডঃ পরিমল ভৌমিক। তবে তিন/চার দিন আগেই যে তিনি পরলোক গমন করেছেন তাতে কোন সন্ধেহ নেই। দেহটা ফোলে স্বাভাবিকের ছেয়ে অনেকটাই মোটা হয়ে গায়ের জামা কাপড় আট সাট ভাবে লেগে আছে গায়ের সাথে। কিছুটা পঁচন ধরার কারণে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে ঘরের ভিতরে। পুলিশ নাকে মাক্স ও হাতে গ্লোব্স পড়ে নড়াচড়া করে দেখছে মৃত্যুর কারণ কি হতে পারে।
পুলিশের ছোরত হাল ও ময়না তদন্তে স্পষ্ট ভাবেই প্রমাণিত হয় স্বাভািিবক ভাবেই মৃত্যু হয়েছে। খোঁজ করা হয় আত্মীয় স্বজনের কিন্তু কাউকেই পাওযা যায়নি। চাকুরীর বায়োডাটা থেকে বাড়ির ঠিকানা নিয়েও কোন স্বজনের বা নিকটাত্মীয়ের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর দুইজন ভাই বোন যে আছে এবং তারা বিদেশেই থাকে সেটা নিঃশ্চিত হয়ে তাদের সাথে পুলিশের পক্ষ থেকেই যোগাযোগ করা হয় একাদিক বার। কিন্তু তাদের কথা বার্তায় পুলিশ সহ সবারই বিস্ময় প্রকাশ ছাড়া আর কিছুই করার থাকেনা।
নিজের জীবনের সাখ-শান্তি, আরাম-আয়েশের চিন্তা না করে একমাত্র আদরের ভাই বোনদের প্রতিষ্টিত করার জন্য এত বড় একজন উচ্ছ শিক্ষিত, দেশের সেরা ব্যাংকের উর্ধতন কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী ভাইটি নিজের সবকিছু বিসর্জন দিলেন যাদের জন্য, তাঁর মৃত্যুতে তাদের কাছ থেকে কোন ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়া না পাওয়ায় প্রশাসন সহ সাধারণ মানুষ পর্যন্ত মর্মাহত, দুঃখিত। শুধু দুঃখবোধের আলামত নেই আপনজনদের কাছে। শেষ পর্যন্ত শেষকৃত্যের ভারটাও এসে পড়ে পুলিশ সদস্যের ঘাড়েই।।

  • 28
    Shares
  • 28
    Shares