374 বার দেখা হয়েছে বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

১৫ আগস্ট একটি রক্তাক্ত স্মৃতি

  • 33
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    33
    Shares
গাজী এমদাদ :  ১৯৯৪ সালে ১৫ আগষ্ট উপলক্ষে তদানীন্তন কয়েকটি দৈনিক ও সাপ্তাহিকীতে আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল – যার শিরোনাম ছিলো “১৫ আগষ্ট – একটি রক্তাক্ত স্মৃতি “। ঐ লেখাটির জন্য সে সময় দেশি-বিদেশি বহু পুরস্কার ও সম্মাননাও জুটেছিল। দূর্ভাগ্য, ছাত্রলীগের রাজনীতির কারনে প্রতিপক্ষ গ্রুপ কর্তৃক হল হতে বেশ কয়েকবার  বিতাড়িত হওয়ায়  অন্যান্য অনেক লেখার সাথে ঐ ঐতিহাসিক লেখাটিও হারিয়ে যায়, সংরক্ষণ সম্ভব হয়নি। ২৬ বছর পর আবারও  লিখলাম ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে! শিরোনামও বজায় রাখলাম আগের টি- “১৫ আগষ্ট – একটি রক্তাক্ত স্মৃতি”। আগামী ১৫ আগষ্ট ‘জাতীয় শোক দিবস’ এ’ বেশ কয়েকটি জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিক পত্রিকায় একযোগে প্রকাশিত হবে লেখাটি।
#লেখক পরিচিতিঃ-
——————————
গাজী এমদাদ
 সদস্য, কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক উপ কমিটি,বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, সাবেক ছাত্রনেতা,  সাংবাদিক, কলামলেখক ও গবেষক।
##বাঙ্গালি জাতি তথা সারা বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক, জঘন্য ও বেদনাবিধুর দিন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট – বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরাজিত শত্রু, মানবতার দুশমন, প্রতিক্রিয়াশীল  দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারের নিজ বাড়ি তে নিষ্ঠুর ভাবে সপরিবারে নিহত হন বিশ্বের নিপীড়িত – নির্যাতিত, শোষিত- বঞ্চিত মানুষের বজ্রকন্ঠ,বিশ্ব  শান্তি ও মানবতার দূত, বাংলা ও বাঙ্গালির হাজার বছরের আরাধ্য পুরুষ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এমন নির্মম,বর্বর, নিষ্ঠুর হত্যাকান্ড বিশ্বে নজিরবিহীন। নারী, শিশু,অন্তঃসত্ত্বা নারী,পঙ্গু ব্যক্তি কেও রেহাই দেয়নি পাপিষ্ঠ, অভিশপ্ত ঘাতকেরা। সে কালো রাতে ঘাতকচক্র শুধুমাত্র জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি,হত্যা করেছে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বড় ছেলে বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ব চলাকালীন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর এডিসি ক্যাপ্টেন শেখ কামাল,তাঁর স্ত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে বিরল সম্মান ধারী, খেলাধুলায় ” ব্লু” পদকপ্রাপ্ত সুলতানা কামাল,মেঝো ছেলে,সম্মুখ সমরের আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতি হতে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন লেঃ শেখ জামাল, তাঁর সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নিউক্লিয়াস শেখ ফজলুল হক মনি,তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মনি , বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই খুলনার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী  শেখ নাসের,ভগ্নীপতি,কৃষকলীগ নেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তাঁর কন্যা বেবি,পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি( আবুল হাসনাত আবদুল্লাহর শিশু পুত্র)  সুকান্ত বাবু,আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব সেরনিয়াবাত ও এক নিকটাত্মীয় রিন্টু। সিঁড়িতে স্বামী বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকতে দেখে বেগম মুজিব ঘাতকদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠেন” তোমরা আমাকে এখানেই মেরে ফেলো”। বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসের ঘাতকদের নিকট পানি চেয়েছিলেন- তাঁকে বাথরুমে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।  সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও জঘন্য মানবতাবিরোধী অপরাধ টি করা হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে আদরের শিশু সন্তান ১০ বছরের  স্কুল পড়ুয়া শেখ রাসেলের প্রতি। ঘাতকেরা জাতির পিতা সহ  ঐ বাড়ির সবাইকে একে একে হত্যা করার পর এগিয়ে আসে নিষ্পাপ  শিশু শেখ রাসেলের দিকে। রাসেল ঘটনার আকষ্মিকতায় ভয় পেয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের টেলিফোন অপারেটর ( পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা  দায়েরকারী) এম এ মোহিত এর কোলে লুকিয়ে বলতে থাকে” ভাইয়া ওরা আমাকে মারবে নাতো”? ঘাতক মাজেদ রাসেল কে টেনে নিয়ে যেতেই রাসেল কেঁদে ওঠে বলে” আমি আমার মায়ের কাছে যাবো, আমাকে সেখানে নিয়ে চলো”। বাঁচার অনেক আকুতি ছিলো বঙ্গবন্ধুর অবুঝ শিশু সন্তান রাসেলের,ঘাতক মাজেদের হৃদয়ে দয়া হয়নি সেদিন। মায়ের কাছে  পৌঁছে দিবে বলে উপরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে নিরপরাধ রাসেল কে। মাজেদের গুলিতে শিশু রাসেলের চোখ ও মাথার মগজ বেরিয়ে যায়! সেদিন  শিশু  রাসেলের আর্তচিৎকারে আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠলেও টলাতে পারেনি ঘাতকের হ্দয়। নিষ্পাপ শিশু রাসেলের নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যায় বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বিয়োগান্তুক ও বেদনাবিধুর ইতিহাস। সকাল ১০ টার কিছু পরে ৩২ নাম্বারের গেটে দাঁড়িয়ে ঘাতক মেজর বজলুল হুদাকে বলতে শুনা যায়” অল আর ফিনিশড”!
এ,পুরো হত্যাকান্ডের যিনি মূল হোতা ও পরিকল্পনাকারি তিনি আর কেহ নন তিনি বঙ্গবন্ধু মন্ত্রীসভার সদস্য, বিশ্বস্ততা প্রমাণে সিদ্ধহস্ত কুচক্রী, পাকিস্তানি এজেন্ট, বাংলার মীর জাফর খন্দকার মুশতাক আহমেদ।  মূলতঃ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হতে মুশতাক বঙ্গবন্ধুর আজীবন শত্রু ছিলেন! আওয়ামী লীগের  প্রতিষ্ঠাকালীন যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও খন্দকার মুশতাক আহমেদ, বঙ্গবন্ধুর ক্যারিশমাটিক গুণ মুশতাকের ছিলো অপছন্দ, নিজেকে বঙ্গবন্ধুর চেয়ে উপরে তোলার অপচেষ্টা ছিলো মুশতাকের,কিন্তু বিধি বাম,সেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব মেনে নিয়েই আজীবন রাজনীতি করতে হয়েছে মুশতাক কে। ‘৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করার তীব্র বিরোধী ছিলেন   মুশতাক আওয়ামী লীগে,মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা ছিলো প্রশ্নবিদ্ধ, পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর সাথে তলে তলে সম্পর্ক রেখে চলতেন মুক্তিযুদ্ধ কালীন নয় মাস। অস্হায়ী বাংলাদেশ সরকারের উপ রাষ্ট্র পতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধান মন্ত্রী তাজউদ্দীন, প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানী,এমনকি ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু কে খন্দকার মুশতাকের পাকিস্তানি কানেকশন সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন,কিন্তু ধূর্ত শেয়াল প্রকৃতির মুশতাক বঙ্গবন্ধু কে মোহাবিষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিলেন, মুশতাকের পাকিস্তানি কানেকশন সম্পর্কে অনেক অকাট্য প্রমাণ  ও দলিল বঙ্গবন্ধু কে মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়েই অবহিত করা হয়েছিল, সেই কুচক্রী, ষড়যন্ত্রকারী মুশতাকের উপরেই আস্হা রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু।  করেছেন মুক্তিযুদ্ধ কালীন অস্হায়ী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রী সভায় ও জায়গা করে নিয়েছিলেন মুশতাক, ‘৭৩ এ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লার দাউদ কান্দিতে নিজ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নিকট গো হারাও হেরে গিয়েছিলেন প্রায়- পরে ঢাকা হতে হেলিকপ্টার পাঠিয়ে সব  ভোটের বাক্স তুলে নিয়ে বিজয়ী ঘোষণা করা হয় অজনপ্রিয় মুশতাক কে,যেখানে প্রায় সব আসনেই জয় পায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নৌকার মাঝিরা। ‘৭১ এ মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়েই যদি ষড়যন্ত্রকারি মুশতাক কে দল হতে বিতাড়িত করা যেতো তাহলে বাংলাদেশের  তথা সারা বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে  নির্মম ও জঘন্যতম হত্যাকান্ড ঘটতো না বলে  ইতিহাস বেত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকগন মনে করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশ গঠিত হওয়ার পরও মুশতাক পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশন গঠনে চাপ অব্যাহত রাখেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি!  স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে বঙ্গবন্ধুর প্রবর্তিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদেরও তীব্র বিরোধী ছিলেন মুশতাক,  মুসলিম বিশ্বের স্বীকৃতি আদায়ে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ অন্তরায় বলে বঙ্গবন্ধু কে পরামর্শ দিতেন সংবিধান হতে এটা তুুলে নিতে, পাকিস্তানী ভাবধারায় দেশকে পুনরায় ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা দিতে! বঙ্গবন্ধু মুশতাকের এসব উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পরামর্শ আমলে নেননি, কারন তিনি আজীবন অম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন,ধার্মিক কিন্তু ধর্মান্ধ ছিলেন না, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন,  আর তাতে মুশতাকের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ স্পৃহা  ও ক্ষমতার  উচ্চাকাঙ্খা জাগ্রত হতে শুরু করে। তাঁর সাথে হাত মেলায়  ‘৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে  পরাজিত,বঙ্গবন্ধুর আজীবন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, চির শত্রু, পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভূট্রো,মুক্তিযুদ্বে আমাদের তীব্র বিরোধীতা কারি ও পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বনকারি আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের মদদে সিআইএ, একাত্তরে পরাজিত পাকিস্তানের দালাল রাজাকার, আলবদর, আল শামস,দেশপ্রেমিক নামধারী অতি বিপ্লবী জাসদের নষ্ট ভ্রষ্ট কিছু নেতা, মাওলানা ভাসানী ও আওয়ামী লীগের কিছু নেতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন।জেলার উন্নয়ন কর্মকান্ড ও বাকশালের সাংগঠনিক তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করার অজুহাতে মুশতাক ‘৭৩ হতে ‘ ৭৫ এর ১২ আগষ্ট পর্যন্ত কুমিল্লার বার্ডে বসে গোপন বৈঠক করতেন, সাথে থাকতেন তাহের উদ্দীন ঠাকুর,মাহবুব আলম চাষী, মুশতাকের ভাগ্নে মেজর খন্দকার আবদুর রশিদ ও স্হানীয় কিছু নেতা-কর্মী। প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর প্রতি অতিমাত্রায় ভক্তি ও আনুগত্য প্রদশর্নের অন্তরালে চলতে থাকে মুশতাক গংদের গভীর ষড়যন্ত্র!  এসব ষড়যন্ত্র ও গোপন তৎপরতার কথা দেশীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধু কে বহুবার অবহিত করণের পরও কঠোর হতে পারেননি বঙ্গবন্ধু। তাঁকে সুস্পষ্ট ভাবে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যার পরিকল্পনার কথা জেনেও আমলে নেননি বিশাল হৃদয়ের বঙ্গবন্ধু।  তাঁর বিশ্বাস জন্মেছিল-  আর যাই হোক বাঙ্গালিরা কখনো তাঁকে হত্যা করতে পারবেনা,বিশ্বের সর্বাধুনিক পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও শাসক গোষ্ঠী যেখানে তাঁকে হত্যায় সাহস দেখায়নি! এ অতি বিশ্বাসই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে বাঙ্গালি জাতি ও জাতির পিতার জন্য।  এরমধ্যে জাসদের খুন,লুট,ডাকাতি পরিস্থিতি ঘোলাটে করে রেখেছিলো,বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরিতে বৈজ্ঞানক সমাজতন্ত্রের পতাকা ধারীদেরও ভূমিকা ছিলো।
 বঙ্গবন্ধু ও তাঁর বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র তো আগে থেকেই ছিলো,তাঁর পরিবারের সদস্য দের নিয়েও মিথ্যাচার ও ষড়যন্ত্র হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামালের তথাকথিত নারী কেলেঙ্কারি ও ব্যাংক ডাকাতির ধুয়া তুলে ক্ষেপিয়ে তোলা হয়েছিল সেনাবাহিনীর বিপথগামী একটা অংশকে! বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব বাকশাল গঠনের বিরুদ্ধেও অপ প্রচার হয়েছে, সামরিক বাহিনীর ভিতরে লিফলেট  বিতরণ ও গোপন বৈঠক করে কর্নেল তাহেরের অনুগত প্রাক্তন ও কর্মরত পাকিস্তানি ভাবধারার কিছু সেনা সদস্য – বাকশাল গঠনের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর বিলুপ্তি ও রক্ষী বাহিনীর নিকট রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা অর্পণ, সামরিক বাহিনীর সদস্য দের অস্ত্র, রশদ ও রেশনিং পদ্ধতি উঠিয়ে দেওয়ার মিথ্যা সংবাদ প্রচার করে কিছু ইউনিট কে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার প্রয়াস চালান,তাতে গোপনে সমর্থন যুগান বঙ্গবন্ধু সরকারের একসময়ের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জেনারেল এম এ জি ওসমানী, সেনাবাহিনীর উপ প্রধান( যিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেনা প্রধান হতে চেয়েছিলেন, বাকশালের সদস্য পদ গ্রহণ করতেও তীব্র লবিং করেছিলেন,যদিও বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সরকারের আস্হা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছিলেন) মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান,  বাকশাল হতে পদত্যাগকারী সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের রাজনীতির বিশ্বস্ত সহচর দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা,যাকে বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি হতে বহুবার অনুরোধ করছিলেন, যাঁর প্রতি ভালবাসার নিদর্শন স্বরুপ রাজনীতি হতে বহু দূরে অবস্থান করা বিলেত ফেরত ছেলে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন কে দলে নিয়ে সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। সমস্ত অপশক্তি সমূহের সম্মিলিত ষড়যন্ত্র বঙ্গবন্ধু হত্যার পটভূমি তৈরি করে। এ মুশতাক ১৪ আগষ্ট রাতেও জাতির পিতা ও তাঁর পরিবারের সদস্য দের জন্য হাঁসের মাংস ও রুটি রান্না করে নিয়ে খাাইয়ে এসেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামালের বিবাহের উকিল ও হয়েছিলেন,বঙ্গবন্ধুর টুঙ্গিপাড়ার গ্রামের পুকুরে ছিপ দিয়ে মাছ শিকার করেছেন,বঙ্গবন্ধুর বাবা শেখ লুতফুর রহমানের কবরে নেমেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর মা সায়েরা খাতুনের মরদেহের উপর প্রচন্ড বিলাপ করেছিলেন,বঙ্গবন্ধু তাঁর বড় সন্তান শেখ হাসিনা কে বরাবরই বলতেন” মা যখনই বিপদে পড়বি,কোন কিছুর দরকার হবে তোর মুশতাক চাচার নিকট যাবি”। আর সেই মুশতাক গোপন     ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলো তার অনুকূল সময়ে।   সে সময় স্বামী  বিশিষ্ট পরমানু বিজ্ঞানী ডঃ এম এ ওয়াজেদ মিয়ার কর্মস্থল জার্মানীতে অবস্থান করায় ঘাতকের নির্মম বুলেট হতে রক্ষা পান বড় মেয়ে শেখ হাসিনা ও ছোট বোন শেখ রেহানা।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর লাশ তখনও ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে, তাঁর রক্ত মাড়িয়ে স্ব ঘোষিত রাষ্ট্রপতি খুনি মুশতাকের শপথ গ্রহণ ও নতুন মন্ত্রী সভায় যোগ দিতে বঙ্গভবনে  ছুটে যান তাঁরই দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত   কিছু স্বার্থান্ধ, কুচক্রী ও খুনিদের দোসর মোহাম্মদ উল্লাহ,বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, আবদুল মালেক উকিল,ফনি ভূষণ মজুমদার, আবদুল মোমেন,আবদুল মান্নান,ডঃ আজিজুর রহমান মল্লিক,তাহের উদ্দীন ঠাকুর, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন  কে এম ওবায়দুর রহমান, ক্ষিতিশ চন্দ্র মন্ডল,মাহবুব আলম চাষী প্রমুখ।    জেনারেল এম এ জি ওসমানী মন্ত্রীর পদ মর্যাদায় রাষ্ট্রপতি মুশতাকের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন। উপস্হিত সবাই জাতির পিতার খুনিদের ” সূর্য সন্তান” হিসেবেও আখ্যা ও সংবর্ধনা দেন বঙ্গভবনে। ১৫ আগষ্ট সকালে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাসায় অস্হির পায়চারি করছিলেন উপ সেনা প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, তিনি আগে থেকেই হত্যাকান্ড সংঘটিত হওয়ার সময় জানতেন,১৯৯৬ সালের ১২ জুন নির্বাচনে জয় লাভ করে  ২১ বছর পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর খুনিদের গ্রেফতার ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে একই বছরের অক্টোবরে আদালতে জবানবন্দি তে খুনি লেঃ কর্নেল সৈয়দ ফারক রহমান বলেছিলেন—” আমরা তার ( জিয়া) শরণাপন্ন হই,তিনি বললেন তোমরা জুনিয়র রা যা করার করো,আমাকে টেনে এনোনা এর মধ্যে “। তার অর্থ পরিস্কার।  খুনিদের একজন যখন  ব্রিগেডিয়ার ( পরবর্তী তে মেজর জেনারেল)  আমিন আহমেদ চৌধুরী ও কর্নেল শাফায়াত জামিল কে জিয়ার বাসভবনে নিয়ে যায় তখন আমিন আহমেদ চৌধুরী লক্ষ করলেন  জেনারেল জিয়া এক পাশে  শেভ করেছেন,অন্য পাশে করেননি, স্লিপিং স্যুটে ভিতর হতে দৌড়ে আসলেন,তাদের সবার মুখে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও পরিবারের সদস্য দের নির্মম ভাবে হত্যার খবর শুনে ইংরেজিতে বললেন” সো হোয়াট? লেট ভাইস প্রেসিডেন্ট টেক ওভার।উই হ্যাভ নাথিং টু ডু উইথ পলিটিক্স,”।  এই অবস্থায় একটু পর  জিয়াও ছুটে গেলেন বঙ্গভবনে। সেখানে আগে থেকেই খুনিরা ভারি অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বঙ্গভবনে পাহাড়া বসিয়েছে।
খুনি মুশতাক রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েই২০ আগষ্ট দেশে সামরিক আইন জারি করেন, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান কে চীফ অব আর্মি ষ্টাফ নিযুক্ত করেন।একই বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স -৫০/১৯৭৫ জারি করে জাতির পিতা ও তাঁর পরিবারের সদস্য দের হত্যার বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেন, একই সাথে খুনিদের বিচার হতে দায়মুক্তি দেন।  খুনি চক্র কর্তৃক ১৯৭৫ এর ৩ নভেম্বর জেল খানায় চার জাতীয় নেতা কে গুলি ও বেয়নেট খুঁচিয়ে হত্যার পর নভেম্বরে বিশেষ বিমানে করে নিরাপদে প্রথমে থাইল্যান্ডে পাঠিয়ে দেয়া হয়, পরবর্তী তে সব খুনিদের পুরস্কার হিসেবে বিদেশে বাংলাদেশী দূতাবাস সমূহে কূটনীতিক হিসেবে পদায়নের ব্যবস্থা করেন জিয়াউর রহমান, কাউকে কাউকে পরবর্তী তে দেশে এনে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উপ সচিব থেকে সচিব পর্যন্ত পদোন্নতি দেন। জেনারেল জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ডের পর তার সুযোগ্য সাগরেদ জেনারেল এইচ এম এরশাদ ক্ষমতায় এসে ৯ বছরের সামরিক ও বেসামরিক শাসনামলে একই কায়দায় জাতির পিতার খুনিদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন,বিভিন্ন দূতাবাসে আগে হতে কর্মরত খুনিদের আবারো পদোন্নতি দেন, খুনি দের  একাংশ কে দেশে ফিরিয়ে এনে রাজনীতিতে পুনর্বাসন করেন। খুনি লেঃ কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান কে ১৯৮৬ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তার বিরুদ্ধে প্রার্থী করেন,ফ্রিডম পার্টি ও প্রগশ নামে রাজনৈতিক দল গঠনের ও প্রচারের সুযোগ করে দিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা কে হত্যার  সুযোগ করে দেন,খুনিরা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গুলি ও বোমা হামলা করে শেখ হাসিনা কে হত্যার বহু চেষ্টা চালায়। এরশাদ খুনিদের সাথে নিয়মিত বৈঠক করতেন,তাদের মিশন বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও রাষ্ট্রীয় সুবিধাদি প্রদান করতেন।
১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেত্রীত্বে বিএনপি- জামাত ক্ষমতায় আসার পর পূর্বসূরি দেবর জেনারেল এরশাদ ও স্বামী প্রয়াত জেনারেল জিয়াউর রহমানের পদান্ক অনুসরণ করেন বেগম জিয়া- জাতির পিতার আত্মস্বীকৃত খুনি দের পদোন্নতি প্রদান করেন,তাদের রাজনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অবাধ সুযোগ করে দেন।  জাতির পিতার শাহাদাৎ বার্ষিকী ১৫ আগষ্ট কে ‘৯৩ সালের ১৫ আগষ্ট  হতে তার নিজের জন্মদিন হিসেবে পালন করতে থাকেন তথাকথিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ইতিহাসের নর্দমার কীট ডঃ এমাজ উদ্দীনের পরামর্শে – উদ্দেশ্য জাতির পিতার প্রতি অসম্মান ও অশ্রদ্ধা প্রদর্শন!  নন মেট্রিক বেগম জিয়ার জন্ম তারিখের সঠিক সন্ধান যদিও আজ মেলেনি! স্কুলের রেজিষ্ট্রেশনের সময় একটা, বিয়ের সময় আরেকটা,  ‘৯১ এ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার সময় একটা ও ‘৯৩ এর ১৫ আগষ্ট হতে আরেকটা। অথচ অকৃতজ্ঞ বেগম জিয়ার সংসার টা টিকিয়ে দিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান,  মুক্তিযুদ্ধের  ৯ মাস জিয়ার কমান্ডিং অফিসার  জেনারেল জানজুয়ার নিয়ন্ত্রণে ক্যান্টনমেন্টে বন্দী বেগম জিয়া দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তি লাভ করে স্বামী জেনারেল জিয়াউর রহমানের নিকট ফিরে এলে জিয়া তাকে ঘরে তুলতে অস্বীকৃতি জানান,বঙ্গবন্ধুর হস্তক্ষেপে টিকে যায় বেগম জিয়ার সংসার – বঙ্গবন্ধু জিয়াকে খালেদা কে গ্রহণ না করলে চাকুরিচ্যুতির হুমকি দিয়ে বলেছিলেন” খালেদা আমার মেয়ে”! সেই বেঈমান খালেদা জিয়া পিতার মর্মান্তিক শাহাদাৎ বার্ষিকীর দিন টিকেই বেছে নিলেন নিজের ভুয়া জন্মদিন হিসেবে, আনন্দ করেন,কেক কাটেন। ‘ ৯৬ এর ১৫ ফেব্রুয়ারির তথাকথিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লার চান্দিনা হতে খুনি কর্নেল খন্দকার রশীদ কে পাশ করিয়ে জাতীয় সংসদ বিরোধী দলীয় নেতা বানিয়ে পবিত্র সংসদ কে চরম অবমাননা করেন, খুনিদের দল ফ্রিডম পার্টি হতে মেজর বজলুল হুদা,শাহরিয়ার রশীদ খান সহ আরও কয়েকজন কে পাশ করিয়ে সংসদে বসান।
সকল ষড়যন্ত্র জাল ছিন্ন করে অবশেষে দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনের মাধ্যমে আবারো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ,  জাতীয় সংসদের মাধ্যমে বাতিল করা হয় বহুল সমালোচিত ও ঘৃন্য কালো আইন’ ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’ দ্রুত  শুরু হয় জাতির পিতার খুনিদের গ্রেফতার ও বিচার প্রক্রিয়া!  কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, লেঃ কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, লেঃ কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ কে দেশেই গ্রেফতার করা হয়।   মেজর বজলুল হুদাকে  থাইল্যান্ড হতে, আর্টিলারি ল্যান্সার এ কে মহিউদ্দিন কে যুক্তরাষ্ট্র হতে ফিরিয়ে আনা হয়। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার এক পর্যায়ে ২০০১ সালে আবারও বিএন পি- জামাত জোট রাষ্ট্রক্ষমতায় আসলে বন্ধ হয়ে যায় জাতির পিতার হত্যাকান্ডের বিচার। ২০০৮ এর ডিসেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে বিচার কাজ ত্বরান্বিত করে এবং ২০১০ সালে উল্লেখিত বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি দের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়,বাকি পলাতক আসামী লেঃ কর্নেল খন্দকার আবদুর রশিদ,  শরীফুল হক ডালিম, নূর চৌধুরী,  রাশেদ চৌধুরী, আজিজ পাশা, রিসালদার মোসলেম উদ্দীন, ক্যাপ্টেন মাজেদের ফাঁসির দন্ড বহাল থাকে- যা গ্রেফতার হওয়া মাত্রই রায় কার্যকর করা যাবে।এরমধ্যে খুনি মাজেদ কয়েক মাস আগে লুকিয়ে দেশে আসলে  গ্রেফতার ও পরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রায় কার্যকর করা হয়।বাকি খুনিদেরও দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ইন্টারপোল ও কূটনীতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বর্তমান সরকার। সন্তোষের বিষয় দীর্ঘদিন পরে হলেও আত্মস্বীকৃত খুনি দের প্রচলিত সাধারন আদালতে বিচার ও রায় কার্যকরের মাধ্যমে কিছুটা হলেও দায়মুক্ত হলো বাঙ্গালি জাতি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন স্বপ্ন ছিলো  বাংলার মানুষের সামাজিক – সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি, শোষণ ও বঞ্চনা মুক্ত সাম্য ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা- যার জন্য লড়াই,আন্দোলন -সংগ্রাম করতে গিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ২৩ বছরের মধ্যে ১৪ টি বছরই জেলে কাটাতে হয়েছে। দেশ ও দেশের মানুষ কে গভীর ভাবে ভালবাসতেন জাতির পিতা,তাইতো নিজের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে দেশের ও দেশের মানুষের ভালবাসার ঋণ শোধ করে গেছেন।
Attachments area
  • 33
    Shares
  • 33
    Shares