৬৭ হাজার মানুষ মেরেও হামাসকে গুঁড়িয়ে দিতে ব্যর্থ ইজ়রায়েল
দু’বছরের ইজ়রায়েল–হামাস যুদ্ধ শেষের পথে পৌঁছেছে কি? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তিপ্রস্তাবের প্রাথমিক শর্তে রাজি হয়েছে তেল আভিভ ও প্যালেস্টাইনপন্থী গোষ্ঠী হামাস। ফলে পণবন্দিদের মুক্তির পথ খুলে গিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই উঠছে বড় প্রশ্ন— হামাসকে সত্যিই কি দমাতে পারল ইজ়রায়েল? না কি যুদ্ধের ভিতরেই লুকিয়ে আছে নতুন সংকটের বীজ?
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশের বক্তব্য, ইজ়রায়েল হামাসের ‘কোমর ভেঙেছে’ ঠিকই, কিন্তু তাকে নিশ্চিহ্ন করা এখনো দূর অস্ত। ইজ়রায়েলি ডিফেন্স ফোর্স (IDF) দাবি করেছে, গত দু’বছরে হামাসের প্রায় ২৫–৩০ হাজার যোদ্ধার মধ্যে ১৭–২৩ হাজারকে তারা খতম করেছে। পাশাপাশি নিকেশ করেছে একাধিক শীর্ষ নেতা। তবু হামাসের ঘাঁটি থেকে পণবন্দিদের উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছে ইহুদি ফৌজ। এই ব্যর্থতা যুদ্ধজয়ের দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
৭ অক্টোবর ২০২৩— দিনটি এই যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ইরান-সমর্থিত হামাস আচমকা ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’ চালিয়ে গাজ়া সীমান্ত পেরিয়ে ইজ়রায়েলে প্রবেশ করে। রকেট হামলায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে ইজ়রায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিমান ও স্থলবাহিনীর পাল্টা অভিযান শুরু হয়।এই হামলায় ১,২০০-রও বেশি নিরীহ নাগরিক প্রাণ হারান। ২৫০ জনেরও বেশি মানুষকে পণবন্দি করে গাজ়ায় নিয়ে যায় হামাস। তখন থেকেই শুরু হয় দীর্ঘ ও জটিল যুদ্ধ, যার নাম দেয় তেল আভিভ— ‘অপারেশন সোর্ড অফ আয়রন’।প্রথমে বিমান হামলা, তারপর স্থল অভিযান— ধাপে ধাপে গাজ়ার মূল ‘কমান্ড হাব’ ধ্বংসে নামে আইডিএফ। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে গাজ়া ও জাবালিয়ায় ট্যাঙ্কবাহিনীর প্রবেশের পরই শুরু হয় শীর্ষ নেতৃত্বকে খতমের অভিযান।এই সুড়ঙ্গগুলিই হামাসের প্রকৃত শক্তি। প্রায় ৫৬০–৭২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নেটওয়ার্কে ৫,৭০০-রও বেশি আড়াল ঘাঁটি রয়েছে। এখানেই অস্ত্র, পণবন্দি ও যোদ্ধাদের লুকিয়ে রাখা হয়। ইজ়রায়েল এই সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা হামাসকে পুনর্গঠনের সুযোগ দিচ্ছে।
একই সঙ্গে ইজ়রায়েলি বোমাবর্ষণে গাজ়ায় মৃতের সংখ্যা বেড়েছে নাটকীয় হারে। প্যালেস্টাইনের স্বাস্থ্য মন্ত্রকের তথ্য বলছে, মৃতের সংখ্যা ৬৭ হাজার ছাড়িয়েছে, যার অর্ধেকই নারী ও শিশু। আল-শিফা ও নাসেরের মতো হাসপাতাল গুঁড়িয়ে গিয়েছে, ধ্বংসস্তূপের ওজন প্রায় পাঁচ কোটি টন বলে অনুমান।
অন্যদিকে, হামাসও হাত গুটিয়ে বসে নেই। মার্কিন সংস্থা ACLED (Armed Conflict Location and Event Data) জানিয়েছে, গেরিলা কৌশল অবলম্বন করে তারা দক্ষিণ গাজ়ায় ১০–১২ হাজার যোদ্ধা মোতায়েন করেছে। ২০২৫-এর শুরু থেকে সংগঠনে যোগ দিয়েছে অন্তত ১৫ হাজার নতুন যুবক, যা হামাসের পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, প্রচার কৌশলেও হামাস এগিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে ইজ়রায়েলকে ‘গণহত্যাকারী’ হিসেবে উপস্থাপন করে তারা জনমত নিজেদের পক্ষে টেনে নিয়েছে। ব্রিটেন, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, কানাডার মতো দেশ সম্প্রতি প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে একা হয়ে পড়ছে তেল আভিভ।
লস অ্যাঞ্জেলেসের এক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ শায়েল বেন বলেন, “হামাস শুধু একটি সংগঠন নয়, এটি একটি জাতীয়তাবাদী ভাবনা। আরব দুনিয়ার ঐতিহাসিক সমর্থন রয়েছে তাদের পেছনে। তাই হামাসকে সামরিকভাবে হারালেও নতুন রূপে ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রবল।”
এই বাস্তবতাকে স্বীকার করেছেন ইজ়রায়েলি সেনাপ্রধান ইয়াল জামিরও। স্থানীয় ‘চ্যানেল ১২’-কে তিনি বলেন, “গাজ়া পুরোপুরি দখল করলেও হামাসকে শেষ করা সহজ নয়। এতে উল্টে আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা।”
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের শান্তিপ্রস্তাব ইজ়রায়েলের জন্য যেন ‘সাপের ছুঁচো গেলা’। পণবন্দিদের মুক্তি ঘটলে দেশের অভ্যন্তরে নেতানিয়াহু সরকারের ওপর চাপ কিছুটা কমবে। কিন্তু হামাসও স্পষ্ট করে দিয়েছে— যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে তার চরম মূল্য দিতে হবে তেল আভিভকে।
এরই মধ্যে ইজ়রায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী বেন গাভির আল-আকসা মসজিদে প্রার্থনা করে যুদ্ধজয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। সৌদি আরব, জর্ডন-সহ একাধিক আরব দেশ এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা করেছে।
এখন গোটা বিশ্বের চোখ একটাই প্রশ্নে— ট্রাম্পের শান্তিপ্রস্তাব কতদিন টেকে? গাজ়া যুদ্ধের সত্যিকারের বিজয়ী কে হবে— ইজ়রায়েল না হামাস?