বেইলি রোডের ট্র্যাজেডিতে মৃত্যু বেড়ে ৪৬

লেখক:
প্রকাশ: ১ মাস আগে

রাজধানীর বেইলি রোডে বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২২ জন। এ ঘটনায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

গত বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে ভবনটিতে আগুন লাগে। আগুন নেভানোর পর হতাহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেয়া হয়।

 

ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরিদর্শন শেষে পিবিআই ধারণা করেছে, গ্যাসের লাইন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। আগুন লাগার ঘটনা এবং পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে ভবনের নিচতলায় আগুন লাগে। তারপর দোতলায় লাগে। পরে তা মুহূর্তের মধ্যেই ভবনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এর কিছুক্ষণের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। এর পাশাপাশি ক্রেনের সাহায্যে ভবনের ওপরের তালা থেকে মানুষদের নামিয়ে আনতে থাকে।

 

টিটু নামের একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, আগুন দগ্ধ হয়ে ক্ষতি হওয়ার চেয়ে ধোঁয়ায় মানুষ আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যারা এই ভবনে ছিলেন তাদের বেশির ভাগই ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। তাদের শরীরে পোড়ার ক্ষত তেমন হয়নি। ভবনটির তৃতীয় তলায় একটি পোশাকের দোকান ছাড়া অন্য সব তলায় রেস্তোরাঁ ছিল। এসব রেস্তোরাঁয় অনেক গ্যাস সিলিন্ডার ছিল। সেগুলো বিস্ফোরিত হয়ে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

 

আরেকজন বলেন, ভবনের ভেতরে বড় বড় গ্যাস সিলিন্ডার ছিল। সেগুলোতে আগুন ধরে যাওয়ায় লোকজন বের হতে পারেননি। আগুন ধরার কিছু সময় পর এক এক করে সিলিন্ডার ব্লাস্ট হচ্ছিল। ভবনের পুরো ভেতরটা ধোঁয়ায় ঘেরা ছিল, বাইরেও ধোঁয়া বেরিয়ে আসছিল।

 

এ ঘটনায় র‌্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) অতিরিক্ত আইজিপি এম খুরশীদ হোসেন বলেছেন, ‘নিচতলায় একটা ছোট দোকান ছিল, সেখান থেকে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়েছে। সেখান থেকে আগুন ছড়িয়েছে। এখানে অধিকাংশ যেহেতু রেস্টুরেন্ট ছিল, সেহেতু অনেক গ্যাস সিলিন্ডারও ছিল। সেগুলোতেই আগুন ছড়িয়েছে। প্রাথমিকভাবে তাই ধারণা করা হচ্ছে।’

 

গতকাল শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আহতদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সাংবাদিকের এসব কথা বলেন তিনি।

 

র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, অধিকাংশ মানুষই ধোঁয়ার কারণে শ্বাসরোধে মারা গিয়েছেন। ভবনটিতে একটি

 

মাত্র সিঁড়ি ছিল। দুইটি লিফট ছিল। ফলে আগুন লাগার পর কেউ নামতে পারেনি। কেউ বলছিলেন উপরে আগুন লেগেছে, কেউ বলেছেন নিচে। ফলে মানুষ কোন দিকে যাবে তা বুঝতে পারেনি।

 

ভবনটিতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভবনটির জরুরি অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল, তা দিয়ে তারা চেষ্টা করেছে। তবে পরে যখন অনেকগুলো সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়েছে তখন আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

 

 

এম খুরশীদ হোসেন আরও বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। আমাদের যদি মনে হয় এখানে ইনভেস্টিগেশন করা প্রয়োজন, তাহলে আমরা সেটি করব। আমাদের ইন্টেলিজেন্স উইং এ ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করছে।

 

বেইলি রোডের সেই ভবনটি সাততলা। ভবনের দ্বিতীয় তলায় ছিল ‘কাচ্চি ভাই’ নামীয় খাবারের দোকান। তৃতীয় তলায় একটি পোশাকের দোকান ছাড়া ওপরের সব তলায় ছিল খাবারের দোকান। প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়ও সেখানকার খাবারের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেকেই পরিবার ও স্বজনদের নিয়ে খেতে আসেন। আনুমানিক রাত ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের মোট ১৩টি ইউনিট ঘটনাস্থলে কাজ করে এবং রাত ১১টা ৫০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

 

পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে রাত ২টা ২০ মিনিটের দিকে ঘটনাস্থলকে ‘ক্রাইম সিন’ ঘোষণা দিয়ে ভবনটির সামনে হলুদ ফিতা আটকে দেন। সকাল ১০টায় ভবনটির সামনে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য অবস্থান করতে দেখা গেছে। এছাড়া ভবনটির সামনে উৎসুক জনতার ভিড় ছিল। অধিকাংশ উৎসুক জনতা পোড়া ভবনটির সামনে সেলফি তুলছিলেন। কেউবা নিজেদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে লাইভে গিয়ে ভবনটি সম্পর্কে বিস্তারিত বলছিলেন।

 

ভবনের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে ওই ভবনের পাশের ভবনের এক বাসিন্দা বলেন, আগুন লাগার পর ধোঁয়া চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। আমি আমার আম্মা আর ছোট বোনকে নিয়ে দ্রুত বাসা থেকে বের হয়ে পড়ি। আগুন লাগা ভবনটিতে আমরা মাঝে মধ্যেই কাচ্চি খেতে যেতাম। চোখের সামনে সবকিছু তছনছ হয়ে গেল। আগুন নেভানোর পর থেকেই মানুষ এখানে এসে ছবি তুলছেন।

 

জানা গেছে, ভবনটিতে কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্ট ছাড়াও পিৎজা ইন, ইলিয়েন, খানাস, গ্যাজেট অ্যান্ড গিয়ার ও স্যামসাংয়ের শোরুম ছিল।

 

বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ৪৬ জন মারা গেছেন। বেশির ভাগের শ্বাসনালি পুড়ে ও ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টে মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২২ জন।

 

গতকাল শুক্রবার ভোর ৫টা ৪১ মিনিটে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর শুরু হয়েছে। হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। এখন পর্যন্ত ৩৮ জনের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি তিনজনের লাশ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। পাঁচজনের পরিচয় এখনও শনাক্ত করা যায়নি।

 

দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা সেবা পরিদর্শনে সকালে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ইউনিটে এসে এসব কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন। এছাড়া মন্ত্রী জানান, আহতদের সব দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী নিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের চিকিৎসার ব্যয় বহন করা হবে।

 

 

 

ইমি/পথিক নিউজ

  • ট্র্যাজেডিতে
  • বেইলি রোডের
  • বেড়ে ৪৬
  • মৃত্যু