ইতিহাসের আড়ালে থাকা এক সাহসী ছাত্রনেতার গল্প, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে কিছু নাম উচ্চারিত হয় বারবার, আবার কিছু নাম থেকে যায় ইতিহাসের পাতায়, আড়ালে-আবডালে। তেমনই একজন মানুষ আব্দুল কুদ্দুস মাখন—যিনি ষাটের দশকের উত্তাল ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি ছিলেন স্বাধীনতাকামী ছাত্রসমাজের অন্যতম সংগঠক এবং বহুল আলোচিত ‘চার খলিফা’র একজন।
ছাত্ররাজনীতি থেকে নেতৃত্বের শীর্ষে
ষাটের দশকের শেষভাগে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে ছাত্রলীগ ছিল একটি শক্তিশালী সংগঠন। ছয় দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের দাবি যখন ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছিল, তখন ছাত্রসমাজও সংগঠিত হচ্ছিল স্বাধীনতার স্বপ্নকে সামনে রেখে।
সেই সময় ছাত্রলীগের রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন চার তরুণ নেতা—নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, আ স ম আবদুর রব ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন। রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁরা পরিচিতি পান ‘চার খলিফা’ নামে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল কুদ্দুস মাখন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে দ্রুত নিজের অবস্থান তৈরি করেন। তিনি ছিলেন এমন এক সময়ের রাজনীতিক, যখন রাজপথের প্রতিটি মিছিল, প্রতিটি স্লোগান এবং প্রতিটি সাংগঠনিক উদ্যোগ বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে আরও শক্তিশালী করে তুলছিল।
নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও স্বাধীনতার স্বপ্ন
স্বাধিকার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গোপন রাজনৈতিক সংগঠন ‘নিউক্লিয়াস’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংগঠনটির লক্ষ্য ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে স্বাধীনতার সংগ্রামের দিকে এগিয়ে নেওয়া।
আব্দুল কুদ্দুস মাখন এই রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছাত্রলীগের সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠন, কর্মীদের সংগঠিত করা এবং আন্দোলনকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে এই ধারার নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
গণ-অভ্যুত্থান থেকে ডাকসুর নেতৃত্বে
১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রসমাজ ছিল আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এগারো দফা দাবিকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে গড়ে ওঠা আন্দোলন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভিত নাড়িয়ে দেয়। সেই উত্তাল সময়ে ছাত্রনেতা হিসেবে আব্দুল কুদ্দুস মাখনও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ১৯৭০-৭১ মেয়াদে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হন। একই সময়ে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) ছিলেন আ স ম আবদুর রব।
ডাকসুর এই নেতৃত্ব স্বাধীনতার দাবিতে ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখন শুধু উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান ছিল না; হয়ে উঠেছিল বাঙালির রাজনৈতিক জাগরণ, প্রতিবাদ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলনের ঐতিহাসিক অধ্যায়।
১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে পূর্ব বাংলায় প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজপথ।
এই পরিস্থিতিতে ছাত্রনেতারা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনসংলগ্ন ঐতিহাসিক বটতলায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। পতাকা উত্তোলন করেন ডাকসুর তৎকালীন ভিপি আ স ম আবদুর রব।
সেদিনের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে আব্দুল কুদ্দুস মাখনসহ ছাত্রনেতাদের উপস্থিতি ও ভূমিকা স্বাধীনতার আন্দোলনকে নতুন তাৎপর্য দেয়। পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রতীকী রূপ লাভ করে এবং আন্দোলন আরও সুসংগঠিত হয়ে ওঠে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের ভূমিকা
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যার পর বাঙালি জাতি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় স্বাধীনতার জন্য এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম।
ছাত্রলীগের বহু নেতাকর্মী সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন, সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সাংগঠনিক ও সামরিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। এ সময় গঠিত হয় মুজিব বাহিনী, যার সঙ্গে নিউক্লিয়াসের রাজনৈতিক ধারার নেতাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
আব্দুল কুদ্দুস মাখনও মুক্তিযুদ্ধকালীন সংগঠক ও নেতৃত্বের ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্বাধীনতার লক্ষ্যে তরুণদের সংগঠিত করা, রাজনৈতিক কর্মীদের সক্রিয় রাখা এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তৎকালীন ছাত্রনেতাদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মুক্তিযুদ্ধ শুধু সম্মুখসমরের লড়াই ছিল না; এটি ছিল সংগঠন, নেতৃত্ব, সাহস ও মানুষের সম্মিলিত প্রত্যয়েরও যুদ্ধ। সেই বৃহত্তর সংগ্রামের ইতিহাসে আব্দুল কুদ্দুস মাখনের নামও স্মরণীয়।
‘চার খলিফা’: একটি নামের পেছনে যে ইতিহাস
ছাত্রলীগের রাজনীতিতে ‘চার খলিফা’ পরিচিতিটি কেবল চারজন নেতার ডাকনাম ছিল না; এটি ছিল তাঁদের সাংগঠনিক প্রভাব ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন।
নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, আ স ম আবদুর রব ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন—এই চার নেতা তৎকালীন ছাত্ররাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তাঁদের নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক তৎপরতা অসংখ্য তরুণকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
তাঁদের রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক হিসেবে সিরাজুল আলম খানের নাম বিশেষভাবে আলোচিত। তবে স্বাধীনতার পর সময়ের পরিবর্তনে এই নেতাদের রাজনৈতিক পথ ও অবস্থানও ভিন্ন হয়ে যায়।
ইতিহাসে আব্দুল কুদ্দুস মাখনের অবস্থান
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতি নানা পরিবর্তন, মতপার্থক্য ও বিভাজনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। সেই পরিবর্তনের ভেতর অনেক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা হয়েছে, কেউ বেশি আলোচিত হয়েছেন, কেউ থেকেছেন তুলনামূলক আড়ালে।
আব্দুল কুদ্দুস মাখন তাঁদেরই একজন, যাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, ছাত্ররাজনীতির উত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে।
তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন ছাত্রনেতাকে স্মরণ করা নয়; বরং সেই সময়ের তরুণদের আত্মত্যাগ, সাহস, সংগঠনী শক্তি ও স্বাধীনতার স্বপ্নকে স্মরণ করা।
আব্দুল কুদ্দুস মাখন ছিলেন স্বাধীনতার পথে এগিয়ে চলা এক প্রজন্মের প্রতিনিধি। ইতিহাসের আলোচনায় তাঁর নাম উচ্চারিত হওয়া তাই প্রয়োজন—যাতে নতুন প্রজন্ম জানতে পারে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তির অর্জন নয়; এটি ছিল অসংখ্য মানুষের সংগ্রাম, ত্যাগ ও সম্মিলিত নেতৃত্বের ফসল।
স্বাধীনতার ইতিহাসে আব্দুল কুদ্দুস মাখনের নাম সেই সংগ্রামী অধ্যায়েরই একটি অংশ হয়ে থাকবে।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।