মুঠোফোনে হঠাৎ নেটওয়ার্ক উধাও হয়ে যাওয়াকে কেবল সাময়িক যান্ত্রিক ত্রুটি ভেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এই সুযোগেই আপনার ব্যাংক হিসাব থেকে গায়েব হয়ে যেতে পারে জমানো সব টাকা, হাতছাড়া হতে পারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সব গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ। সাইবার অপরাধের দুনিয়ায় উদ্বেগজনক এই কৌশলের নাম দেওয়া হয়েছে ‘সিম সোয়াপিং’।
সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক চক্রের বিরুদ্ধে সিম সোয়াপিংয়ের মাধ্যমে ৮০ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির অভিযোগ ওঠার পর এই প্রতারণা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কেবল এই কৌশল ব্যবহার করেই গ্রাহকদের প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার খোয়া গেছে। নিরাপত্তা বিষয়ক প্ল্যাটফর্ম নরটন-এর তথ্যের ভিত্তিতে প্রযুক্তিভিত্তিক এক প্রতিবেদনে এসব বিস্তারিত জানানো হয়েছে।
সিম সোয়াপিং মূলত একধরনের জটিল সাইবার প্রতারণা। এ পদ্ধতিতে অপরাধীরা মুঠোফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে ভুল তথ্য দিয়ে ভুক্তভোগীর ব্যবহৃত ফোন নম্বরটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অন্য একটি নতুন সিম কার্ডে স্থানান্তর করে নেয়। এ জন্য অপরাধীরা নম্বরটির প্রকৃত গ্রাহক সেজে মোবাইল অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। অপারেটর যদি পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়টি বুঝতে না পেরে নম্বরটি নতুন সিমে স্থানান্তর করে দেয়, তবে সঙ্গে সঙ্গেই গ্রাহকের পুরোনো সিমটি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
এর ফলে গ্রাহকের ওই নম্বরে আসা সব ফোনকল, খুদে বার্তা (এসএমএস) এবং বিভিন্ন ব্যাংক বা অনলাইন অ্যাকাউন্টে প্রবেশের ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ডের (ওটিপি) সরাসরি নিয়ন্ত্রণ চলে যায় প্রতারকদের হাতে।
এই প্রতারণা প্রক্রিয়াটি প্রধানত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন করা হয়। প্রথম ধাপে প্রতারকেরা বিভিন্ন ফিশিং লিংক, ম্যালওয়্যার আক্রমণ কিংবা ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ কৌশল খাটিয়ে ভুক্তভোগীর নাম, জন্ম তারিখ, জাতীয় পরিচয়পত্র বা সংবেদনশীল অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে। এমনকি কোনো প্রতিষ্ঠানের ডেটাবেজ থেকে তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও এসব গোপন বিবরণ অপরাধীদের হাতে পৌঁছে যায়।
দ্বিতীয় ধাপে, সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে প্রতারকেরা গ্রাহক সেবাকেন্দ্রে বা মোবাইল অপারেটরের সঙ্গে ভুক্তভোগী গ্রাহক সেজে যোগাযোগ করে। তারা ফোন হারিয়ে যাওয়া বা সিম নষ্ট হওয়ার মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে নম্বরটি নতুন একটি খালি সিমে স্থানান্তরের অনুরোধ জানায়। অপারেটরের পরিচয় যাচাই প্রক্রিয়া যদি ত্রুটিপূর্ণ হয়, তবে নম্বরটি অপরাধীদের নতুন সিমে হস্তান্তরিত হয়ে যায়।
পরবর্তী ধাপে, নতুন নম্বরটি চালু হওয়ামাত্রই আসল গ্রাহকের ফোনের নেটওয়ার্ক উধাও হয়ে যায় এবং অপরাধীর হ্যান্ডসেটে ভুক্তভোগীর সব কল ও খুদে বার্তা আসতে শুরু করে।
সর্বশেষ ধাপে অপরাধীরা ব্যাংক হিসাব, ই-মেইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘ফরগট পাসওয়ার্ড’ অপশনটি ব্যবহার করে। ফোনে আসা ওটিপি বা টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (২এফএ) কোড ব্যবহার করে তারা অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা স্তর ভেঙে সহজে ভেতরে ঢোকে। এরপর পাসওয়ার্ড দ্রুত বদলে দিয়ে মূল ব্যবহারকারীকে অ্যাকাউন্ট থেকে বিচ্ছিন্ন করে অর্থ ও গোপনীয় তথ্য হাতিয়ে নেয়।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।