
আশুরার দিন (১০ মুহাররম) ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। এই দিনে নবী হযরত মূসা (আ.) ফেরাউন থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, হযরত নূহ (আ.)-এর নৌকা তূর পর্বতের গিরিপথে থেমেছিল।
এই দিনে হযরত হুসাইন (রাঃ) এর শাহাদাতের ঘটনাও সংঘটিত হয়েছে, যা মুসলমানদের হৃদয়কে শোকাহত করে। এছাড়াও আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল।
তবে এ দিনকে কেন্দ্র করে কিছু বিদআতি ও গর্হিত কাজ সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে, যা ইসলামী শরিয়তের পরিপন্থী।
আশুরার দিনে যেসব কাজ গর্হিত বা বর্জনীয়:
১. বিলাপ, মাতম ও নিজেকে আঘাত করা :
অনেকে হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের শোক প্রকাশ করতে গিয়ে মুখে চিৎকার, বুক চাপড়ানো, শরীর রক্তাক্ত করা, তাজিয়া মিছিল ইত্যাদি করে থাকেন।
এব্যাপারে শরয়ী অবস্থান হলো :
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি গালে আঘাত করে, কাপড় ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহেলিয়াতের মতো আহাজারি করে।
সহীহ বুখারী: ১২৯৭, সহীহ মুসলিম: ১০৩
২. আশুরার দিন শোক পালন বা কালো কাপড় পরা :
অনেকে আশুরার দিন শোকের প্রতীক হিসেবে কালো কাপড় পরেন, বিষাদময় পরিবেশ তৈরি করেন।
এব্যাপারে শরয়ী অবস্থান হলো :
ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট দিনকে শোক দিবস বানানো বা প্রতীকী রঙে শোক পালন করার বিধান নেই। হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতে শোক করা হোক বা অন্য কোনো ঘটনায়—শোক পালনের নির্দিষ্ট দিন ও পদ্ধতি শরিয়তে অনুমোদিত নয়।
৩. আশুরার দিনে হালুয়া-রুটি বা বিশেষ খাবার রান্না :
অনেকেই বিশ্বাস করেন, আশুরার দিন হালুয়া বা বিশেষ রান্না করলে বরকত আসে।
এব্যাপারে শরয়ী অবস্থান হলো :
এমন কোনো হাদীস নেই যা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আশুরার দিন হালুয়া রান্না বা বিশেষ খাবার খাওয়া বরকতপূর্ণ কাজ।
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.) বলেন: আশুরার দিনে রান্না করা, প্রসাধন করা, অতিথি আপ্যায়ন করা ইত্যাদি কোনো কিছুই রাসূল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত নয়।
আল-ফাতাওয়াল কুবরা: ২/২৫৭
৪. গোসল, সুরমা, ও বিশেষ প্রসাধন ব্যবহার :
কেউ কেউ মনে করেন, আশুরার দিনে গোসল করলে বা সুরমা দিলে সারা বছর রোগব্যাধি থেকে মুক্ত থাকা যায়।
এব্যাপারে শরয়ী অবস্থান হলো :
এমন বিশ্বাস ও কাজ ভিত্তিহীন ও কুসংস্কারপূর্ণ। এই বিষয়ে কোনো সহীহ হাদীস নেই।
৫. সাহাবায়ে কেরাম বা আহলে বাইতের কাউকে গালি দেওয়া বা একপক্ষকে হেয় করা :
কেউ আহলে বাইতের নামে বাড়াবাড়ি করে সাহাবাদের (বিশেষ করে মুয়াবিয়া রা.) গালি দেয়।
এব্যাপারে শরয়ী অবস্থান হলো :
সকল সাহাবার প্রতি সম্মান রাখা ঈমানের অংশ।
রাসূল ﷺ বলেছেন : আমার সাহাবাদের গালি দিয়ো না।
সহীহ বুখারী: ৩৬৭৩
৬. আশুরার দিনকে উৎসব ও আনন্দের দিন বানানো :
শিয়াদের অতিরিক্ত শোকের প্রতিক্রিয়ায় কেউ কেউ আশুরাকে ‘আনন্দ ও উৎসবের দিন’ বানানোর চেষ্টা করে থাকেন।
এব্যাপারে শরয়ী অবস্থান হলো :
রাসূল ﷺ কেবল রোজা রাখার কথা বলেছেন, উৎসব বা আনন্দ উদযাপনের নয়।
প্রকৃত করণীয় হলো : রোজা রাখা –
আশুরার প্রকৃত আমল হলো রোজা রাখা।
রাসূল ﷺ বলেন: আশুরার রোজার ব্যাপারে আমি আশা করি, আল্লাহ তা’আলা এর মাধ্যমে এক বছর আগের গুনাহ মাফ করে দিবেন।
সহীহ মুসলিম: ১১৬২
তিনি আরও বলেন: তোমরা আশুরার দিনে রোজা রাখো এবং এর আগে বা পরে আরেক দিন রোজা রাখো।
মুসনাদ আহমদ: ২১৫৪
উপসংহার:
আশুরার দিনটি ফজিলতপূর্ণ হলেও, এর সাথে যুক্ত কুসংস্কার, বিদআত ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকা প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য। আসুন, আমরা শরিয়ত অনুযায়ী এ দিনের মর্যাদা রক্ষা করি।
সংকলক : দেলোয়ার হোসাইন মাহদী
আলেম, সাংবাদিক
islamicreports@gmail.com
