হারানো দিনের বিয়ের গীত সংরক্ষণ করেন শিক্ষক লাকি ফেরদৌসী

হারানো দিনের বিয়ের গীত সংরক্ষণ করেন শিক্ষক লাকি ফেরদৌসী
হারানো দিনের বিয়ের গীত সংরক্ষণ করেন শিক্ষক লাকি ফেরদৌসী
সংবাদটি শেয়ার করুনছবি, শিরোনাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণসহ
Facebook WhatsApp X Telegram

ফয়সল আহমেদ খান , (বাঞ্ছারামপুর) : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের পাড়াতুলি গ্রামে বসবাস শিক্ষক ফেরদৌসী লাকির। সারা জীবন শিক্ষকতা করে সদ্য অবসর নিয়েছেন তিনি। শুধু শিক্ষকতাই নয় সংস্কৃতি প্রতি তার রয়েছে গভীর এক আকর্ষণ। আবৃত্তি, সংগীত থেকে শুরু করে লোকসাহিত্যের চর্চা করেন সব সময়। হারানো সংস্কৃতি রক্ষায়ও রেখে চলছেন অবদান। এক সময়কার হারিয়ে যাওয়া লোক ঐহিত্য বিয়ের গীত খুব সযতনে সংরক্ষণ করছেন তিনি।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিয়ের গীত সংগ্রহ করেছেন তিনি। লোক মুখে শুনে শুনে লিখে রেখেছেন এই গীত। বয়স্ক মানুষদের কাছ থেকে তুলে এনেছেন হারিয়ে যাওয়া বিয়ের গল্প আর তখনকার সংস্কৃতি।

এসব লোকগাঁথা সংগ্রহে প্রায় হাজার খানেক বাড়িতে ঘুরেছেন লাকি ফেরদৌসী। এমন সব অভিজ্ঞতা আর গীত নিয়ে লিখেছেন বই। এতে স্থান পেয়েছে ৬৮ টি গীত।

সরেজমিনে লাকি ফেরদৌসীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় গুনগুনিয়ে গাইছেন কিছু একটা। জিজ্ঞাসা করতেই বলে ওঠেন এগুলো বিয়ের গীত। তিনি বলেন, এই গীত তো এক সময় হারিয়ে যাবে। এর রক্ষা করবে কে? এই প্রজন্ম গীত কি জিনিস জানে না। এভাবে চলতে থাকলে আমরা তো শেকড়হীন হয়ে পড়বো। দিশেহারা হয়ে যাবে আমাদের আগামীর সন্তানরা।

 

বাড়ি বাড়ি ঘুরে কেন এই গীত সংগ্রহ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একদিন স্কুলে যাওয়ার সময় উচ্চস্বরে গান বাজছিল। সহ্য করার মতো ছিল না। হঠাৎ মনে পড়লো আগেরকার কিছু স্মৃতির কথা। একটা সময় আমরা বিয়ে বাড়িতে গিয়ে মুরুব্বিদের সঙ্গে গীত গাইতাম। সপ্তাহ জুড়ে ছিল নির্মল আনন্দের বন্যা। সেই উৎসবে কারো কোনো অসুবিধা হতো না। সবার প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ ছিল। তখনই ভাবলাম এই প্রজন্ম আসলে করছেটা কি! তাদেরকে অতীতের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার না জানাতে পারলে তো জানবে না। পরদিনই সিন্ধান্ত নিলাম বাড়ি বাড়ি গিয়ে হারিয়ে যাওয়া গীত শুনবো আর লিখে রাখবো যাতে হারিয়ে না যায়।’

 

হারানো দিনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে ফেরদৌসী লাকি জানান আগের দিনের বিয়েতে বর-কনেকে সুন্দর কথামালার সাবলীল সুরের গীতে আশীর্বাদ করা হতো। এখন আকাশ সংস্কৃতির কারণে আড়ালে পড়ে গেছে সেই সুন্দর মুহূর্ত। বিয়ে বাড়িতে উচ্চ শব্দে বাজানো গান এখন অনেকের ক্ষতির কারণ। অসুস্থ মানুষ, বয়স্ক, শিশুরা এই ভোগান্তির শিকার। মানুষের বোধোদয় জরুরি।

 

তরুণ প্রজন্মকে আগের সেই নির্মল আনন্দে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

লাকি ফেরদৌসী যাদের কাছে এই গীত সংগ্রহ করেছেন প্রতিবেদকের কথা হয় তাদের কয়েকজনের সঙ্গে। এরমধ্যে হাফসাতুন্নেসা নামে একজন বলেন, আগের দিনের বিয়েতে ১৫ দিন আগে থেকেই একটা আমেজে থাকতাম আমরা। গীতের সুরে সবাই বিমোহিত হতো। মা-চাচিরা মিলে একসঙ্গে গীত গাইলে পারস্পরিক বোঝাপড়াও হতো। এখন আর সেই দিন নেই। সবাই যার যার মতো। পড়শিদের অনেকেই জানায় না বিয়ের কথা। হুটহাট বিকট শব্দে বাজা সাউন্ড শুনেই বুঝতে হয় বিয়ে যে হচ্ছে। এতে আমাদের শারীরিক-মানসিক কষ্ট হয়।

 

হারিয়ে যাওয়া এমন সংস্কৃতি ফিরে পেতে চান অনেকেই। আর তাইতো হারানো দিনের কথায় লাকি ফেরদৌসীর এমন কাজকে স্বাগত জানিয়েছে স্থানীয়রা। সুধী মহলেও প্রশংসা কুড়াচ্ছেন এই সংস্কৃতি প্রেমী।

স্থানীয়রা বলছেন, আমাদের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছেন লাকি ফেরদৌসী। অতীতের মধুময় দিনগুলোতে ফিরে যাওয়া হচ্ছে। সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা খুব বেশি প্রয়োজন আমাদের এই সমাজে। এই কাজটিই করে চলছেন লাকি। সময়ের পরিবর্তনে শিকড় হারিয়ে না যাক এটাই আমাদের চাওয়া।

পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ