
ভাষাগত বৈচিত্র্য, আন্তঃসাংস্কৃতিক বোঝাপড়া এবং বৈশ্বিক সম্প্রীতির লক্ষ্যে আম্মাম ট্রাস্ট ও আম্মাম একাডেমির যৌথ উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী একটি ব্যতিক্রমধর্মী “ খেলাই পড়া: খেলতে খেলতে বহুভাষা শিখুন”কর্মশালা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কর্মশালাটি ৩০ এপ্রিল থেকে ২ মে ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিদিন ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত ব্যতিক্রমধর্মী সংস্কৃতি কেন্দ্র ঋদ্ধি’র স্টুডিও হলে অনুষ্ঠিত হয়। “খেলাই পড়া”ধারণাটি এমন একটি শিক্ষাপদ্ধতি, যেখানে শেখা আর খেলা একসাথে মিশে যায়। এই কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীগণ ডিজিটাল কোকেনের আসক্তি ও মোবাইল মনিটর থেকে সাময়িক দূরে থাকতে পেরে স্বস্তি অনুভব করেছে; এমন বোধ হলো যেন, তাঁদের মন ও চোখ ডিজিটাল সুনামী থেকে মুক্তি পেয়ে আকাশে উঁকি দেয়া তালগাছটির নিচে বসে দু’দন্ড শান্তি পেয়েছে । কর্মশালাটিতে চাপমুক্ত পরিবেশে ক্যারম, লুডু, দাবা, ডার্ট ও কার্ড গেমের মতো পরিচিত খেলাগুলোর মাধ্যমে সহজে ও আনন্দের সাথে একাধিক ভাষার ১০০ (একশত) টি মৌলিক শব্দভাণ্ডার শিখেছে। প্রতিটি খেলাকে এমনভাবে রূপান্তর করা হয়, যাতে শব্দ, বাক্য ও যোগাযোগ দক্ষতা স্বাভাবিকভাবে চর্চা হয়—যেমন চাল দেওয়ার সময় শব্দ বলা, জেতার জন্য ভাষাগত চ্যালেঞ্জ সম্পন্ন করা, বা দলগতভাবে ভাষা-ভিত্তিক অনুশীলন করা। শিশু থেকে বয়স্ক, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই খেলতে খেলতে শৈশবের উচ্ছ্বাসে ছুটাছুটি ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ভোকাব্যুলারি শিখেছে; শেখার ভয় দূর হয়ে ভাষা শেখা হয়ে ওঠে অংশগ্রহণমূলক, আনন্দময় এবং স্বতঃস্ফূর্ত। এই কর্মশালায় কবি আনিস মুহম্মদ কর্তৃক উদ্ভাবিত আনিস মুহম্মদ মেটা অ্যাকুইজিশন মডেল (আম্মাম) উপস্থাপন করা হয়, যা ভাষা শিক্ষায় এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে। এই মডেলের মূল বৈশিষ্ট্য হলো—পড়ার বদলে খেলার মাধ্যমে ভাষা শিক্ষা। পরিচিত খেলাগুলোকে ইন্টারঅ্যাকটিভ ভাষা শিক্ষার টুলে রূপান্তর করে শেখার প্রক্রিয়াকে সহজ, আকর্ষণীয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা হয়েছে। কর্মশালায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ ছিল। ৩ দিন ধরে ১০০ টি মৌলিক শব্দ শেখানো হয়। ৮ জন শিক্ষার্থী এবং ৮ জন অভিভাবক-শিক্ষক নিয়ে লাইভ ডেমোনস্ট্রেশন করা হয়। এছাড়া অডিও-ভিজ্যুয়াল, গেম, রোল-প্লে ও মিউজিকের মাধ্যমে শেখানোর পদ্ধতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল। কবি আনিস মুহম্মদ নিজে হাতে প্রশিক্ষণার্থীদের অংশগ্রহণে ক্যারম, দাবা, লুডু ও ডার্ট বোর্ড ব্যবহার করে বহুভাষা শেখার বাস্তব প্রদর্শনী করেন, যা উপস্থিত সকলকে মুগ্ধ করে। আম্মাম মডেলের দর্শন অনুযায়ী প্রতিটি শিক্ষার্থী মোট ছয়টি ভাষা; মাতৃভাষার পাশাপাশি একটি আঞ্চলিক ভাষা, একটি নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা, ইংরেজি ভাষা, একটি জাতিসংঘের ভাষা এবং একটি অতিরিক্ত বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ পায়। এই মডেলের মূল লক্ষ্য— “ভাষা বৈচিত্র্য কোনো বাধা নয়, বরং শান্তি, অন্তর্ভুক্তি, কর্মসংস্থান ও বৈশ্বিক সম্প্রীতির
পথ।” প্রধান অতিথি অধ্যাপক আহমেদ রেজা বলেন, “বর্তমান বিশ্বে ভাষা শিক্ষা কেবল একটি দক্ষতা নয়, এটি একটি সামাজিক প্রয়োজন। আম্মাম মডেল ভাষা শিক্ষাকে সহজ, আনন্দময় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পর্যায়ে নিয়ে এসেছে, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।” তিনি আরও বলেন, এই উদ্যোগ বিশ্বচিন্তায় প্রতিষ্ঠিত ভাষা-দর্শনের বাস্তব প্রয়োগ—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী, আই এ রিচার্ডস, সি কে ওগডেন, নোয়াম চমস্কি, মিশেল ফুকো এবং ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষা ভাবনার সাথে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। উদ্বোধক জাকিয়া শিশির বলেন, “ভাষা মানুষের পরিচয়ের মূল ভিত্তি, আর খেলার মাধ্যমে শেখা শিশুদের জন্য একটি নতুন ও কার্যকর পথ। তিনি আম্মাম মডেলকে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান, সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং সৃজনশীলতার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেন। অধ্যাপক ড. প্রশান্ত হাওলাদার বলেন, “গ্লোবালাইজেশনের যুগে ভাষা হলো কৌশলগত সম্পদ । আম্মাম মডেল কেবল ভাষা শেখায় না, এটি ভবিষ্যতের শ্রমবাজার, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য একটি প্রস্তুতিমূলক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে।” অধ্যাপক ড. সামিউল হক বলেন, “ভাষা ও সংস্কৃতি অবিচ্ছেদ্য। -২/২- এই মডেল ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জ্ঞান বিনিময়ের নতুন দ্বার উন্মোচন করছে। এটি গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।” সঙ্গীত সাধক ইলোরা আজমি বলেন, “সঙ্গীত, ছন্দ ও খেলার মাধ্যমে ভাষা শেখা মানুষের মস্তিষ্কে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। আম্মাম পদ্ধতিতে এই তিনটির সমন্বয় শেখাকে শুধু কার্যকরই নয়, আনন্দদায়কও করেছে। এটি শিশুদের সৃজনশীলতা ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।” এই পদ্ধতিতে যে কোন বয়সী শিক্ষার্থীর ইন্দ্রিয়সমূহ অবচেতনে ভাষা ভাণ্ডার সমন্বিতভাবে স্থায়ী স্মৃতিতে সংরক্ষণে রাখে এবং শিক্ষার্থীর লেখা, পড়া, শোনা ও বলার প্রয়োজনে স্মৃতি তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে শব্দভান্ডার সরবরাহ করে। কর্মশালায় পিস অ্যান্ড হারমোনি ট্রাস্টের প্রেসিডেন্ট রেনেসাঁ আমীর, ট্রাস্টি মো. আবু নাসের, মো. আমিন রুহুল, উম্মে কুলসুম এমি, আলেকজান্দ্রিয়া আমীর, উন্নয়নকর্মী সাদিয়া জেরিন পিয়া ও উন্নয়ন সংগঠক সামসুন্নাহার প্রমুখ গুণীজন অতিথিবৃন্দের সহযোগে স্কুল-মাদ্রাসা-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের (আরিফ হাসান, নুসরাত জাহান, সাকিব আহমেদ, তানজিলা ইসলাম, মাহিন রহমান, সুমাইয়া আক্তার, রাফি হোসেন, লাবিবা নূর, আদনান কবির এবং ফারিহা তাসনিম) সাথে সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন গেম-ভিত্তিক ভাষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে কর্মশালাটিকে প্রাণবন্ত ও আনন্দমুখর রেখেছে। সভাপতি কবি আনিস মুহম্মদ বলেন, “ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়—এটি মানবতার সেতুবন্ধন। খেলতে খেলতে ভাষা শেখার মাধ্যমে আমরা ভয়মুক্ত, সহানুভূতিশীল ও সংযুক্ত একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারি।” অতিথি, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সবাই একসাথে খেলায় অংশগ্রহণ করেন, ফলে পুরো পরিবেশ হয়ে ওঠে আনন্দময় ও অংশগ্রহণমূলক। অংশগ্রহণকারীরা একমত পোষণ করেন যে, এই উদ্যোগ ভাষাগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ, আদিবাসী জ্ঞানব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, আন্তঃসাংস্কৃতিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহ উন্নয়ন এবং জাতীয় ও বৈশ্বিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রকৃতপক্ষে, আম্মাম মডেল একটি নতুন মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আজ ‘খেলাই পড়া’ উদ্যোগ প্রমাণ করেছে — খেলতে খেলতে ভাষা শেখাই হতে পারে দেশীয় ও বৈশ্বিক সম্প্রীতি, সাংস্কৃতিক সহনশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির শক্তিশালী ভিত্তি। বিশিষ্ট আবৃত্তিজন সানজিদা স্নিগ্ধা’র কণ্ঠে কবি বন্দে আলী মিয়া’র কবিতা ‘আমাদের গ্রাম’ পরিবেশনা ও ছায়ানটের নৃত্য-প্রশিক্ষণার্থী আলেকজান্দ্রিয়া আমীরের মনোমুগ্ধকর ভরতনট্যম নাচের পর গ্রুপ ছবি ধারণশেষে সভাপতির ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে কর্মশালাটি সমাপ্ত হয়। এই প্রেক্ষিতে, আমরা বিশ্বাস করি, আপনার মিডিয়ায় প্রেস রিলিজটির প্রচার এই উদ্ভাবনী শিক্ষামূলক উদ্যোগকে বৃহত্তর জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আপনার সদয় সহযোগিতা ও ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার প্রত্যাশায় রইলাম।
