
প্রতিভা যখন সঠিক পরিচর্যা পায়, তখনই আলো ছড়ায় চারদিকে। শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশের বহু প্রত্যাশার মঞ্চ ‘নতুন কুঁড়ি’ সেই আলোয় প্রতি বছরই সমৃদ্ধ হয়। দীর্ঘ দুই দশক পর নতুন উদ্যমে আয়োজিত এবারের আসরেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রতিযোগীদের মধ্যে রংপুর বিভাগের শিশুশিল্পীরা দারুণভাবে নিজেদের মেলে ধরেছে। মোট ৭৩ জন পুরস্কারজয়ীর মধ্যে ৯ জনই রংপুর বিভাগের। প্রথম স্থান অর্জন করেছে চারজন।
গল্পবলায় প্রথম ফাইরুজ বারী মালিহাঃ রংপুর সদরের ফাইরুজ বারী মালিহা গল্পবলাতে ‘খ’ শাখায় প্রথম হয়েছে। রংপুর পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মালিহা জাতীয় পর্যায়ে এর আগেও বেশ কয়েকবার সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। ২০১৮ সালের জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় আবৃত্তিতে তৃতীয়, ২০১৯ সালে অভিনয়ে ও বিজয় ফুল তৈরি প্রতিযোগিতায় প্রথম, ২০২০ সালে অভিনয়ে আবারও প্রথম হয় সে। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহেও ২০২৩ ও ২০২৪ সালে আবৃত্তি, বক্তৃতা ও অন্যান্য বিষয়ে পুরস্কার পেয়েছে। সাংস্কৃতিক চর্চার পাশাপাশি পড়াশোনাও সমান গুরুত্ব দিয়ে করতে চায় মালিহা।
সাধারণ নৃত্যে সেরা রওজা করিম রোজাঃ রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী রওজা করিম রোজা এবার ‘খ’ বিভাগে সাধারণ নৃত্যে প্রথম হয়েছে। এর আগেও জাতীয় পর্যায়ের নানা প্রতিযোগিতায় সে একের পর এক সাফল্য পেয়েছে। ২০১৯ সালে জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় ‘ভরত নাট্যম’-এ প্রথম, ২০২০ সালে লোকনৃত্যে প্রথম ও সৃজনশীল নৃত্যে তৃতীয় হয়। ২০২১ সালেও দুই ক্যাটাগরিতেই প্রথম স্থান ধরে রাখে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে আয়োজিত জাতীয় নৃত্য প্রতিযোগিতায় ২০২২ সালে প্রথম হয়ে সে নিজের অবস্থান আরও পোক্ত করে। ভবিষ্যতে রোজা একজন দক্ষ নৃত্যশিল্পী হতে চায়।
‘ক’ বিভাগে সাধারণ নৃত্যে সেরা স্পর্শঃ লালমনিরহাটের ঐশর্য জিতা স্পর্শ এবারের নতুন কুঁড়ির ‘ক’ বিভাগে সাধারণ নৃত্যে প্রথম হয়েছে। লালমনিরহাট ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের তৃতীয় শ্রেণির এই শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে জাতীয় পর্যায়ের বেশ কয়েকটি প্রতিযোগিতায় সেরা হয়েছে। ‘বৈশাখের রং লাগাও প্রাণে’ প্রতিযোগিতায় লোকনৃত্যে প্রথম, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নৃত্য প্রতিযোগিতা ২০২২–এ লোকনৃত্য ও সৃজনশীল নৃত্য—উভয় ক্ষেত্রেই সে সেরা। ১৩তম জাতীয় শিশুশিল্পী প্রতিযোগিতা ‘শাপলাকুঁড়ি ২০২৫’-এও ‘ক’ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয় স্পর্শ।
উচ্চাঙ্গ নৃত্যে প্রথম লাবণ্যঃ রংপুর সদরের আদৃতা তাসনিম লাবণ্য ‘ক’ বিভাগে উচ্চাঙ্গ নৃত্যে প্রথম হয়েছে। দ্যা মিলেনিয়াম স্টার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বিতীয় শ্রেণির এই শিক্ষার্থী অল্প বয়সেই নৃত্যচর্চায় মনোযোগী। ভবিষ্যতে শিল্পচর্চা অব্যাহত রাখার ইচ্ছা তার।
আরও পাঁচ শিশুশিল্পীর সাফল্যঃ প্রথমস্থান অধিকারী চারজন ছাড়াও রংপুর বিভাগের আরও পাঁচজন শিশুশিল্পী বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে।
হামদ-নাতে দ্বিতীয়— ঠাকুরগাঁওয়ের তাসবিহা আয়ান তানহা । সাধারণ নৃত্যে দ্বিতীয়ঃ — গাইবান্ধার রাধিকা তাছাল্লুম রিয়ন্তি।সাধারণ নৃত্যে তৃতীয়ঃ— ঠাকুরগাঁওয়ের ইউশা শাহিরা আনুভা। হামদ-নাতে দ্বিতীয়ঃ — পঞ্চগড়ের তাসনিম জাহান। অভিনয়ে তৃতীয়ঃ —রংপুর সদরের মুরাদুস সালিহীন।
২০ বছর পর নতুন উদ্যমঃ অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ও তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মো. মাহফুজ আলমের উদ্যোগে এবারের নতুন কুঁড়ি দীর্ঘ বিরতির পর নতুনভাবে আয়োজন করা হয়। প্রায় ৩৯ হাজার প্রতিযোগী অংশ নেয়।২৪–২৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক পর্বে ১৯টি অঞ্চলের প্রতিযোগীরা অংশ নেয়। সেখান থেকে প্রায় ১৪ হাজার প্রতিযোগী বিভাগীয় পর্বে উন্নীত হয়। আট বিভাগে চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেয় ১ হাজার ৪০ জন। সেরা ১০ পর্ব শেষে ‘ক’ বিভাগে ৩৬ জন এবং ‘খ’ বিভাগে ৩৭ জনকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়। বিচারক ছিলেন মোট ২৯৩ জন। বিটিভির পাশাপাশি অনুষ্ঠানটি ফেসবুক ও ইউটিউব প্রচারের ফলে সারাদেশের শিশু–কিশোররা এতে আরও বেশি উৎসাহ নিয়ে অংশ নেয়।
শিশুশিল্পীদের বড় মঞ্চঃ প্রতিটি শিশুই কিছু না কিছু প্রতিভা নিয়ে জন্মায়। সেই প্রতিভা খুঁজে বের করাই নতুন কুঁড়ির লক্ষ্য। রোজা, স্পর্শ, মালিহা কিংবা লাবণ্যের মতো অসংখ্য শিশুশিল্পীর সাফল্য দেখিয়ে দিয়েছে—দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকেই সৃজনশীলতার আলো ছড়ানো সম্ভব। নতুন কুঁড়ি শুধু প্রতিযোগিতা নয়—এটি শিশুদের জন্য শিল্পযাত্রার প্রথম পাঠশালা, আত্মবিশ্বাসের শেকড়, ভবিষ্যতের মঞ্চে উঠার প্রস্তুতি।
রংপুর বিভাগের ৯ শিশুশিল্পীর এবারের সাফল্য সেই বাস্তবতারই সুন্দর প্রমাণ।
