নাসিরনগর: হাওরের বুকে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি

লেখক: লিটন হোসাইন জিহাদ
প্রকাশ: ১০ মাস আগে
নাসিরনগর। অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক অতীত এবং নীরব সংগ্রামের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে

image 685740 1686698023 1

নাসিরনগরের নামকরণ নিয়ে রয়েছে দুটি প্রচলিত জনশ্রুতি। একদিকে, ইতিহাসের পাতায় উঠে আসে সুলতানি আমলের এক বিখ্যাত সিপাহসালারের সৈয়দ নাসির উদ্দীন এর কথা যিনি ইসলাম প্রচারে এই অঞ্চলে আসেন । তার নামানুসারে এই এলাকার নাম নাসিরনগর রাখা হয়। এ ইউনিয়নের নাম থেকেই প্রথমে থানা এবং পরবর্তীতে নাসিরনগর উপজেলার নামকরণ করা হয়।  অপরদিকে, কেউ কেউ মনে করেন, মোগল আমলের এক প্রভাবশালী দেওয়ান বা প্রশাসকের নাম থেকে এই নামের উৎপত্তি। যদিও এর প্রকৃত উৎস আজো ঐতিহাসিকভাবে নিরূপিত নয়, তবে উভয় মতেই স্পষ্ট, এই জনপদের আত্মপরিচয়ে গভীর এক ঐতিহ্যবাহী অনুরণন রয়েছে।

নাসিরনগরের ইতিহাসে রয়েছে ব্রিটিশ শাসনামলের গভীর ছাপ। জমিদারি শাসন ব্যবস্থা, রাজস্ব আদায়ের ঐতিহ্য, পুলিশি প্রশাসনের সূচনা ইত্যাদি এখানে শুরু হয় ব্রিটিশ শাসনকালেই। ১৯১০ সালে এটি থানায় রূপান্তরিত হয় এবং এখানকার ফৌজদারি প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ১৯৮৩ সালের ১ আগস্ট নাসিরনগর পূর্ণাঙ্গ উপজেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় এটি বর্তমানে ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নাসিরনগরের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। হানাদার বাহিনীর বর্বরতায় নাসিরনগরের অনেক গ্রাম পুড়ে ছারখার হয়, প্রাণ হারান অসংখ্য নিরীহ মানুষ। বিশেষত, গোকর্ণ, চাপড়া, চাতলপাড়, ফান্দাউক ও পূর্বভাগসহ বিভিন্ন এলাকায় গেরিলা যুদ্ধ সংগঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে অনেকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং স্থানীয় যুব সমাজ সংগঠিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ৭ ডিসেম্বর এই জনপদ মুক্ত হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো হয় নাসিরনগরের মাটিতে।

image 685740 1686698023

নাসিরনগরে এখনো বিদ্যমান রয়েছে বহু শতাব্দী পুরনো স্থাপত্য নিদর্শন। গোকর্ণের নবাব বাড়ি, মোগল আমলের স্থাপত্যরীতি বহনকারী মন্দির, ১৭৫ বছরের প্রাচীন জমিদার বাড়ি ও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এখানে রয়েছে। এর প্রতিটি ইটপাথরে মিশে আছে এই জনপদের ইতিহাস, কৃষ্টি ও ঐতিহ্য। মুসলিম, হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সহাবস্থানের দৃষ্টান্তস্বরূপ এসব স্থাপনা আজো সকলকে মুগ্ধ করে।

নাসিরনগরের সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে হাওর, বিল ও নদীনালা। এই ভূ-প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের কারণে বর্ষা মৌসুমে এখানে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। ১৯৭৪ ও ১৯৮৮ সালের বন্যা, ১৯৭১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় এখানকার মানুষকে করেছে চরম দুর্ভোগের শিকার। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখনো প্রায় প্রতি বছর কৃষকরা ফসলহানির শিকার হন। একফসলি জমিতে নির্ভর করে যেসব পরিবার জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের অবস্থা হয় সবচেয়ে শোচনীয়।

নাসিরনগরে শিক্ষার হার এখনো জাতীয় গড়ের নিচে। এখানে বেশ কিছু ডিগ্রি কলেজ, মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেন থাকলেও হাওরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার আলো পৌঁছায়নি এখনো। বর্ষা মৌসুমে নৌকা ছাড়া স্কুলে যাওয়া সম্ভব নয় অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষে। তবে সম্প্রতি কিছু উন্নয়ন প্রকল্প, শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি এবং বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগে কিছুটা উন্নয়ন ঘটেছে।

উপজেলায় একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ ১০টির অধিক ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। তবে জটিল রোগ বা জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর কিংবা ঢাকায় পাঠানোই একমাত্র উপায়। ফলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে।

haripur pothiktv

নাসিরনগরের ভাষায় রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলের প্রভাব। এখানকার ভাষার ধ্বনি, শব্দগঠন ও বাক্যবিন্যাসে এই তিন অঞ্চলের সমন্বয় লক্ষ করা যায়। সাংস্কৃতিক দিক থেকে নাসিরনগর সমৃদ্ধ এক জনপদ। পল্লীগীতি, লোকসংগীত, মুর্শিদী গান, কীর্তন ইত্যাদি লোকজ সংস্কৃতি আজো জীবন্ত রয়েছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, পীর-আউলিয়ার ওরস, নৌকাবাইচ এবং গ্রামীণ মেলাগুলো এখানকার সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

নাসিরনগরের প্রায় ৭১ শতাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ধান, গম, পাট, সরিষা, ডাল, আলু—এই ফসলগুলো এখানকার প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি। কিন্তু হাওরের কারণে জমির উৎপাদন এক মৌসুমেই সীমাবদ্ধ। ফলে কর্মসংস্থান সংকুচিত এবং দারিদ্র্যের হার তুলনামূলক বেশি। নারীরা বোনা-কাটার কাজ এবং গৃহপালিত পশুপালনে যুক্ত থাকলেও তা সামগ্রিক অর্থনীতিতে যথেষ্ট প্রভাব ফেলতে পারেনি। তবে আশার কথা, মাছ চাষ এবং হাঁস পালন অনেক পরিবারে অর্থনৈতিক স্বস্তি আনছে।

খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব

নাসিরনগর শুধু ভৌগোলিক নয়, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এখানকার কিছু খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব হলেন:

১. নবাব সৈয়দ শামসুল হুদা (১৮৬২–১৯২২): গোকর্ণে জন্মগ্রহণকারী এই মনীষী ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মুসলিম প্রেসিডেন্ট, ইম্পিরিয়াল লেজিস্লেটিভ কাউন্সিলের। তিনি কলকাতায় মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

২. সৈয়দ মুর্শেদ কামাল (১৯৪৭–২০১৩): পঞ্চম জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য এবং মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক হিসেবে পরিচিত। তাঁর রাজনৈতিক সচেতনতা ও সমাজসেবার জন্য তিনি নাসিরনগরের গর্ব।

৩. মোহাম্মদ ছায়েদুল হক (১৯৪২–২০১৭): সাত থেকে দশম জাতীয় সংসদের সদস্য এবং সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী। তাঁর দূরদৃষ্টি ও কর্মক্ষমতা নাসিরনগরবাসীকে বারবার স্মরণ করায়।

৪. মোজাম্মেল হক: মুক্তিযোদ্ধা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ সংসদের সদস্য। রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

৫. বদরুদ্দোজা মোঃ ফরহাদ হোসেন: একাদশ জাতীয় সংসদের সদস্য। বর্তমানে নাসিরনগরের রাজনৈতিক নেতৃত্বে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

৬. আব্দুর রসুল: আইনজীবী ও ব্রিটিশ–ভারতের রাজনীতিবিদ। তাঁর পাণ্ডিত্য এবং সামাজিক নেতৃত্ব আজো ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল।

নাসিরনগর শুধুমাত্র একটি উপজেলা নয়; এটি বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এবং সংগ্রামী জনমানুষের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। প্রাচীন মন্দির থেকে শুরু করে আধুনিক রাজনীতিকের অবদান—সব মিলিয়ে নাসিরনগর এক বিস্ময়কর জনপদ। দরকার শুধু যথাযথ পরিকল্পনা, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ এবং সচেতন নেতৃত্ব। তাহলেই হাওরের এই জনপদ হয়ে উঠতে পারে আগামী দিনের এক উজ্জ্বল আলোকস্তম্ভ, যা কেবল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নয়, পুরো বাংলাদেশের জন্যই গৌরবের কারণ হয়ে উঠবে।

লেখক: সাংবাদিক, কবি ও গীতিকার

  • নাসিরনগর
  • নাসিরনগরের ইতিহাস
  • পথিকটিভি
  • লিটন হোসাইন জিহাদ