বিলুপ্তির ছায়ায় সরাইলের গর্ব—গ্রে-হাউন্ড কুকুর: যেখানে ইতিহাস মিশেছে রক্তে, আর সাহস লিখেছে নিজের কাব্য

লেখক: জহির শাহ্ , ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশ: ৯ মাস আগে

একটা সময় ছিল, সরাইলের সন্ধ্যা নেমে এলেই শোনা যেত কুকুরের গর্জন, যেন পাহাড় কাঁপিয়ে উঠে আসা কোন যোদ্ধার শ্বাস—সেই কুকুরের নাম গ্রে-হাউন্ড, কিন্তু এই নাম শুধু নাম না, এটা সরাইলের আত্মপরিচয়, ইতিহাস, সাহস আর শিকারের প্রতিচ্ছবি। এই কুকুরকে কেউ দেখে বলে শেয়ালের মতো, কেউ বলে বাঘের বংশধর—আসলে এই কুকুর নিজের মতোই এক প্রজাতি, এক ইতিহাস, এক আন্দোলন। মুখ শেয়ালের মতো চতুর, কান লম্বা, দুধ-ভাত-মাছ-মাংসের খাদ্যতালিকায় অভিজাত, চোখে যেন চিরজাগ্রত চোর ধরার শপথ।

সরাইলের বীরত্বের অংশ এই কুকুর আজ বিলুপ্তির দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে হাহাকার করছে প্রভুর একটু সহানুভূতির জন্য, সরকারের সামান্য নজরের জন্য। কল্পনার থেকেও রোমাঞ্চকর দুটো কিংবদন্তি ভেসে আসে এখানে—একদিকে এক দেওয়ান নিজের হাতির বিনিময়ে নিয়ে এসেছিলেন এই কুকুর, অন্যদিকে আরেক দেওয়ানের মাদী কুকুরের বাঘের সঙ্গে মিলন! গল্প যেটাই হোক, সত্যটা একটাই—এই কুকুর শিকার করে, পাহারা দেয়, গন্ধ শুঁকে অপরাধী ধরে, ভয়ডর না মানে, পুলিশের ডগ স্কোয়াডে কাজ করে, এমনকি এফবিআই পর্যন্ত এই সরাইলীয় বংশধরকে গ্রহণ করেছে গর্বের সঙ্গে। কিন্তু আজ? আজ সে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের মমতায় বেঁচে আছে, যেমন নোয়াগাঁওয়ের অজিত লাল দাস—যিনি নিজের থাকার ঘরেই ২০টি কুকুর লালন করেন, প্রতিদিন দুধ, মাংস, সাহস আর আত্মত্যাগে বাঁচিয়ে রেখেছেন এক হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকে।

প্রতিদিন তাকে মোকাবেলা করতে হয় চোর-ডাকাতের হুমকি, বাজারের আগুনছোঁয়া দামে খাবার জোগাড়ের যুদ্ধ। বড় কুকুর ৬৫ হাজার, ছোট ২৫ হাজার—এই অঙ্কে বিক্রি হয় যে কুকুর, তার মূল্য আসলে টাকায় নয়, ইতিহাসে, সাহসে, এক জাতির পরিচয়ে। আগে পুরো উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা এই কুকুর আজ গুটিয়ে এসেছে মাত্র দু-একটি ঘরের চৌকাঠে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সরকার কোথায়? রাষ্ট্র কি এই সাহসী প্রাণীটির ইতিহাস বাঁচাতে পারবে না? উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোশারফ হোসাইন বলেন, সরাইলের ঐতিহ্যে গ্রে-হাউন্ড অনস্বীকার্য, তাই একটি প্রজনন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে—কিন্তু পরিকল্পনা নয়, এখন দরকার বিপ্লব; দরকার সেই সিদ্ধান্ত, যা এই কুকুরকে শুধু বাঁচাবে না, বরং নতুন করে পৃথিবীর কাছে সরাইলকে পরিচিত করাবে। কারণ এই কুকুর কেবল পোষা প্রাণী নয়—এ এক জ্যান্ত গল্প, এ এক রক্তমাখা ইতিহাস, এ এক পাহারাদার জাতিসত্তার, যার রক্তে শিকার, whose bark echoes the courage of Bengal. যদি রাষ্ট্র এগিয়ে না আসে, যদি আমাদের বিবেক না জাগে—তবে গ্রে-হাউন্ডের বিলুপ্তি হবে কেবল এক প্রজাতির মৃত্যু নয়, বরং আমাদের এক টুকরো ইতিহাসের অপমৃত্যু। জাগো সরাইল, জাগো বাংলাদেশ—বাঁচাও গ্রে-হাউন্ডকে, বাঁচাও তোমার শেকড়।