শীতের রাতে সূর্যের অপেক্ষা: বেড়ার বাঁধে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন

শীতের রাতে সূর্যের অপেক্ষা: বেড়ার বাঁধে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন
শীতের রাতে সূর্যের অপেক্ষা: বেড়ার বাঁধে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন
সংবাদটি শেয়ার করুনছবি, শিরোনাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণসহ
Facebook WhatsApp X Telegram

 শীতের তীব্রতায় যখন জনপদের মানুষ ঘরের ভেতর লেপ-কম্বলে গা ঢেকে নিশ্চিন্তে ঘুমায়, ঠিক তখনই পাবনার বেড়া উপজেলার বাঁধ এলাকায় আশ্রিত শত শত মানুষ রাত কাটান চরম কষ্ট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। খোলা আকাশের নিচে নদীর হিমেল বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে তাদের রাত পোহাতে হয় ভোরের সূর্যের অপেক্ষায়।

বেড়ার বাঁধে বসবাসকারীদের একমাত্র সম্বল পুরোনো কাঁথা আর ছেঁড়া কাপড়। নেই পর্যাপ্ত লেপ-কম্বল, নেই শীত নিবারণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা। শীতের রাতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছে শিশু, বৃদ্ধ ও নারীরা।

নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে বাঁধে আশ্রয় নেওয়া পাইখন্দ মহল্লার সালেহা খাতুন (৬৮) কাঁপতে কাঁপতে বলেন, ‘বাবা, গায়ে দেওয়ার লেপ-কম্বল কিছুই নাই। একটা কাঁথা দিয়া কি আর এই শীত যায়? সারা রাত ঘুম আসে না। শুধু ভোরের সূর্যের দিকে তাকাইয়া থাকি।

গত এক সপ্তাহ ধরে তাপমাত্রা ক্রমেই কমছে। ভোরের দিকে ঘন কুয়াশা, হিমেল বাতাস আর ঠান্ডা শিশিরে বেড়া উপজেলার চর ও বাঁধ এলাকার জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। নদীঘেঁষা এলাকায় বাতাসের প্রকোপ বেশি হওয়ায় শীতের তীব্রতা আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যার পর থেকেই ঠান্ডা বাড়তে শুরু করে। গভীর রাতে তা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়। অনেক পরিবার বাঁধের ওপর ছেঁড়া ত্রিপল, পলিথিন আর খড় দিয়ে কোনো রকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই বানিয়ে বসবাস করছে। এদের অধিকাংশই যমুনা নদীর ভাঙনে ঘরবাড়ি হারানো মানুষ। একসময় চরে বা নদীতীরবর্তী এলাকায় বসবাস করলেও নদী গিলে নিয়েছে তাদের ভিটেমাটি। উপায় না পেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা আশ্রয় নিয়েছেন বাঁধে।

বাঁধে বসবাসরত অনেকেরই কোনো স্থায়ী ঘর নেই। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কষ্টও বাড়ছে বহুগুণ। দেখা যায়, অনেক শিশু মায়ের কোলে কাঁপছে। শীতের কারণে জ্বর-কাশিসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তারা।

পায়না মহল্লার সাজেদা খাতুন বলেন, ‘বাচ্চাগুলা সারা রাত কান্দে। ঠান্ডায় জ্বর-কাশি ধরছে। চিকিৎসারও কোনো ব্যবস্থা নাই। শীতের কারণে শরীর ব্যথায় অনেকেই হাঁটতেই পারে না।

আশ্রিতরা অভিযোগ করে বলেন, এখনো পর্যন্ত পর্যাপ্ত সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা তারা পাননি। কেউ কেউ স্থানীয়দের কাছ থেকে সামান্য খাবার বা পুরোনো কাপড় পেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। তাদের ভাষায়, ‘শীত আইছে অনেক আগেই, কিন্তু এখনো লেপ-কম্বল পাই নাই। যদি একটা কম্বল পাইতাম, তাইলেই অনেক উপকার হতো।

এদিকে বেড়ার মানবিক সংস্থা হিসেবে পরিচিত ‘শিক্ষার্থী সহযোগিতা সংগঠন’-এর প্রতিষ্ঠাতা মেহেরাব হোসেন জিম বলেন, ‘বাঁধে আশ্রিতসহ বেড়ার শীতার্ত মানুষের জন্য আমরা ৫০০ কম্বল বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছি। চার-পাঁচ দিনের মধ্যেই বিতরণ শুরু করব বলে আশা করছি। তবে শত শত মানুষের চাহিদা মেটানো আমাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সরকারি সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন।

বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুনাল্ট চাকমা বলেন, ‘নদীতীরবর্তী ও বাঁধ এলাকায় অবস্থান করা অসহায় শীতার্ত মানুষের কষ্টের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও নারীদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী এসব মানুষের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হবে।

শীত যতই বাড়ছে, বেড়ার বাঁধে আশ্রিত মানুষের দুর্ভোগও ততটাই বাড়ছে। তাদের একটাই আকুতি—এই শীতে বেঁচে থাকার জন্য অন্তত একটি লেপ-কম্বল ও ন্যূনতম মানবিক সহায়তা।

পাঠকের মতামত

মন্তব্য

আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

পথিক নেটওয়ার্কআমাদের অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম
PothikTV ভিডিও ও লাইভ সম্প্রচার PothikTV সাহিত্য সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লেখকবৃন্দের মঞ্চ PothikTV Marketplace বই ও শিক্ষণ সামগ্রী PothikTV Media Center মিডিয়া সংস্থা ও সেবাসমূহ