“মৌলবাদ” শব্দ : উৎপত্তি, ব্যবহার ও আন্দোলন-প্রতিক্রিয়া

লেখক: দেলোয়ার হোসাইন মাহদী
প্রকাশ: ৮ মাস আগে

“মৌলবাদ” শব্দ : উৎপত্তি, ব্যবহার ও আন্দোলন-প্রতিক্রিয়া

 

মৌলবাদ শব্দের উৎপত্তি :

 

“মৌলবাদ” শব্দটির ইংরেজি রূপ Fundamentalism। এর উৎপত্তি হয় ২০শ শতকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯১০–১৯১৫ সালে একদল খ্রিস্টান ধর্মতাত্ত্বিক “The Fundamentals” নামে গ্রন্থ প্রকাশ করেন, যেখানে বাইবেলের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকে একমাত্র সত্য হিসেবে তুলে ধরা হয়। এই ধারার অনুসারীদের বলা হয় Fundamentalists। অর্থাৎ, শুরুতে মৌলবাদ শব্দটির ব্যবহার ছিল খ্রিস্টান রক্ষণশীলতার ক্ষেত্রে।

 

পরবর্তীতে শব্দটি ইসলামী সমাজে এনে ব্যবহার শুরু হয়। বিশেষ করে শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পশ্চিমা মিডিয়া ইসলামপন্থী আন্দোলন ও শরীয়াভিত্তিক জীবনধারাকে বোঝাতে “Fundamentalist” বা বাংলায় “মৌলবাদী” শব্দ ব্যবহার করতে থাকে।

 

রাজনৈতিক ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যথা :

 

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে “মৌলবাদ” একটি বহুল ব্যবহৃত ট্রাম্প কার্ড। যেমন :

 

– রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা: কোনো দল বা ব্যক্তি ধর্মীয় মূল্যবোধের পক্ষে অবস্থান নিলেই তাকে “মৌলবাদী” আখ্যা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করার মাধ্যমে নিজেদের ফায়দা লোটার চেষ্টা করা হয়ে থাকে।

 

– আন্তর্জাতিক প্রভাব: বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে পশ্চিমা শক্তিগুলো “মৌলবাদ” শব্দকে প্রায়শই “সন্ত্রাসবাদ”-এর সঙ্গে মিশিয়ে মুসলিম সমাজকে হেয়প্রতিপন্ন করে।

 

– মিডিয়া প্রচারণা: অনেক সময় গণমাধ্যম রাজনৈতিক অভ্যন্তরীণ চাপের কারণে ইসলামপন্থী আন্দোলনকে “মৌলবাদী” হিসেবে চিহ্নিত করে, যাতে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়।

 

আন্দোলন ও প্রতিক্রিয়া :

 

“মৌলবাদ” শব্দটি সরাসরি কোনো আন্দোলনের জন্ম না দিলেও এটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে বহু আন্দোলন দমন করা হয়েছে।

 

– ১৯৮০–৯০-এর দশক: বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মসূচিকে “মৌলবাদী আন্দোলন” আখ্যা দিয়ে দমন করা হয়।

 

– ২০১৩ শাপলা চত্বর আন্দোলন: হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচিকে সরকার ও কিছু মিডিয়া “মৌলবাদী তৎপরতা” বলে উল্লেখ করে। তখন এর বিরুদ্ধে ফেসবুক-টুইটারসহ সামাজিক মাধ্যমে তরুণদের বড় একটা অংশ এর প্রতিবাদ জানায়।

 

– ভাস্কর্য বিতর্ক (২০১৭): ঢাকার সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ভাস্কর্য স্থাপনকে কেন্দ্র করে আন্দোলন হয়। এর বিরোধীদের “মৌলবাদী” বলা হয়, তখন এর সমর্থকেরা বলেছিল—এটা সাংস্কৃতিক অধিকার।

 

– ধর্মীয় অধিকার ইস্যু: বিগত সময়গুলোতে নামাজ, আজান বা পোশাকসংক্রান্ত বিরোধে যারা প্রতিবাদ করেছে, তাদেরকেও প্রায়শই “মৌলবাদী” বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

 

এটাকে নিয়ে নেটিজেনদের প্রতিক্রিয়া :

 

একপক্ষ: মনে করে মৌলবাদ সমাজের জন্য সত্যিই হুমকি—কারণ ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করলে সহিংসতা বাড়ে।

 

অন্যপক্ষ: মনে করে “মৌলবাদ” শব্দটি রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা। ধর্মীয় চেতনা বা অধিকার রক্ষার আন্দোলনকে দমন করার জন্যই এই ট্যাগ ব্যবহার করা হয়।

 

মোটকথা :“মৌলবাদ” শব্দটির আসল উৎপত্তি খ্রিস্টান সমাজে হলেও আজ এটি একটি রাজনৈতিক ও প্রচারণার হাতিয়ার। বাংলাদেশে এ শব্দটিকে প্রায়শই ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়—যেখানে প্রকৃত আন্দোলনের চরিত্রকে না দেখে কেবল ট্যাগ লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করা হয়।

 

ফলে “মৌলবাদ” ইস্যু সমাজে বিভাজন তৈরি করেছে, রাজনীতিতে উত্তাপ সৃষ্টি করেছে এবং নেটিজেনদের মধ্যে দীর্ঘ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অথচ শব্দটির প্রকৃত ইতিহাস জানলে বোঝা যায়—এটি মূলত একটি বিবর্তিত রাজনৈতিক অস্ত্র, যার মাধ্যমে মতপ্রকাশ ও ধর্মীয় অধিকারের আন্দোলনকেও কখনো কখনো ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়।

 

সংকলক :

দেলোয়ার হোসাইন মাহদী

islamicreports@gmail.com

  • #মৌলবাদ #Fundamentalism #বাংলাদেশ_রাজনীতি #ধর্ম_ও_সমাজ #মৌলবাদ_বিতর্ক #হেফাজত #ভাস্কর্য_বিতর্ক #নেটিজেন_প্রতিক্রিয়া #রাজনৈতিক_প্রচার