ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মন্দভাগের রেল দুর্ঘটনার ট্র্যাজেডি: ছয় বছর পরও ভয়াল সেই রাতের স্মৃতি ভুলতে পারেনি কেউ
আজ থেকে ঠিক ছয় বছর আগে, ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর—ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মন্দভাগ রেলস্টেশনের কাছে ঘটে গিয়েছিল দেশের অন্যতম ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনা। গভীর রাতে হঠাৎ করেই থেমে গিয়েছিল শত মানুষের জীবন। সেদিন চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস ও ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী তূর্ণা নীশিতা এক্সপ্রেস—দুটি আন্তঃনগর ট্রেন মুখোমুখি সংঘর্ষে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।
মুহূর্তের মধ্যেই মৃত্যু আর আর্তনাদে ভরে ওঠে গোটা এলাকা। ভোররাতের নীরবতা ভেঙে কেবল শোনা যাচ্ছিল আহাজারি, কান্না আর হতভম্ব মানুষের চিৎকার। দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয়রা ছুটে যায় উদ্ধার কাজে, নিজেরা হাতে লাশ টেনে তুলতে থাকে। কেউ খুঁজছে প্রিয়জনের নিথর দেহ, কেউ আবার হাসপাতালের সামনে অপেক্ষায়—হয়তো কোনো অলৌকিক আশার অপেক্ষায়। এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “এতগুলো মরদেহ একসঙ্গে, আর তার মধ্যে কয়েকজন শিশুর নিথর মুখ—আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনে হলে গা শিউরে ওঠে।”

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, উদয়ন এক্সপ্রেস তখন তূর্ণা নীশিতা ট্রেনটিকে সাইড দিচ্ছিল। উদয়নের অর্ধেক বগি অন্য লাইনে ঢোকার পরও বাকি অংশ মূল লাইনে থাকায়, দ্রুতগতির তূর্ণা নীশিতা এসে ধাক্কা দেয় পেছন দিক থেকে। প্রবল আঘাতে দুটি বগি দুমড়ে-মুচড়ে যায়, লাইনচ্যুত হয় একাধিক বগি। তখনই প্রাণ হারান অন্তত ১৬ জন যাত্রী, আহত হন শতাধিক মানুষ। দুর্ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় ভয়াবহ সব চিত্র—রক্তে ভেজা ট্রেনের ভেতর, ছিন্নবিচ্ছিন্ন আসন আর ছড়িয়ে থাকা লাগেজ। উদ্ধারকর্মীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাশ তোলার কাজ চালিয়ে যান।
আহতদের অনেকেই আজও শারীরিক ও মানসিকভাবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেননি। নিহতদের স্বজনরা এখনো প্রতি বছর এই দিনে এসে প্রিয়জনদের স্মরণ করেন। কসবার মন্দভাগ রেলস্টেশনের কাছে স্থাপিত সেই স্মৃতিস্তম্ভটি আজও নিঃশব্দে সাক্ষী হয়ে আছে এক বেদনাময় ঘটনার। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, “ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও সেদিনের সেই কান্না, রক্ত আর মৃত্যুর গন্ধ যেন এখনো বাতাসে ভাসে।”
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পরে তদন্তে মানবিক ভুল ও যোগাযোগ ঘাটতিকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করলেও, দুর্ঘটনার পূর্ণ প্রতিকার আজও হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, এ ধরনের ট্র্যাজেডি রোধে রেল যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সংকেত ব্যবস্থার উন্নয়ন ও কর্মকর্তাদের সচেতনতা জরুরি। ছয় বছর পরও ২০১৯ সালের সেই ভয়াল রাতটি স্মরণ করলে আজও কাঁপে মন্দভাগের মানুষ—যেন সময় সেখানে থেমে আছে চিরদিনের জন্য।
