করোনা মহামারির সেই আঁধার ঘেরা দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও গা শিউরে ওঠে। সালটা তখন ২০২১। বৈশ্বিক মহামারির প্রভাবে পুরো দেশ স্থবির, আর আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চিত্রটাও ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ।
বাতাসে ভেসে বেড়াত শুধুই ভয়, অনিশ্চয়তা আর প্রিয়জন হারানোর হাহাকার। শহরের তিতাস পাড় থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের মেঠোপথ—সর্বত্র ছিল এক থমথমে নীরবতা।
সরকারি বিধিনিষেধ, লকডাউন আর প্রতিদিনের মৃত্যুর মিছিলের খবরে থমকে গিয়েছিল স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সেই কঠিন সময়ে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল—পরিস্থিতি যেভাবেই হোক না কেন, টিকে থাকার লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের সহনশীলতা ও অভিজ্ঞতা ছিল শিক্ষার সবচেয়ে বড় পাঠশালা।
সরকারি নির্দেশনা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়া কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করেছিল, তা জানা যাচ্ছিল সাধারণ মানুষের জীবনের গল্পগুলো থেকেই।
দিনমজুর, রিকশাচালক আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য লড়াইটা ছিল দ্বিমুখী—একদিকে ভাইরাসের ভয়, অন্যদিকে পেটের ক্ষুধা। টিএ রোড বা কাউতলী মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রমজীবী মানুষদের সঙ্গে কথা বললে ফুটে উঠত এক নির্মম বাস্তবতা।
শহরের এক রিকশাচালক আকুতি ঝরানো গলায় বলেছিলেন, “ভাইরাস থাইকাও বড় ভয় তো পেটের ক্ষুধা। কামকামাই বন্ধ থাকলে পোলাপাইন লইয়া খামু কী?” খেটে খাওয়া মানুষের এই সাধারণ কথাটির ভেতরেই লুকিয়ে ছিল তখনকার আসল সংগ্রাম।
তবে লড়াইটা শুধু অভাবের ছিল না, ছিল বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছার। সাধারণ মানুষ নিজেদের মতো করে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
অল্প আয়ে সংসার চালানো, পরিচিতদের কাছ থেকে সাহায্য নেওয়া আর পাড়া-মহল্লায় নিজেদের মধ্যে খাবার ভাগাভাগি করে নেওয়ার যে দৃশ্যগুলো দেখা গেছে, তা ছিল মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ।
হাসপাতালগুলোতে যখন অক্সিজেন সিলিন্ডারের তীব্র সংকট, তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তরুণ সমাজ ও স্থানীয় সাধারণ মানুষ যেভাবে এগিয়ে এসেছিল, তা ছিল সত্যি প্রশংসনীয়।
বিভিন্ন মহল্লায় তরুণরা নিজেদের উদ্যোগে ফ্রিতে অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়া এবং সামর্থ্যবানরা নীরবে দুস্থদের ঘরে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেছেন।
সাধারণ মানুষের মুখ থেকেই শোনা যেত কীভাবে আলেম-ওলামা, স্থানীয় ছাত্র ও স্বেচ্ছাসেবকরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তিদের দাফন-কাফনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।
চরম ভীতি ও সামাজিক দূরত্বের মধ্যেও এই আত্মত্যাগই ছিল মহামারি মোকাবিলার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
শহরাঞ্চলের বাইরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গ্রামগুলোতে সংকট মোকাবিলার ধরণ ছিল কিছুটা ভিন্ন।
যখন আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছিল, তখন সাধারণ মানুষ নিজেদের মতো করে সচেতনতা তৈরি করেছিল।
আদা-চা, গরম পানির ভাপ আর লবঙ্গ-তুলসীর ব্যবহার প্রাত্যহিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের এই ঘরোয়া যত্ন ও মানসিক মনোবল রোগীদের সেরে উঠতে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল।
২০২১ সালের সেই ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতি আমাদের শিখিয়েছিল যে, কোনো বড় বিপর্যয় কেবল প্রশাসনিক নির্দেশনায় মোকাবিলা করা যায় না। আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে সাধারণ মানুষের ঐক্যে, সহনশীলতায় এবং পারস্পরিক ভালোবাসায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাধারণ মানুষ সেদিন কেবল মহামারির সঙ্গে যুদ্ধই করেনি, বরং প্রতিকূলতার মুখে কীভাবে মানবিকতা বজায় রাখতে হয়, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।
সেই স্মৃতির দিনগুলো আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—যত বড় সংকটই আসুক না কেন, মানুষের ঐক্য ও দৃঢ় মনোবলই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়।
এই নতুন খসড়াটি কি আপনার মনের মতো হয়েছে, নাকি এতে আরও কোনো পরিবর্তন প্রয়োজন?

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।