আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১:৫০ অপরাহ্ন
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তার ওপর আগের মতো আর ভরসা করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা। এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেনকে সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং নিজেদের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে ইউরোপকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘যুদ্ধ অর্থনীতি’ বা ওয়ার ইকোনমি গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে। সম্প্রতি ফরেইন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একজন ফেলোর বিশ্লেষণে এই তাগিদ তুলে ধরা হয়।
বিশ্লেষণে বলা হয়, বিগত সাড়ে চার বছর ধরে ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপের অর্থনৈতিক সম্পদ ও রাজনৈতিক ঐক্যকে বড় পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিয়েভের জন্য একটি প্রতিকূল সমঝোতা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং মার্কিন সহায়তা প্রত্যাহারের হুমকি দিচ্ছেন। ফলে ইউক্রেনকে রক্ষা ও ইউরোপের নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পুরো দায়িত্ব এখন ইউরোপেরই কাঁধে এসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) যৌথ ঋণ গ্রহণের স্থায়ী কাঠামো তৈরির তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কভিড-১৯ মহামারীর সময় ইইউ যেভাবে ৭৫০ বিলিয়ন ইউরোর ‘নেক্সট জেনারেশন ইইউ’ ফান্ড তৈরি করেছিল, ঠিক একইভাবে প্রতিরক্ষা শিল্প ও নতুন প্রযুক্তি অর্থায়নে যৌথ বন্ড বা ঋণ গ্রহণ ব্যবস্থা চালু করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে করে মার্কিন প্রযুক্তির ওপর ইউরোপের নির্ভরতা কমবে।
বর্তমানে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগের ক্ষেত্রে স্পেসএক্সের স্টারলিংক নেটওয়ার্কের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হচ্ছে, যা কেবল এক ব্যক্তির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। ইউরোপ যদি নিজস্ব মূলধন বাজার ও তহবিল গঠন করতে পারে, তবে তারা নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়ন ও ক্রয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবে।
ইউরোপে রাশিয়ার অবরুদ্ধ বা ফ্রিজ করা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বেলজিয়ামের ইউরো ক্লিয়ারে থাকা এই সম্পদের আইনি জটিলতা ও রাশিয়ার পাল্টা ব্যবস্থার ভয়ে অনেকেই এটি ব্যবহারে ইতস্তত করছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপীয় ব্লক যৌথভাবে এই ঝুঁকি ভাগ করে নিলে বিশাল এই অর্থ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যবহার করা সম্ভব।
পাশাপাশি ইউরোপের যেসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক এখনো রাশিয়ার সাথে আর্থিক লেনদেন বা আইনি সম্পর্কের সুযোগ পাচ্ছে, সেগুলোর ওপর কঠোর নজরদারির আহ্বান জানানো হয়েছে। যেমন অস্ট্রিয়ার রাইফাইসেন ব্যাংকের রাশিয়ান অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের অর্থ বাজেয়াপ্ত এবং তার ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত আইনি জটিলতা মস্কোর জন্য ইউরোপকে চাপ দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। এসব আর্থিক ফাঁকফোকর বন্ধ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে ইউরোপকে আরও কঠোর ভূমিকা পালনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যেসব বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান বা দেশ রাশিয়াকে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করছে, তাদের ইউরোপীয় আর্থিক বাজারে প্রবেশাধিকার বন্ধ করার মতো গৌণ বা সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের পরিবর্তনের সুযোগে ইউরোপকে নিজেদের অবস্থান জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়েছে। সম্প্রতি সৌদি আরবে হুথিদের হামলা মোকাবেলায় যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স তাদের বিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা পাঠিয়েছে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে জ্বালানি নিরাপত্তা ও রাশিয়ার ওপর তৈরি করা ওপেক প্লাস কৌশল মোকাবেলায় ইউরোপ স্বাধীন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চুক্তি করতে পারে।
সব মিলিয়ে ইউরোপের নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক ও শিল্প সক্ষমতা রয়েছে। এখন প্রয়োজন কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে একটি শক্তিশালী সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো গড়ে তোলা।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।