শিক্ষকের হাতে থেকে ‘বেত’ কেড়ে নিয়ে আমরা কি কিশোর গ্যাঙের হাতে ‘বন্দুক’ তুলে দিচ্ছি?

স্বপন মিয়া,ব্রাহ্মণবাড়িয়া:

.

যখন শিক্ষকের হাতে বেত ছিলো তখন কেমন ছিলো সময়টা? আমাদের প্রাইমারিতে সবচেয়ে কড়া শিক্ষক ছিলেন করিম স্যার। ক্লাসে স্যারের সামনে গেলে পাড়া পড়াটাও ভুলে যেতো সবাই! এই যেমন প্রমথ চৌধুরী’কে বলতো প্রথম চৌধুরী! স্যার তখন ভীষণ রেগে একসাথে ডজন খানেক বেত দিতেন! পরে বাসায় এসে সব পড়া বাদ। আগে পড়তাম করিম স্যারের পড়া! এরকম সবাই। স্যার রাস্তা দিয়ে হাঁটতেন এমনভাবে যেনো আগুন পানি চিনেন না। কিন্তু ক্লাসে কেউ পড়া না পারলে বলে দিতেন বিকেলবেলা কে কোথায় ঘুরতে গেছে, সন্ধায় কার সাথে কে আড্ডা দিচ্ছিলো, রাতে কে কয়টা সময় ঘুমিয়েছে এসব আমলনামা! স্যারের এতো কড়া আচরণের একটা উল্টু দিকও ছিলো। সেটা অবাক করতো আমাদের সবাইকে। স্যারের বাসায় কেউ গেলে হাতে একটা আম, লিচু, কলা, বিস্কুট যা আছে চোখের কাছে ধরিয়ে দিতো! একদিন স্যারের বাসায় মাহফিলে গিয়েছিলাম। স্যার আমাদের এমন আপ্পায়ন করলেন, মনে হলো যেনো আমরা তাঁর শিক্ষক! তখন আমরা বুঝে নিতাম শাসনের পেছনে স্যারের ভালোবাসার গভীরত্ব।

হাইস্কুলে মূর্তিমান আতঙ্ক ছিলো বিএসসি স্যার। স্যার ক্লাসে আসা মানে পুরো ক্লাস হয়ে যেতো ভুতের বাড়ি! সাড়াশব্দ নেই। সুনসান নীরবতা। অঙ্ক না পাড়লে কেল্লা ফতে! স্যার একটা পড়া অনেকবার বুঝাতেন। জিজ্ঞেস করতেন কে কে বুঝেনি। ভয়ে আমরা দাঁড়ানোর সাহস পেতাম না। পড়া না পারলে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখতেন, বেঞ্চের নিচে মাথা দিয়ে রাখতো, আর গার্ডিয়ান পেলে দুনিয়ার অভিযোগ! গার্ডিয়ানও দোহার দিতো আচ্ছাতালে “মারবেন, স্যার। বেয়াদবি করলে আরো মারবেন। পিঠের চামড়াগুলো আপনার, হাড়গুলো আমার।” বাড়িতে এসে আম্মার কাছে বললে আম্মা বলতো, “ভালা অইছে। স্যার আরো মারার দরকার ছিলো।” রাতে মা’র সাথে ঘুমাতে গেলে মা পিঠে হাত দিয়ে দেখতো বেতের দাগগুলো। আর আমাকে বুঝাতো, ” মন খারাপ করিস না, বাপ। স্যার মারলে ভালো। স্যার যেখানে মারে ওই জায়গাটা বেহেশতে যায়।”

স্যার যাকে খুব বেশি মারতেন পথে দেখা হলে কাছে ডেকে নিয়ে বলতো, “তোরে মারলে আমার কী লাভ? তুই কি আমার শত্রু? আমি চাই তোরা একদিন অনেক বড় হবি, দেশ চালাবি। তাই তোরা পড়া না পারলে আমার খুব কষ্ট হয়। রাগ উঠে।”

স্যারের এমন মমতায় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস ক্যাডার হয়েছে অনেক ব্যাকবেঞ্চার। যে স্যার এমন আদর করতে পারেন তার পড়া না শিখে যায় কেমন করে। শুধু এমন প্রত্যয়ে বদলে গেছে অসংখ্য ছেলেমেয়ের জীবন।

এখন এমন শাসনবারণ কোথায় হারালো? কোথায় হারিয়ে গেলো একটু শাসনের পর বুকে জড়িয়ে ছাত্র শিক্ষকের কান্নার পবিত্র দৃশ্য? এখন ছাত্র ক্লাসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করলেও কিছু বলতে পারে না। স্যার পড়াচ্ছে একদিকে ছাত্র গার্লফ্রেন্ডের সাথে চ্যাট করছে আরেক দিকে৷ আরো কতো অশালীন আচরণ, বেয়াদবি করে তার ইয়ত্তা নেই। শিক্ষক নীরব। শিক্ষক ভীতসন্ত্রস্ত। আমাদের পাশের এক স্কুলে স্যার কেনো ছাত্রকে দাঁড় করিয়ে রাখলো এ নিয়ে তুলকালাম। ছাত্র গিয়ে বিচার দেয় তার মা বাবার কাছে। বাবা ছিলো স্থানীয় নেতা। শুরু হলো বিচ্ছিরি রাজনীতি। হুমকি ধুমকি। ইজ্জত রক্ষায় স্যার পরের দিন অভিভাবকের কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে আসে। শুধু তাই নয়। যে শিক্ষকের পায়ে মাথা থাকতো আমাদের, এখন তো সেই শিক্ষকের গায়ে হাত উঠতে দেখা যায়। পত্রিকায় পাতায় প্রায়ই শিরোনাম হচ্ছো ‘ছাত্রের হাতে শিক্ষক খুন, লাঞ্ছিত’। জাতি হিসেবে যা আমাদের লজ্জিত করে। মাথা হেট করে দেয়।

শাসনবারণ ছাড়া কেমন প্রজন্ম পাচ্ছি আমরা? চারিদিকে শোনা যায় কিশোর গ্যাঙের কথা। খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, বোমাবাজি এহেন কোনো কর্ম নেই তারা করছে না। ইদানীং পাড়া মহল্লায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে ভয়ানক কিশোর গ্যাঙ। যা আতঙ্কিত করছে চারপাশের পরিবেশ পরিস্থিতি।

তার মানে কি আমরা শিক্ষকের হাতে থেকে বেত কেড়ে নিয়ে কিশোর গ্যাঙের হাতে বন্দুক তুলে দিচ্ছি?

.

বইমজুর, নকল বাড়ি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Notice: ob_end_flush(): Failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/pothiknews/public_html/wp-includes/functions.php on line 5309