
আমি একসময় মানুষ ছিলাম— রক্ত, স্বপ্ন আর কষ্টে গড়া এক উষ্ণ শরীর।
এখন আমি কেবল এক নামহীন অস্তিত্ব,
সময়ের গর্ভে ভেসে থাকা এক কণিকা,
যার অতীতও নেই, ভবিষ্যৎও নেই—
শুধু আছে নিঃশব্দ এক উপস্থিতি।
কখনও ভাবিনি, বেঁচে থাকাও এত ভারী হতে পারে।
প্রতিটি নিঃশ্বাসের ওজন একটা মহাবিশ্বের মৃত্যুর সমান।
আমার ভেতরে আলো আর অন্ধকারের যুদ্ধ হয় প্রতিনিয়ত,
কখনও জিতে যায় আলো, আবার হঠাৎ নিভে যায় অকারণে—
আমি হাঁটি— কিন্তু কোথাও যাই না।
কারণ সময় এখন আর সামনে চলে না, সে শুধু ঘুরে ফিরে নিজের ভেতরেই হারিয়ে যায়।
প্রতিটি মুহূর্ত আমার সামনে এসে দাঁড়ায়
বহু বছর আগে দেখা কোনো পরিচিত মুখ হয়ে—
অচেনা অথচ আপন।
আমার হাতের রেখাগুলোও বদলে গেছে।
ওগুলো আর ভবিষ্যৎ বলে না,
বরং বলে—
কোথায় কতটা ভালোবেসেছিলাম,
কোথায় কতটা পুড়ে গেছি,
কোথায় আর ফিরে যাওয়া যায় না।
কখনও মনে হয়, আমি কোনো দূর গ্রহের প্রাণী,
ভুল করে পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছিলাম।
মানুষের হাসি আমার কাছে ভাষাহীন শব্দের মতো শোনায়,
তাদের ভালোবাসা—একটা পুরনো কাহিনি,
যা আমি শুনেছি বহু আগের কোনো জন্মে।
একসময় আমি বিশ্বাস করতাম—
আলো মানেই আশা,
বৃষ্টি মানেই নতুন শুরু।
কিন্তু এখন জানি,
আলোও ক্লান্ত হয়,
বৃষ্টিও একদিন নিজের ফোঁটা গুনে ফুরিয়ে ফেলে।
রাতে যখন একা থাকি,
নিজেকে মনে হয় এক ধ্বংসাবশেষ—
যেখানে কেউ একসময় প্রার্থনা করত,
কেউ ভালোবাসার নাম লিখেছিল দেয়ালে,
এখন শুধু নীরবতা।
একটি দীর্ঘ, গভীর, অনন্ত নীরবতা।
আমার ভিতরে এখনো এক শিশু কাঁদে—
যে জানে না কেন পৃথিবী এত নিঃসঙ্গ,
কেন মানুষ এত দূরে সরে যায়,
কেন প্রতিটি ভালোবাসার শেষ হয় বিদায়ে।
আমি তাকে চুপ করাতে পারি না।
কারণ সেই শিশুটিই আমার সত্যিকারের রূপ—
যে আজও বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে
মৃত নক্ষত্রের আলোয়,
ভাবছে—
“এখনও কি আলো জন্ম নিতে পারে অন্ধকারের ভেতর থেকে?”
আমি জানি না আমি কে,
সময়ের সন্তান নাকি সময়ের শিকার।
আমি জানি শুধু এইটুকু—আমার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি দগ্ধ শ্বাস,
কোনো এক বিস্মৃত নক্ষত্রের প্রতি প্রার্থনা।
আমি হয়তো হারিয়ে যাবো
এই হারিয়ে যাওয়ার মধ্যেই
একটি অদ্ভুত মুক্তি আছে।
যতক্ষণ আমি অনুভব করতে পারবো
হারানোর বেদনা—
ততক্ষণ আমি বেঁচে থাকবো।
