
বাংলাকে বলে ষড় ঋতুর দেশ। ঋতুগুলোর মতোই আমিও বদলাই, রূপান্তরিত হই, আবার ফুরিয়ে যাই। কখনো কাশফুলের মতো ভেসে যাই শরতের হাওয়ায়, কখনো বর্ষার বৃষ্টিতে ডুবে থাকি নিজেরই ভেতরকার জলে। দিন মাস বছর পেরিয়ে যায়, ক্যালেন্ডার বদলায়, কিন্তু আমার ভেতরের সময় এক অনন্ত দুপুরে থেমে আছে—যেখানে ছায়া নেই, শান্তিও নেই, আছে শুধু চিন্তার তীব্র উত্তাপ।
ঘড়ির কাঁটা যতই ঘুরে, আমার হৃদয়ের কাঁটা ততই স্থবির হয়ে পড়ে। জীবনের বয়সটা বেড়েছে, কিন্তু জীবন বাড়েনি একটুও। কেবল শরীরটুকু প্রমাণ দেয়, সময় এখনো আমাকে ছাড়েনি।
আমি জানি, সময় এক ভদ্র হত্যাকারী—সে কাউকে একবারে মারে না, বরং ধীরে ধীরে স্মৃতিগুলো থেকে শুরু করে হত্যা করে আত্মাকে।
একসময় ভাবতাম, জীবনের প্রতিটি বছর একটি গল্প, কিন্তু এখন বুঝি, প্রতিটি বছরই এক পুনরাবৃত্তি—একই ব্যথা, ভিন্ন মুখ।
কখনো কখনো মনে হয়, আমি জন্মেছি এক অবিরাম চিন্তার কারাগারে। আমার ভেতরে বসে আছে এক চিন্তাশীল পশু, কখনো ঘুমায় না।
সে আমাকে প্রশ্ন করে:
“তুমি কেন বেঁচে আছ?”
আমি উত্তর দিতে পারি না।
কারণ আমি জানি না—আমি বেঁচে আছি, না শুধু টিকে আছি।
আমি একা। একা থাকার জন্যই জন্মেছি। বন্ধুরা ছিল, তারা এখন শুধু নামের মতো—ডাস্টবিনে ফেলা পুরনো চিঠি।বন্ধুর চেয়ে শত্রু বেশি। অথচ এই শত্রুরাও একসময় আমারই ছায়া ছিল। এখন বুঝি, মানুষ কখনো আসলে কারো হয় না—প্রত্যেকে নিজের মায়ার ভেতর বন্দি।
এক সময় ভাবতাম, ভালোবাসা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। এখন দেখি, ভালোবাসাই মানুষকে ধ্বংস করে। ভালোবাসা এক নরম বিষ—যার স্বাদ প্রথমে মধুর, পরে মগজে আগুন ধরিয়ে দেয়।
আমি সেই আগুনে পুড়েছি বহুবার।
কেউ ছিল, হয়তো নাম মনে নেই, মুখটাও ঝাপসা। কিন্তু হৃদয়ে তার অনুপস্থিতি আজও ধ্বনিত হয়। প্রেমিকারা আসে যায়, কিন্তু একাকীত্ব থেকে যায়। আমি তাই ভাবি—ভালোবাসা হয়তো কোনো মানুষে নয়, ভালোবাসা এক ধারণা, এক অনন্ত দৃষ্টিহীন আলোকরেখা, যা কেবল যন্ত্রণায়ই দৃশ্যমান হয়।
পরিবারই এখন একমাত্র আপন। অথচ তারাও ক্লান্ত। আমার নীরবতা তাদের কানে গুজবের মতো শোনায়। তারা ভাবে আমি বিষণ্ণ, আমি ব্যর্থ, আমি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন।
আমি শুধু হেসে ফেলি—কারণ তারা জানে না, আমার নীরবতার ভেতর আছে এক পৃথিবী, যেখানে কথা গুলো শব্দ নয়, আলো।
বাবা এখন স্মৃতি। তার চলে যাওয়া আমার ভিতরের শিকড় কেটে দিয়েছে।
কখনো কখনো মনে হয়, রাতের আকাশে যে তারা ঝলমল করে, সেটাই তাদের চোখের দৃষ্টি, যেটি এখনো আমাকে দেখছে। তার স্মৃতিই এখন আমার ধর্ম, আমার আত্মার অবলম্বন।
অর্থ, খ্যাতি, যশ—এই তিনটি শব্দ নিয়ে পৃথিবী গড়ে উঠেছে। আমি সেগুলো অর্জনের চেষ্টাও করিনি। সমাজ বলে—তুমি কিছুই হতে পারোনি। আমি বলি—আমি নিজেই আছি, এটাই তো সবচেয়ে বড় পাওয়া।
খ্যাতি ক্ষণস্থায়ী, অর্থ মরীচিকা, যশ এক মুখোশ। আমি এই মুখোশ পরতে শিখিনি। তাই হয়তো পিছিয়ে আছি, হয়তো সমাজের চোখে ব্যর্থ, কিন্তু নিজের চোখে আমি এখনো জীবিত।
কারণ আমি এখনো ভাবতে পারি, ভালোবাসতে পারি, কাঁদতে পারি— আর সেটাই তো বেঁচে থাকা।
আমার জীবনে বন্ধু এসেছে, থেকেছে, চলে গেছে। কেউ প্রতিশ্রুতি রেখেছে, কেউ ভেঙেছে।
আজ বুঝি, বন্ধুত্বও এক ব্যবসা—যেখানে বিনিয়োগ আছে, কিন্তু বিশ্বাস নেই। এই সমাজে মানুষ সম্পর্ক তৈরি করে নিজের সুবিধার জন্য, আত্মার জন্য নয়।
আমি সমাজে মিশতে চাই না। কারণ এখানে প্রতিটি হাসির পেছনে লুকানো থাকে একটি ঠাণ্ডা ছুরি। প্রত্যেকে কথা বলে, কিন্তু কেউ শোনে না। আমি তাই কথা বলা ছেড়ে দিয়েছি।
এখন আমার সঙ্গী শুধু নীরবতা।
যখন পৃথিবীকে আর বোঝা যায় না, তখন আমি লিখি। লেখার মধ্যে আমি আমার ক্ষত ঢাকি, আবার সেখান থেকেই রক্ত ঝরে। প্রতিটি শব্দ আমার অস্তিত্বের এক খণ্ড হাড়।
আমি লিখি কারণ আমি বাঁচতে চাই। লেখার মধ্যেই আমি সময়কে অস্বীকার করি।
এখানে মৃত্যু নেই, আছে এক ধ্রুব স্পন্দন—যা জীবনের চেয়েও স্থায়ী।
কখনো কখনো মনে হয়, আমি আসলে কোনো মানুষ নই, আমি এক চিন্তা। এই চিন্তা একদিন বাতাসে ভেসে যাবে, কারো মনের জানালায় ঢুকে পড়বে, তারপর সেখানে জন্ম দেবে নতুন এক আমি—একটা চিন্তা থেকে আরেকটা চিন্তার জন্ম। এটাই হয়তো অমরত্ব।
আমি জানি, একদিন আমাকে চলে যেতে হবে। এই পৃথিবী ঋতু বদলায়, আমি-ও তারই অংশ। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, মৃত্যু মানে শেষ নয়। আমি ফিরে আসব—হয়তো এক গাছের পাতায়,
হয়তো কারো স্বপ্নে, হয়তো কোনো কবিতার অক্ষরে।
আমার মৃত্যু হবে নিঃশব্দ, কিন্তু আমার চিন্তা থেকে যাবে। যেমন বৃষ্টির পরেও মাটিতে থেকে যায় গন্ধ। মানুষ আমাকে ভুলে যাবে, কিন্তু বাতাস মনে রাখবে আমার নিঃশ্বাস। আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটি আত্মা একদিন তার অর্থ খুঁজে পায়। তাই আমি খুঁজি, আমি লিখি, আমি বাঁচি।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা একটাই—আমি কে? আমি কি একজন মানুষ, নাকি এক চিন্তা, নাকি এক অনন্ত ব্যথা? হয়তো আমি শুধু এক ক্ষণিক আলো, যে নিজের অন্ধকার বুঝতে চায়।
আমি জানি না জীবনের অর্থ কী, কিন্তু আমি জানি শুভচিন্তা থামলে মৃত্যু আসে,
আর ভালোবাসা থাকলে মৃত্যু-ও একধরনের ঘুম।
তাই আমি এখনো ভাবি, এখনো ভালোবাসি, এখনো একা হই। এই একাকীত্বই আমার সাধনা,
এই ব্যর্থতাই আমার প্রাপ্তি। আমি জীবনের সাথে যুদ্ধ করি না আর— শুধু তার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকি, যেন কোনো একদিন সে নিজেই আমার অর্থ হয়ে ওঠে।
আমি সেই ব্যক্তি, যে কিছুই পায়নি, কিন্তু সব বুঝেছে। যার হাতে নেই অর্থ, কিন্তু আছে সময়ের গভীর বোধ। আমি সেই মানুষ, যে প্রতিদিন নিজের ভেতরে মরে,
তবু লিখে যায়—
কারণ এটাই তার অস্তিত্বের ঘোষণা:
“আমি আছি, কারণ আমি চিন্তা করি।”
