
গতকাল বাংলাদেশের দুটি ঘটনায় সমগ্র জাতির হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। একদিকে পবিত্র মসজিদের ভেতর ইমামকে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে, অন্যদিকে রাজধানীর ব্যস্ত রাস্তায় একজন মানুষকে চাঁদা না দেওয়ার ‘অপরাধে’ প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই দুটি ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং একটি ভয়াবহ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবক্ষয়ের স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
প্রথম ঘটনাটি ঘটে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, শুক্রবার রাতে এশার নামাজের পর নামাজরত অবস্থায় এক ব্যক্তি মসজিদের ইমামকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। ঘটনাটি ঘটে নামাজরত মুসল্লিদের সামনেই। ইমামের গলা, ঘাড় ও হাতে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ধর্মীয় উপাসনালয়ে, যেখানে মানুষ আসে আত্মশুদ্ধির জন্য, সেখানে এমন বর্বরতা কেবল একটি ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়—এটি আমাদের বিশ্বাস, নিরাপত্তা ও সমাজব্যবস্থার ওপর চরম আঘাত।
অন্যদিকে পুরান ঢাকা এলাকায় ঘটে যায় আরও ভয়াবহ একটি ঘটনা। স্থানীয় একটি দোকানদারের কাছ থেকে ‘চাঁদা’ না পাওয়ায় একদল সন্ত্রাসী তাকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করে। উপস্থিত সাধারণ মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখেছে—কেউ বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। ঘটনাটি ভিডিও ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রতিক্রিয়া কি অপরাধ ঠেকাতে পারছে?
এই দুই ঘটনাই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—আমাদের সমাজ আর রাষ্ট্র কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে। পরিবারের মূল্যবোধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নৈতিক শিক্ষা, রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা—সব কিছুই ক্রমেই ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। শিশুরা এখন ভিডিও গেমে মানুষ মারাকে স্বাভাবিকভাবে দেখে, তরুণ সমাজ অনলাইনের ভাইরাল ভিডিও দেখে সহিংসতায় উদ্বুদ্ধ হয়, এবং বড়দের অনেকেই অপরাধ দেখে পাশ কাটিয়ে চলে যায়—কারণ কেউই নিজেকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চায় না। রাষ্ট্রও অনেক সময় রাজনৈতিক সুবিধা বা প্রশাসনিক ব্যর্থতায় অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়।
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, চাঁদাবাজি ও ধর্মীয় স্থানকে অপবিত্র করা ফৌজদারি অপরাধ। তবে এসব ঘটনায় আমরা প্রায়ই দেখি—অপরাধী ‘অজ্ঞাতনামা’ থাকে, গ্রেপ্তার হলেও বিচার হয় না বা বিলম্বিত হয়। বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে দেশে সংঘটিত সহিংসতার প্রায় ৬০% ঘটনায় কোনো দৃশ্যমান বিচার হয়নি। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এমন নিষ্ঠুরতার ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের চোখের সামনে ঘটছে, অথচ কেউ প্রতিরোধ করছে না। আমরা যেন অসহায়ভাবে এসব দৃশ্য দেখছি, ভিডিও করছি, কিন্তু প্রতিবাদ করছি না। এটি আমাদের সামাজিক দায়িত্ববোধের অবসান ও মানসিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ। এই নির্লিপ্ততা আজ না থামালে আগামী প্রজন্ম আরো ভয়াবহ অমানবিক সমাজে বড় হবে।
এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের ভূমিকা থাকতে হবে:
আজ যারা ইমামকে কুপিয়ে বা প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা করছে, কাল তারা আরও বড় অপরাধ ঘটাবে—যদি আমরা এখনই প্রতিরোধ না করি। সমাজ ও রাষ্ট্রের অবক্ষয় ঠেকাতে হলে মানবতা ও নৈতিকতা ফিরিয়ে আনার লড়াই এখন সময়ের দাবি। নইলে, আমরা এক এমন সমাজে বাস করব, যেখানে মানুষ বাঁচার জন্য নয়—মরার অপেক্ষায় থাকবে।
