অনেক দিন কিছু লিখি না।
এই ‘অনেক দিন’ কত দিন, তার হিসাব আমার কাছে নেই। মানুষ ক্যালেন্ডারে দিন গোনে, আমি ইদানীং দিন গুনি বিদ্যুতের বিল, ফোনের চার্জ আর ঘুম ভাঙার অ্যালার্ম দিয়ে। সকাল আসে, রাত হয়। মাঝখানে আমিও থাকি। শুধু বেঁচে থাকার ঘটনাটি ঘটে, জীবনের ঘটনাগুলো আর ঘটে না।
একসময় আমার দিনগুলোর নাম ছিল।
কোনো দিনের নাম ছিল প্রেম।
কোনো দিনের নাম বিপ্লব।
কোনো দিনের নাম কবিতা।
কোনো দিনের নাম ছিল শুধু তার নাম।
এখন সব দিনের একটাই নাম, ‘আজ’।
এবং আশ্চর্য, প্রতিটি আজ দেখতে ঠিক গতকালের মতো।
একসময় বৃষ্টি নামলে আমার ভেতরেও একটা জানালা খুলে যেত। মেঘের গন্ধে কারও চুলের গন্ধ পেতাম। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনলে মনে হতো, পৃথিবীর সমস্ত ব্যস্ততা থামিয়ে কেউ আমার জন্য একটি দীর্ঘ চিঠি পড়ছে।
এখন বৃষ্টি হলে প্রথমেই মনে পড়ে, ছাতাটা সঙ্গে আছে তো?
এই সামান্য পরিবর্তনটুকুই হয়তো বয়স।
অথবা পরাজয়।
অথবা মানুষ নিজের অজান্তে একদিন কবিতা থেকে গদ্যে নেমে আসে।
আমি জানি না।
শুধু জানি, এখন আর বৃষ্টি আমাকে কারও কাছে নিয়ে যায় না।
বৃষ্টি এখন পানি মাত্র।
অথচ এমন তো হওয়ার কথা ছিল না।
আমি সেই মানুষ, যে একসময় চাঁদ উঠলে অকারণে বাইরে বেরিয়ে পড়তাম। মনে হতো, জ্যোৎস্না আসলে আকাশের নয়, কোনো নারীর গোপন অভিমান পৃথিবীর ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। নির্জন পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে কতবার মনে হয়েছে, পৃথিবীতে প্রেম না থাকলে চাঁদের এত আলো অপচয় করার কোনো মানে হয় না।
আজকাল পূর্ণিমা কখন আসে, জানিও না।
চাঁদ নিশ্চয়ই এখনও ওঠে।
শুধু আমার ভেতরের উঠোনে তার আলো পৌঁছায় না।
মাঝে মাঝে ভয় হয়, মানুষ কি এভাবেই বৃদ্ধ হয়?
চুল পাকার অনেক আগে?
শরীর ক্লান্ত হওয়ার অনেক আগে?
একদিন হঠাৎ আবিষ্কার করে, যে জিনিসগুলো তাকে একসময় কাঁদাত, হাসাত, পাগল করত, রাস্তায় নামাত, প্রেমে ফেলত, কবিতা লেখাত, সেগুলো ঠিকই আছে, শুধু তার ভেতরে তাদের জন্য নির্ধারিত ঘরগুলো আর নেই।
আমারও কি সেই ঘরগুলো ভেঙে গেছে?
আমি উত্তর খুঁজি না।
উত্তর খোঁজারও সময় কোথায়!
সকালে কাজ আছে।
দুপুরে হিসাব আছে।
বিকেলে প্রয়োজন আছে।
রাতে ক্লান্তি আছে।
শুধু আমার জন্য আমার কোনো সময় নেই।
একসময় শহরের পিচঢালা রাস্তায় রিকশায় বসে কত স্বপ্ন দেখেছি। শহরটা তখন আমার কাছে মানচিত্র ছিল না, ছিল এক বিশাল সম্ভাবনা। মোড়ে মোড়ে মানুষের ভিড়, চায়ের দোকানের ধোঁয়া, দেয়ালে পোস্টার, মিছিলে স্লোগান।
সেই স্লোগানের মধ্যে আমারও একটা কণ্ঠ ছিল।
কী অসম্ভব বিশ্বাস ছিল তখন!
মনে হতো, আমার গলার কয়েকটি শব্দেই পৃথিবীর কোনো একটি অন্যায় অন্তত একটু কেঁপে উঠবে।
রিকশার চাকা ঘুরত।
আমি ভাবতাম, ইতিহাসও বুঝি এভাবেই ঘুরছে।
এখন সেই একই শহরে রিকশায় উঠলে আমি ভাড়া জিজ্ঞেস করি, রাস্তার জ্যাম দেখি, ফোন দেখি, তাড়াহুড়ো করি।
পথের পাশে হয়তো এখনও মিছিল যায়।
কেউ হয়তো আমার তরুণ বয়সের মতোই বুকের সমস্ত বাতাস একত্র করে স্লোগান দেয়।
আমি তাকিয়ে থাকি।
কিন্তু আমার কণ্ঠ আর তাদের কণ্ঠে মেশে না।
তখন বুঝতে পারি, পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ দূরত্ব দুই দেশের মধ্যে নয়।
একজন মানুষের বর্তমান বয়স আর তার যৌবনের মাঝখানে।
সেই দূরত্ব পাসপোর্ট দিয়ে পার হওয়া যায় না।
কখনো কখনো পুরোনো নিজেকে মনে পড়ে।
ছেলেটা কী বোকাই না ছিল!
অল্পতেই প্রেমে পড়ত।
অল্পতেই প্রতিবাদ করত।
অল্পতেই কষ্ট পেত।
অল্পতেই বিশ্বাস করত।
আজকের আমি তাকে দেখলে হয়তো বলতাম, ‘এত আবেগ দিয়ে জীবন চলে না।’
আর সে যদি আজকের আমাকে দেখতে পেত, হয়তো হেসে বলত,
‘এভাবে চলার নাম কি জীবন?’
আমি জানি না, আমাদের দুজনের মধ্যে কে ঠিক।
শুধু জানি, মাঝখানে অনেক বছর চলে গেছে এবং সেই বছরগুলো আমাকে জিততে শেখাতে শেখাতে কোথায় যেন আনন্দ করতে ভুলিয়ে দিয়েছে।
তারপর সে আছে।
অথবা নেই।
মানুষের জীবনে কিছু মানুষ থাকে, যাদের সম্পর্কে ‘আছে’ কিংবা ‘নেই’ কোনো শব্দই পুরোপুরি সত্য নয়।
একসময় মনে হতো, পৃথিবীর সমস্ত ঋতু বুঝি তাকে কেন্দ্র করেই বদলায়। বসন্ত এলে তার কথা মনে পড়ত, বর্ষায় তার অভিমান, শরতে তার মুখ, শীতে তার হাতের উষ্ণতা।
তারপর একদিন দেখলাম, ঋতু বদলেছে।
সে-ও বদলেছে।
আমিও।
এখন সে অন্য কোনো বাগানে সুবাস দেয়।
এই বাক্যটি লিখতে আমার কষ্ট হচ্ছে কি না, ঠিক বুঝতে পারছি না।
একসময় হতো।
খুব হতো।
মানুষ ভাবে বিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো কাউকে হারানো।
না।
সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো একদিন আবিষ্কার করা, যাকে হারানোর কথা ভেবে একসময় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসত, তাকে ছাড়া এখন দিব্যি নিশ্বাস নেওয়া যাচ্ছে।
এই স্বাভাবিক হয়ে যাওয়াটাই ভয়ংকর।
তুমি বুঝতে পারো, হৃদয়ও এক ধরনের বিশ্বাসঘাতক অঙ্গ।
সে সবকিছু সহ্য করতে শিখে যায়।
যাকে ছাড়া বাঁচবে না বলেছিলে, তাকে ছাড়াই বাজার করো, কাজ করো, হাসো, ঘুমাও, সকালে উঠে দাঁত মাজো।
পৃথিবী থামে না।
চায়ের দোকানে কেটলি ফুটতে থাকে।
বাস ছাড়ে।
শিশুরা স্কুলে যায়।
নতুন প্রেমিকেরা নদীর ধারে বসে।
শুধু তোমার ভেতরে কোনো একটি পুরোনো বাড়ির দরজা বহু বছর বন্ধ থাকে।
মাঝে মাঝে বাতাসে সেই দরজাটা একটু নড়ে।
ব্যস।
এর বেশি কিছু নয়।
প্রবাসে যারা থাকে, তারা হয়তো আমার এই কথাটা সবচেয়ে ভালো বুঝবে।
প্রবাস মানে শুধু অন্য দেশ নয়।
প্রবাস একটা অনুভূতির নাম।
নিজের ঘরে থেকেও মানুষ প্রবাসী হতে পারে।
পরিচিত শহরে, পরিচিত বিছানায়, পরিচিত মানুষের মাঝেও।
যেদিন তোমার কথা বলার মতো মানুষ থাকে না, সেদিন থেকেই তোমার প্রবাস শুরু।
হাজার মানুষের ফোন নম্বর থাকতে পারে।
কিন্তু রাত দুটোয় হঠাৎ বুক ভার হয়ে এলে যাকে ফোন করে বলা যায়, ‘ঘুমাসনি তো? একটু কথা বলবি?’ এমন একজন না থাকলে পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল শহরেও তুমি একা।
আমি সেই প্রবাসের নাগরিক।
আমার কোনো ভিসা লাগেনি।
কোনো বিমান আমাকে এখানে নামিয়ে যায়নি।
একদিন কথা বলতে বলতে কথা কমে গেছে।
দেখা করতে করতে দেখা বন্ধ হয়েছে।
লিখতে লিখতে লেখা থেমেছে।
মানুষের কাছে যেতে যেতে একসময় আর যাওয়া হয়নি।
তারপর দেখি, আমি বহু দূরে চলে এসেছি।
কার কাছ থেকে?
জানি না।
হয়তো সবার কাছ থেকে।
হয়তো নিজের কাছ থেকেই।
সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হলো, বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যায় না।
আমি কথা বলি।
প্রয়োজনে হাসি।
মানুষের সঙ্গে হাত মেলাই।
কাজ করি।
পরিকল্পনা করি।
ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করি।
কেউ দেখে বুঝবে না, আমার ভেতরে একটা পুরোনো শহর বহুদিন ধরে জনশূন্য পড়ে আছে।
সেখানে একটি চায়ের দোকান এখনও খোলা।
একটা রিকশা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে।
একটা মিছিল মোড় ঘুরে আসছে।
একজন তরুণ গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিচ্ছে।
একটি মেয়ে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে চুল থেকে পানি ঝাড়ছে।
একটি কবিতা অর্ধেক লেখা অবস্থায় টেবিলে পড়ে আছে।
আমি শুধু সেখানে আর থাকি না।
আমার পুরোনো আমি থাকে।
মাঝে মাঝে তার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করে।
জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে,
‘কী রে, আমাকে চিনতে পারছিস?’
আমি জানি, সে প্রথমে চিনতে পারবে না।
তারপর অনেকক্ষণ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকবে।
হয়তো বলবে,
‘তুই এত চুপ হয়ে গেলি কবে?’
আমি কী উত্তর দেব?
বলব, জীবন আমাকে চুপ করিয়েছে?
সেটা মিথ্যা হবে।
জীবন কাউকে চুপ করায় না। জীবন শুধু এত শব্দ দেয় যে একসময় নিজের কণ্ঠটাই আর শোনা যায় না।
বলব, মানুষ আমাকে বদলে দিয়েছে?
সেটাও পুরো সত্য নয়।
মানুষ কেবল দরজা পর্যন্ত আসে। ভেতর থেকে দরজাটা আমরা নিজেরাই বন্ধ করি।
তাহলে কী বলব?
হয়তো কিছুই বলব না।
তার পাশে বসব।
দুজন মিলে চা খাব।
সে ভবিষ্যতের গল্প করবে।
আমি অতীতের।
কী অদ্ভুত!
তার ভবিষ্যৎই তো আমার অতীত।
যে জীবন পাওয়ার জন্য সে এত অধীর, সেই জীবন পেরিয়েই আমি তার কাছে ফিরে এসেছি।
আমি তাকে সাবধান করতে চাইব।
বলতে চাইব, খুব বেশি শক্ত মানুষ হওয়ার চেষ্টা করিস না।
সব সহ্য করতে শিখিস না।
কিছু আঘাতে কাঁদিস।
কিছু মানুষকে পাগলের মতো ভালোবাসিস।
কিছু ভুল করিস।
বৃষ্টিতে ভিজিস।
কারণ একদিন এমন সময় আসবে, তোর কাছে দামি ছাতা থাকবে, কিন্তু ভিজতে ইচ্ছে করবে না।
অনেক মানুষের পরিচয় থাকবে, কথা বলার মানুষ থাকবে না।
ঘরে আলো থাকবে, অপেক্ষা থাকবে না।
ফোনে পৃথিবী থাকবে, কিন্তু রাত গভীর হলে ফোন করার মতো একটি নম্বর খুঁজে পাবি না।
তখন বুঝবি, জীবনের সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য অর্থের অভাব নয়।
কারও জন্য মন খারাপ না হওয়ার মতো ধনী হয়ে যাওয়াই সবচেয়ে ভয়ংকর দারিদ্র্য।
আমি কি তবে শেষ হয়ে গেছি?
না।
এই জায়গাটায় এসে আমি নিজেকেই থামাই।
কারণ আজ এত দিন পর আমি লিখছি।
এই যে শব্দগুলো ফিরে এসেছে, এর মানে আমার ভেতরের শহরটি পুরোপুরি মরে যায়নি।
কোনো এক বাড়িতে এখনও বাতি জ্বলছে।
কেউ একজন এখনও জানালার পাশে বসে আছে।
হয়তো সে আমার পুরোনো আমি।
হয়তো কোনো হারানো প্রেম।
হয়তো সেই তরুণ, যে পিচঢালা রাস্তায় স্লোগান দিয়েছিল।
হয়তো কেউ নয়।
তবু আলোটা আছে।
এটুকুই আপাতত যথেষ্ট।
বাইরে হয়তো আবার বৃষ্টি নামবে।
আমি হয়তো এবারও কারও কথা মনে করব না।
চাঁদ উঠবে।
প্রেম জাগবে না।
শহরে মিছিল যাবে।
আমার কণ্ঠ মিশবে না।
সে অন্যের বাগানে ফুল হয়ে ফুটবে।
দূরদেশে কেউ একা জানালার পাশে বসে বুঝবে, প্রবাস আসলে কত দীর্ঘ একটি রাত।
আর আমি?
আমি হয়তো চুপচাপ জানালাটা খুলব।
হাত বাড়িয়ে দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি ছুঁয়ে দেখব।
কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটবে না।
হারানো মানুষ ফিরে আসবে না।
যৌবন ফিরে আসবে না।
পুরোনো শহরও নয়।
কিন্তু বহুদিন পর হয়তো হঠাৎ আমার মনে হবে, বৃষ্টি শুধু পানি নয়।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমি বুঝব,
আমি এখনও পুরোপুরি যন্ত্র হয়ে যাইনি।
আমার ভেতরে কোথাও একজন মানুষ বেঁচে আছে।
যে এখনও অপেক্ষা করতে জানে।
যে এখনও হারানোর ব্যথা মনে করতে পারে।
যে এখনও কোনো এক চাঁদনী রাতে অকারণে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে।
আর যে এত দীর্ঘ নীরবতার পরও একটি সাদা কাগজের সামনে বসে বলতে পারে,
আমি ফিরে এসেছি।
কারও কাছে নয়।
কোনো প্রেমের কাছে নয়।
কোনো শহর, স্লোগান কিংবা ফেলে আসা ঋতুর কাছেও নয়।
আমি ফিরে এসেছি আমার কাছে।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।