আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের জীবনের শেষ দিনগুলো

লেখক: গাজী তানভীর আহমদ
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আপাদমস্তক একজন নিখাদ দেশপ্রেমিক ছিলেন। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য তাঁর মমতা আর ভালোবাসা ছিল অনন্য উচ্চতার। মৃদুভাষী, নিয়মতান্ত্রিকতা, সহমর্মিতা, আতিথেয়তা, পরোপকারী, সততা, দেশাত্মবোধ এমনই হাজারো গুণ আর বৈশিষ্ট্যে অলংকৃত ছিলেন তিনি। জীবনের একটি বড় অংশ জ্ঞানার্জন আর সাধনায় মগ্ন থেকে কাটিয়েছেন। বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায়ও ছিল তাঁর বিশেষ পাণ্ডিত্য।
নিজের কর্মব্যস্ততার পাশাপাশি ‘সার্কেল অব সিক্সটিন’ শিরোনামে বিশ্বসংগীতের উৎপত্তি ও ইতিহাস নিয়ে প্রায় ১৫০০ পৃষ্ঠার একটি বই রচনার কাজ করে গেছেন। এ বইটিতে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংগীতকে একটি সূত্রে এনে সংগীতকে অত্যন্ত সহজ ও প্রাণবন্তভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। টানা ৭/৮ বছর ধরে এ বইটির পেছনে সময়, শ্রম, মেধা ও অর্থ ব্যয় করে গেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত নিজের ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা আর নানান জটিলতায় ইংরেজি ভাষায় লেখা এ দুর্লভ গবেষণাধর্মী বইটি অপ্রকাশিত রয়ে গেছে।ইমতিয়াজ বুলবুল

২০১২ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল—১ আদালতে নিজের যুদ্ধদিনের স্মৃতি বর্ণনা করেন। সরকার তার এই জবানবন্দিকে মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত গোলাম আযমের মামলার সাক্ষী হিসেবে রেকর্ড করে। যদিও তিনি সেখানে শুধুই নিজের যুদ্ধদিনের পাকবাহিনী কর্তৃক নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন, সেখানে গোলাম আযমের নাম কিংবা ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততার কোনো বর্ণনা দেননি। তার এই বক্তব্যকে সারা দেশের মিডিয়া গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মামলার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবেই প্রচার করেছে। এভাবে প্রচারের বিষয়গুলো তার নজরে আসলে তিনি মিডিয়া হাউজের দু—একজনকে ডেকে এনে প্রতিবাদ করলেও তারা নিরুত্তর থেকেছেন। পরে সরকার থেকে বলা হয়েছে তিনি যেন এ ব্যাপারে বেশি কিছু আর না বলেন।

পরের বছর ৯ মার্চ ২০১৩ তারিখে ছোটভাই আহমেদ মিরাজ দুবৃর্ত্তদের হাতে নিহত হন। এ ঘটনায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হন এবং অত্যন্ত ভেঙে পড়েন। এরপর থেকে পুলিশি পাহারায় চলতে থাকে নিজ ঘরেই শঙ্খনীল জীবন। তখন থেকে জরুরি কাজ বা খুব প্রয়োজন ব্যতীত বাহিরে বের হতেন না। নিজে বাদী হয়ে ভাইয়ের হত্যার বিচার পাওয়ার আশায় মামলা করেন। কিন্তু তিনি জীবদ্দশাতেই বারবার তাগাদা দেওয়ার পরেও অদ্যাবধি এই মামলার ফাইনাল রিপোর্ট আসেনি।আহমেদ ইমতিয়াজ

একদিন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে মামলার অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘স্যার, এই মুহূর্তে সরকার থেকে তদন্ত কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। ক্ষমা করবেন স্যার। আপনাকে অনুরোধ করে বলছি, আপনার সার্বিক নিরাপত্তার জন্য ভালো হবে। আপনিও আর এ বিষয়ে বেশি কিছু জানতে চাইবেন না।’ এসব শুনে তিনি খুব আতঙ্কিতবোধ করেন এবং এক পর্যায়ে তিনি সরকারের পক্ষ থেকেই যেন নিজের জীবনকে অনিরাপদ বোধ করতে থাকেন; যা নিয়ে তিনি আর কখনো বাইরে আলোচনার সাহস পাননি। মাঝে মধ্যে একান্ত আপনজনদের কাছে নিজের দুঃখগুলো বলে সামান্য হালকা হওয়ার চেষ্টা করতেন।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের শেষ জীবনের একটি পরম ইচ্ছা ছিল গ্রাম এলাকায় একটি সংগীতের স্কুল করে সেখানে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সাথে সময় কাটাবেন। কিন্তু তা আর পূরণ হলো না। ২২ জানুয়ারি ২০১৯ ভোর রাতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন। এর আগে প্রথম ২০১৮ সালের ১ মে তারিখে হার্টের সমস্যা নিয়ে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে দুদিন থাকার পর ডাক্তারগণ বাইপাস সার্জারির পরামর্শ দিলে সার্বিক প্রস্তুতির জন্য বাসায় চলে আসেন। কিছুদিন পরে নিজের অসুস্থতা নিয়ে ফেসবুকে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন। এতে তাঁর ভক্তগণ ভীষণভাবে চিন্তিত হয়েছিলেন এবং তার অসুস্থতা নিয়ে সারাদেশে আলোচনা হতে থাকে; যা সরকারকেও বেশ ভাবিয়ে তোলে।

এমন পরিস্থিতিতে সরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয়ভার সরকারিভাবে গ্রহণের ঘোষণা দেয়। প্রস্তাব দেওয়া হয় বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করানোর। কিন্তু তিনি দেশের চিকিৎসা ছেড়ে বিদেশে যেতে রাজি হননি। কারণ হিসেবে বলেছিলেন, আমার দেশের সাধারণ মানুষ বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারেন না। তারা সবাই দেশে চিকিৎসা করান। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, দেশের হাসপাতালে দেশের ডাক্তারদের দ্বারাই চিকিৎসা করাবো।

পরে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণের তত্ত্বাবধানে অপারেশন থিয়েটারে যাবার কিছুদিন আগে তিনি ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে দেশবাসী ও ভক্ত—অনুরাগীদের কাছে দোয়া চেয়ে লিখেছিলেন, অপারেশনের আগে দশ সেকেন্ডের জন্য আমার বুকের মাঝে বাংলাদেশের পতাকা আর পবিত্র কুরআন শরীফ রাখতে চাই। হাসপাতালে অপারেশনের আগে তার এই ইচ্ছা পূরণে সার্বিক সহযোগিতা করেছিলেন তার সাথে দীর্ঘদিন ধরে সহযোগী হিসেবে থাকা লেখক গাজী তানভীর আহমদ।

সেই পতাকা আর পবিত্র কুরআন শরীফ তার পরিবারের কাছে এখনো সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু নিখাদ দেশপ্রেমিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংগীতজ্ঞ আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল এখন চিরশায়িত আছেন মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে।
আহ
এই মহান গুণী মানুষটি আর কখনো ফিরবেন না। দোয়া করছি, মহান আল্লাহ যেন পরাপারে তাঁকে ভালো রাখেন, শান্তিতে রাখেন।

ছবি_ও_তথ্যসূত্র : আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল স্মারকগ্রন্থ

লেখক: গাজী তানভীর আহমদ
পুরানা পল্টন, ঢাকা— ১০০০