কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের বিপুল ঋণ, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ এবং সরকারি বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে আর্থিক বাজারগুলোতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গ্রীষ্মকালে এআই বিপ্লবের ওপর ভর করে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার সর্বকালের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছালেও, বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকেত ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার পাশাপাশি মার্কিন সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ নীতি ও তার ৪১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ ছাড়িয়ে যাওয়া কর ও ব্যয় পরিকল্পনা বাজারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা আরও জোরদার হয়েছে।
ফ্রেঞ্চ বিনিয়োগ ব্যাংক সোসিয়েতে জেনালেরের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আলবার্ট এডওয়ার্ডস সতর্ক করে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের তেল সংকট বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে বড় ধরনের মন্দা সৃষ্টি করতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ট্রাম্পের অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে ২০২৩ সালের পর এই প্রথম সুদের হার বাড়িয়েছে। অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও একই ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড, ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক এবং ব্যাংক অব জাপান ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়াতে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
বাজারে এআই খাতের কারণে তৈরি হওয়া বুদবুদ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে মার্কিন এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের ‘ক্যাপ’ (CAPE) অনুপাত প্রায় ৪১ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি এবং ২০০০ সালের ডটকম ধসের ঠিক আগের রেকর্ড ৪৪.১৯ পয়েন্টের কাছাকাছি। ফ্যাথম কনসাল্টিংয়ের গবেষণা অনুযায়ী, এআই খাতের বিপুল বিনিয়োগ লাভজনক করতে আগামী দুই বছরে এআই সংক্রান্ত বিক্রি ৬০০ থেকে ৮০০ বিলিয়ন ডলার বাড়াতে হবে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে ঘটা কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে।
এআই খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ ও ঋণগ্রস্ত হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। যেমন, ওপেনএআই-এর সাথে চুক্তির পর ওরাকলের শেয়ারের দাম এক বছর আগে বাড়লেও, ডেটাসেন্টার তৈরিতে অতিরিক্ত ঋণের শঙ্কায় এর মান অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে। অন্যদিকে, সিউল বা দক্ষিণ কোরিয়ায় ঋণ নিয়ে (মার্জিন) এআই চিপের শেয়ার কেনা ১.২ মিলিয়ন খুচরা বিনিয়োগকারী মার্জিন কলের কবলে পড়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার মানসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ৫ শতাংশের সীমা অতিক্রম করেছে। ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের জন হিগিনস ও ব্লুমবার্গের সাইমন হোয়াইটের মতো অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে বন্ডের সুদের হার ৫.২৫ শতাংশের ওপরে উঠলে শেয়ার ও বন্ড বাজার পরস্পরকে পতনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তবে এই চরম অস্থিরতার মধ্যেও কিছুটা আশার আলো দেখছেন কেউ কেউ। অক্সফোর্ড ইকোনমিক্স মনে করে মূল্যস্ফীতির ভয় যতটা করা হচ্ছে বাস্তবে আঘাত ততটা তীব্র নাও হতে পারে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যান্ডি হ্যালডেন জানিয়েছেন, ডটকম ধসের মতো হুট করে বাজার ভেঙে না পড়ে এআই প্রযুক্তির ইতিবাচক প্রভাবে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধীরে সুস্থে মানিয়ে নিতে পারে, যদিও সার্বিক পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত নাজুক।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।