যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে ধনকুবের ব্যক্তিদের প্রভাব ও বড় অঙ্কের অনুদান প্রদানের হার অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে দেশটির রাজনৈতিক দলগুলোতে ধনী ব্যক্তিরা মোট ১৭৯ মিলিয়ন পাউন্ড অনুদান দিয়েছেন। ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি রিসার্চ (আইপিপিআর) নামের একটি থিঙ্কট্যাংকের গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির মতে, মেগা অনুদানের মাধ্যমে রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় অর্থের প্রভাব ক্রমশ জোরদার হচ্ছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অনুদানের রেকর্ড রাখা শুরু হওয়া ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি অঙ্কের যত মেগা অনুদান এসেছে, তার ৭২ শতাংশই প্রদান করা হয়েছে ২০১৯ সালের পর থেকে। ২০০১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে মেগা অনুদান ছিল ৩.৯ মিলিয়ন পাউন্ড। কিন্তু ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই অঙ্ক বেড়ে বছরে গড়ে ১৩.১ মিলিয়ন পাউন্ডে দাঁড়িয়েছে, যা সাধারণ মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে বহু গুণ বেশি।
অনুদানের এই গতি বৃদ্ধির বড় কারণ হিসেবে নির্দিষ্ট কিছু বড় অনুদানকে চিহ্নিত করা হয়েছে। থাইল্যান্ডভিত্তিক ধনকুবের ক্রিস্টোফার হারবোর্ন ব্রেক্সিট পার্টিকে ১০ মিলিয়ন পাউন্ড এবং সুপারমার্কেট ব্যবসায়ী ডেভিড সেইনসবারি লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের ৮ মিলিয়ন পাউন্ড প্রদান করার পর থেকে মেগা অনুদান দ্রুত বাড়ে। উল্লেখ্য, সেইনসবারি পরবর্তীতে পুনরায় লেবার পার্টিতে ফিরে এসেছেন।
দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের মতো কোনো কোনো বছরে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত মোট ব্যক্তিগত অনুদানের প্রতি ১০ পাউন্ডের প্রায় ৭ পাউন্ডই এসেছে এমন ধনকুবের বা প্রতিষ্ঠান থেকে, যারা এক বছরে ১ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি অনুদান দিয়েছেন। সম্প্রতি ক্রিপ্টো ধনকুবের ক্রিস্টোফার হারবোর্ন ও বেন ডেলা রিফর্ম ইউকে পার্টিকে ৩৬ মিলিয়ন পাউন্ড করে মোট ৭২ মিলিয়ন পাউন্ড অনুদান দেওয়ায় এই বিতর্ক আরও তীব্র রূপ নিয়েছে।
রিফর্ম ইউকে জানিয়েছে, অতীতে অন্যান্য দলগুলো যেভাবে লাখ লাখ পাউন্ডের মেগা অনুদান নিয়েছে, তারা কেবল সেই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। অন্যান্য প্রধান দলগুলোর মধ্যেও মেগা অনুদানের প্রচলন দেখা গেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে কনজারভেটিভ পার্টিকে ফ্রাঙ্ক হেস্টার ২০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি দিয়েছেন এবং লেবার পার্টিকে গ্যারি লাবনার এ পর্যন্ত মোট ৯ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি অনুদান দিয়েছেন।
আইপিপিআর-এর এই গবেষণা তথ্যগুলো মূলত ২০০১ সাল থেকে সংরক্ষিত ইলেকটোরাল কমিশনের তথ্য এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। আইপিপিআর-এর নির্বাহী পরিচালক হ্যারি কুইল্টার-পিনার মন্তব্য করেছেন যে, যুক্তরাজ্যের রাজনীতি অর্থায়নের ক্ষেত্রে এক মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাজ্যে আমেরিকান ধাঁচের রাজনীতির প্রভাব পড়ছে, যেখানে দলগুলো গুটিকয়েক অতি ধনী ব্যক্তির ওপর নির্ভর হয়ে পড়ে। তিনি অনুদানের সর্বোচ্চ বার্ষিক সীমা ১০০,০০০ পাউন্ড নির্ধারণের পরামর্শ দেন।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে লেবার পার্টির অনেক এমপি অনুদানের ওপর বার্ষিক ১০০,০০০ বা ৫০০,০০০ পাউন্ডের সীমা আরোপের দাবি জানিয়েছেন। চলতি শরতে সরকারের নির্বাচন সংক্রান্ত বিল যখন হাউস অব লর্ডসে যাবে, তখন অনুদানের সীমা নির্ধারণ সংক্রান্ত প্রস্তাব আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট এই সীমা আরোপে কিছু ট্রেড ইউনিয়নের আপত্তির মুখে কিছুটা ইতস্তত করছে, কারণ ইউনিয়নগুলোর আশঙ্কা এতে তাদের অনুদানেও কড়াকড়ি আসতে পারে।
সরকার সম্প্রতি রাজনৈতিক অঙ্গনে মেগা অনুদানকারীদের অতিরিক্ত প্রভাব মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং প্রবাসী ভোটারদের জন্য বছরে ১০০,০০০ পাউন্ডের সীমা নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি মেগা অনুদানের বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য একটি নতুন টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। স্পটলাইট অন করাপশনের নির্বাহী পরিচালক ড. সুসান হর্লি এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ইউকে-র পলিসি ডিরেক্টর ডানকান হেমস অতি দ্রুত অনুদানের ওপর বার্ষিক নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।