আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ৩ নভেম্বর ২০২৬, ৬:৫০ অপরাহ্ন
কৃষ্ণসাগরে শস্যবাহী জাহাজে নতুন করে হামলা শুরু হওয়ায় বৈশ্বিক শস্য রপ্তানি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে এবং বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা আরও গভীর হচ্ছে। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, বেসামরিক জাহাজে হামলা চালিয়ে কৃষ্ণসাগরকে চলাচলের অযোগ্য করে তোলা এবং ইউক্রেনের অর্থনীতিকে পঙ্গু করাই এই আক্রমণের লক্ষ্য।
গত ২৮ অক্টোবর বুলগেরিয়া উপকূলের কাছে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘কনটশিপ জেট মনরোভিয়া’ নামের একটি শস্যবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা চালানো হয়। ৪০০টিরও বেশি কনটেইনার নিয়ে ইসরায়েলের হাইফা বন্দর থেকে রোমানিয়া যাওয়ার পথে জাহাজটি ডুবে যায়। তবে বুলগেরীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জাহাজে থাকা ১৮ জন ক্রুর সবাইকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, এটি কৃষ্ণসাগরে বেসামরিক নৌচলাচল ব্যাহত করতে রাশিয়ার পরিকল্পিত পদক্ষেপ।
কিয়েভে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধি দল অভিযোগ করেছে, রাশিয়া ইউক্রেনের বন্দর, নৌপথ ও কৃষি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় কমিশনের কৃষি ও শুল্ক বিষয়ক মুখপাত্র পাওলা রিটার-মোশুটজ আল জাজিরাকে জানান, ইউরোপের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে না থাকলেও ইউক্রেনের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে ইইউ অঙ্গীকারবদ্ধ। কৃষ্ণসাগরে হামলা বন্ধে যে কোনো উদ্যোগকে তারা সমর্থন জানান।
সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলে সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় অন্তত ৩০ জন নাবিক নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন বলে বুলগেরিয়া ও রোমানিয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কৃষ্ণসাগর এবং আজভ সাগরে রাশিয়ার তেল ট্যাংকার ও সামরিক স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদালয়ের গবেষক নিকোলে মিত্রোখিন জানান, জাহাজে আক্রমণ না করার একটি অপ্রকাশ্য সমঝোতা ইউক্রেন লঙ্ঘন করার পর মস্কো পাল্টা ব্যবস্থা শুরু করে।
নিরাপত্তাহীনতার কারণে রাশিয়াও তাদের নিজস্ব শস্য রপ্তানির জন্য বিকল্প হিসেবে আর্কটিক অঞ্চলের মুরমানস্ক বন্দর ব্যবহারের চেষ্টা করছে, যা পরিবহণ খরচ অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে। ২০২২ সালে আক্রমণ শুরুর আগে বিশ্বের মোট শস্যের এক-তৃতীয়াংশ কৃষ্ণসাগর দিয়ে পরিবাহিত হতো। এর মধ্যে ইউক্রেন একাই বিশ্ব গম চাহিদার দশ ভাগের এক ভাগ এবং ভুট্টার ১৫ শতাংশ সরবরাহ করত। কিন্তু চলমান উত্তেজনায় গত ১২ মাসে গমের দাম বিশ্ববাজারে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইউক্রেনের মূল সামুদ্রিক হাব ওডেসা বন্দরে অব্যাহত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে কাজকর্ম স্থবির হয়ে পড়েছে। ইউক্রেনের কৃষক সমিতির সভাপতি ভিক্টর হোনচারেঙ্কো আল জাজিরাকে বলেন, ওডেসা বন্দর অচল হয়ে পড়ায় এখন ৫০ শতাংশের বেশি শস্য স্থলপথে রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বহু ক্ষেতের গম অবিকল পড়ে আছে এবং কাটা সম্ভব হচ্ছে না। এটি ছোট কৃষকদের জীবনযাত্রায় বড় আঘাত হানছে।
কিয়েভভিত্তিক বিশ্লেষক অ্যালেক্সি কুশচ জানান, ইউক্রেনে এ বছর প্রায় ৬০ মিলিয়ন টন শস্য উৎপাদিত হলেও অর্ধেকের বেশি দেশের বাইরে পাঠানো সম্ভব নয়। দেশটির অভ্যন্তরীণ রেল যোগাযোগ অতিরিক্ত চাপে থাকায় শস্যের বড় অংশ জমে আছে। পরিস্থিতি সামলাতে কিয়েভ সরকার যদি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিকল্প শস্য উৎপাদনে ভর্তুকির উদ্যোগ না নেয়, তবে দেশটির কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।

মন্তব্য ০
আলোচনায় অংশ নিন, তবে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষা এড়িয়ে চলুন।